সবাই আমরা ভয়ে আর্তনাদ শুরু করে দিলাম। আমি আমার কাঁধে চামড়ার ব্যাগটা যা সব সময় আমার কাঁধে ঝোলানো থাকতো, যার মধ্যে আমার এই ডায়রীখানা ছিলো এবং কলম কালি ও প্রয়োজনীয় ছোটখাটো সব থাকত, ওটা তখনও আমার কাঁধে আটকানো ছিলো। আমি তাকিয়ে দেখলাম আমার সঙ্গীরা সব ডেকের রেলিংয়ে আটকে আছে। অনেকেই সাগরবক্ষে পড়ে গিয়ে সাঁতার কাটছে। আমি দেখলাম আমার পাশেই আমার এক সঙ্গীর রাইফেলখানা গড়া গড়ি খাচ্ছে। আমি ওটা অতিকষ্টে হাতের মুঠায় ধরে ফেললাম। কিন্তু আর কিছু ভাববার সময় পেলাম না। জাহাজখানা শূন্যে উঠে গেলো, সাগরবক্ষ হতে কিছুটা উপরে। তারপর ভীষণ একটা শব্দ। আমার কাঁধের বেল্টের সঙ্গে রাইফেলখানা বেঁধে ফেলেছি এই ভয়াবহ মুহূর্তেও।
আমি মনকে শক্ত করে নিয়েছি যেন, সংজ্ঞা না হারাই। সাগরে পড়লেও যেন মাথুনের মাটিতে পা রাখতে পারি এটাই হলো আমার শেষ চিন্তা। সঙ্গীদের কথা তখন ভাবনার সময় ছিলো না! মনে পড়লো বাবার কথা। তিনি বলেছিলেন, আজও সেই মাথুন দ্বীপে কোনো জাহাজ গিয়ে পৌঁছতে সক্ষম হয়নি। তুমিও পারবেনা ডাওনা কারণ মাথুনদ্বীপের সন্নিকটেই সেই ডুবুপর্বত যা প্রশান্ত মহাসাগরের তলে অবস্থিত। তারই কোনো এক গুহায় বাস করে এক বৃহৎ আকার জলজীব যার আকৃতি মানুষের মতোই।
আমাদের জাহাজখানা প্রচন্ড আওয়াজ করে সাগরে এসে পড়লো। কে কোথায় ছিটকে গেলো জানি না। আমি সাঁতার কাটতে কাটতে দেখলাম আমাদের প্রিয় জাহাজখানা একটি খেলনা জাহাজের মত কাৎ হয়ে তলিয়ে যাচ্ছে। আরও একটি ভয়ংকর দৃশ্য আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো, গভীর জলরাশির বুকে মৃত্যুর সঙ্গে বোঝাপড়া করে চলেছি তবুও এমন ভয়ংকর দৃশ্য আমি দেখলাম যা আমার জীবনের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে যদি আমি বেঁচে থাকি। দেখলাম বিরাট এবং মনুষ্য আকৃতির একটি জীব দাঁড়িয়ে আছে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে। তার হাতের মুঠায় পুতুলের মত আমাদের কোনো এক সঙ্গীকে দেখলাম, সে হাত পা ছুড়ছে সাগরের পানিতে আছড়ে পড়ার জন্য।
কিন্তু তখন নিজের জীবন রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে সাঁতার কাটছি। কাঁধে আমার প্রিয় ব্যাগ আর পিঠের সঙ্গে রাইফেল বাধা রয়েছে।
দূরে মাথুনদ্বীপ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
আমি সেইদিক লক্ষ্য করে সাঁতার কেটে চললাম। সঙ্গীসাথীরা কোথায় গেলো এ কথা ভাববার সময় নেই আমার। অবশ্য আমার সঙ্গীরা সকলেই সাঁতার জানতে খুব ভাল। অনেকেই ডুবুরী ছিলো, তারাও সাঁতার কেটে মাথুনের দিকে এগুচ্ছে আমি লক্ষ্য করলাম।
