লুসি বললো–বাবা, আমার ভীষণ জানার বাসনা জাগছে। সব যেন কেমন রহস্যময় মনে হচ্ছে।
হাঁ ঠিক তাই সবই বিস্ময়কর বটে। বললেন ক্যাপটেন আরফিন হুই।
ডিরোমা হস্তস্থিত মরচে ধরা শক্ত রাইফেলখানা এক পাশে ঠেশ দিয়ে রেখে এগিয়ে এসেছে ক্যাপটেন আরফিন হুইয়ের পাশে। ডায়রীর কথাগুলো তার মনকেও উদ্বিগ্ন করে তুলেছিলো। না জানি ঐ থেমে থাকা জাহাজখানার ভেতরে কি রহস্য আত্মগোপন করে আছে। বললো ডিরোমা–আমরা একেই এক বিভীষিকাময় রহস্যজালে জড়িয়ে পড়েছি, আমার ধৈৰ্য্য আর থাকছে না।
তোমরা যেমন অধৈর্য হয়ে উঠেছে আমিও ঠিক তাই। কথাগুলো বলে ক্যাপটেন আরফিন হুই আবার ডায়রীখানার পাতা অতি সাবধানে উল্টে চললেন।
যা দেখলাম তাতে আমাদের চক্ষুস্থির হলো। জাহাজের বিভিন্ন স্থানে যারা যেভাবে কর্মরত ছিলো ঠিক তেমনি ভাবে আছে। ক্যাপটেনের বন্ধু বললেন–নিশ্চয়ই ঐ জাহাজে এমন কিছু ঘটেছে যার জন্য ঐ জাহাজখানা মারাত্নক কোনো দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে। আমরা এবার আমাদের জাহাজ হতে সেই জাহাজে অবতরণের জন্য প্রস্তুত হলাম। কিন্তু ঐ জাহাজে পা রাখবার সঙ্গে সঙ্গে আমার একজন সঙ্গী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। আমরা আশ্চর্য হয়ে তাকে প্রশ্ন করলাম, অমন হা করে তাকিয়ে রইলে কেন এগিয়ে যাও। কিন্তু একটি কথাও সে উচ্চারণ করলো না। আমার বন্ধু ক্যাপটেন লোরী বললো–খবরদার কেউ ঐ জাহাজে অবতরণ করো না। তোমাদেরও ঐভাবে মৃত্যু ঘটবে। সমস্ত জাহাজখানা কারেন্ট সংযুক্ত হয়ে আছে। ভাই ডাওনা, তুমি একজন সঙ্গী হারালে।
আমার দু’চোখে তখন বিস্ময়, একটি কথাও বলতে পারলাম না। সব যেন গভীর রহস্যজালে আচ্ছন্ন হয়ে আসছে।
আমিও স্থিরদৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইলাম আমার সঙ্গী যে প্রথমে ঝুলন্ত সিঁড়ি বেয়ে থেমে। থাকা জাহাজখানায় অবতরণ করেছিলো। বেচারীর জীবন নেই তবুও সে তাকিয়ে আছে অসহায় চোখে হয়তো বা কিছু বলবে বলেই চেষ্টা নিচ্ছিলো কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বলা হলো না। আমাদের সময় অল্প কারণ খাবার ফুরিয়ে আসছে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা প্রশান্ত মহাসাগরে পাড়ি জমিয়েছি তাই সমাধা করতে হবে। থেমে থাকা বিস্ময়কর জাহাজখানার রহস্য উদঘাটন করার সময় হলো না। শুধু বুঝতে পারলাম কোন কারণে সমস্ত জাহাজখানা কারেন্ট যুক্ত হয়ে পড়েছে। আরও একটা জিনিস আমরা লক্ষ্য করলাম–সেই বিস্ময়কর জাহাজখানা লৌহ পাত দ্বারা মোড়ানো। যার জন্য জাহাজটির সবাই একসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছে। যে যেখানে যেমন অবস্থায় ছিলো ঠিক তেমনি আড়ষ্ট হয়ে রয়েছে। তাদের সঙ্গে আমাদেরও একজন মূর্তির মত আড়ষ্ট হয়ে রইলো।
ওর জন্য দুঃখ হচ্ছিলো কিন্তু ওকে তুলে নেবার কোনো উপায় ছিলো না। আমরা ওকে অমনিভাবে রেখে ফিরে চললাম। ডেকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলাম সেই অদ্ভুত জাহাজখানার দিকে।
সূর্যের আলোতে সব কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। অনেক দূর এগিয়ে গিয়েও লক্ষ্য করলাম–আমাদের সঙ্গীটি অমনি উপরের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে। বড় মায়া হচ্ছিলো ওকে একা রেখে যেতে, হু হু করে মনটা কেঁদে উঠলো।
তারপর দুটো দিন অতিবাহিত হলো। কেন যেন আমাদের সেই সঙ্গীটির কথা বার বার মনকে নাড়া দিচ্ছিলো। হয়তো আরও কত বিপদ আছে আমাদের সামনে কে জানে আরও কত জন প্রাণ হারাবে। আমি নিজেও বাচবো কিনা তাই বা কে বলতে পারে তবুও কেন যেন ওর কথা ভুলতে পারছিলাম না।
ভাবছিলাম এখনও কি ও অমনি করে উপরের দিকে তাকিয়ে হা করে দাঁড়িয়ে আছে? যেমন ঐ জাহাজে আরও অনেকজনকে দেখেছি।
ক্যাপটেন বন্ধু আমাকে অন্যমনস্ক দেখে বারকয়েক গালমন্দ করেছেন কেন এমন উদাসীন হলাম। বন্ধুর কথায় হাসি পেতে আমার, ঠিকই বলেছেন ক্যাপটেন বন্ধু। শেষ অবধি আমাদের অদৃষ্টে কি আছে তাইবা কে জানে।
একদিন আমরা মাথুন দ্বীপ দেখতে পেলাম। বাবার মুখে শোনা সেই অদ্ভুত দ্বীপ। খুশিতে আমরা উজ্জ্বল হয়ে উঠলাম। আমরা আনন্দে অধীর হয়ে করতালি দিচ্ছি। সেই সামুদ্রিক অদ্ভুত ভয়ংকর জীবটা তাহলে আর আমাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালো না। হয়তো বা এতোদিনে মৃত্যুবরণ করেছে জীবটা।
আমাদের সঙ্গে যারা ছিলো তারা সবাই নিশ্চিন্ত। কারণ আমরা মাথুন দ্বীপের একেবারে কাছাকাছি এসে গেছি। ভাগ্য বলতে হবে নইলে কোনো জাহাজ আজ পর্যন্ত মাথুন দ্বীপের সন্নিকটে পৌঁছতে সক্ষম হলো না