জীবটা আমাদের দিকে অগ্রাহ্যভরে তাকালো। ধরবার কোনো চেষ্টা করলো না, সে অর্ধ নিমজ্জিত জাহাজখানা পুনরায় তুলে নেওয়ার জন্য উবু হয়ে হাতড়াচ্ছে বলে মনে হলো। কিন্তু আমার ওসব দেখবার মত অবস্থা নয়। প্রচন্ড ঢেউ প্রতিহত করে আমাকে এগুতে হচ্ছিলো। আমার কাঁধে ব্যাগ এবং ভারী রাইফেল।
জানিনা আমার ভাগ্যে কি আছে।
আমি অতি কষ্টে, ভয়ংকর এক অবস্থার মধ্যে এক সময় আমার চির আকাঙিক্ষত দ্বীপে এসে পৌঁছে গেলাম। তখন আমার অবস্থা শোচনীয়। মাটি-কাদা মাখা অবস্থায় মাথুনের মাটিতে পড়ে রইলাম বহুক্ষণ ধরে।
ভাগ্যিস তখন প্রখর রৌদ্র ছিলো তাই শরীরটা ধীরে ধীরে উষ্ণ হয়ে উঠলো। শক্ত হলো দেহটা, সংজ্ঞাহারার মতই হয়েছিলো। তারপর সংজ্ঞা ফিরে এলো যেন আমার।
চোখ মেলে তাকালাম, দেখলাম আমার অদূরে আর একজন উবু হয়ে পড়ে আছে। হামাগুড়ি দিয়ে এগুলাম, মনে হলো লোকটা মরে পড়ে রয়েছে। কিন্তু কাছে যেতেই বুঝলাম লোকটা মরে যায়নি সে জীবিত আছে। আমি তাকে চিনলাম, সে আমাদেরই একজন নাবিক।
আমি তাকে চিৎকার করে ডাকলাম কিন্তু কোনো জবাব সে দিলো না। আমি চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি, এই সেই মাপুন দ্বীপ যে দ্বীপের সন্ধানে কত লোক আজ কত দিন ধরে জীবনের সঙ্গে সগ্রাম করে চলেছিলাম। মাটির দিকে তাকিয়ে আনন্দে চোখ দুটো দীপ্ত হয়ে উঠলো আমার। চারদিকে সোনার কণিকা ছড়ানো রয়েছে, উহ্ কি যে খুশি লাগছে আমার!
অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ালাম।
কিছুটা এগুতেই দেখলাম আরেকজন, তাকে দেখবামাত্র খুশিতে বলে উঠলেন– ক্যাপটেন লোরী তুমিও তা হলে এসে গেছে বন্ধু।
ক্যাপ্টেন লারীও ধুলো কাদা মাখা অবস্থায় আমার দিকে এগিয়ে আসছে। তার অবস্থাও আমার মত। বেচারা সাঁতার কেটে মাথুনে এসে পৌঁছতে পেরেছে।
জাহাজখানা ভাগ্যক্রমে মাথুন দ্বীপের কাছাকাছি এসে সেই ভয়ংকর জলজীবের কবলে পড়েছিলো এবং জাহাজখানা বিনষ্ট হয়েছিলো। তাই আমরা সাগরের উত্তাল তরঙ্গের সঙ্গে মরণপণ লড়াই করেও মাথুন দ্বীপে এসে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছি।
সংজ্ঞাহীন নাবিকটির সংজ্ঞা ফিরে এলো। সংখ্যায় তিন জন হলাম। জাহাজ এবং অনেক জিনিসপত্র ও সঙ্গী সাথী হারিয়েও আমাদের আনন্দ ধরছে না। কারণ আমরা আমাদের লক্ষ্যস্থলে পৌঁছতে পেরেছি। সেদিন ফিরে যাবার কথা তেমন করে মনে পড়ছিলো না। শুধু সোনা আর মাটি আমাদের দু’নয়নকে পরিতৃপ্ত করে তুলছিলো। বাবার মুখে যা শুনেছিলাম তাই দেখতে পাচ্ছি। আরও কয়েকজন সঙ্গীকে আমরা খুঁজে পেলাম, তারাও আমাদের মত সাঁতার কেটে কেটে এসে পৌঁছেছে। চব্বিশজন সঙ্গী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম, মাথুন দ্বীপে আমি পেলাম উনিশজনকে আর বাকি ক’জন প্রাণ হারিয়েছে।
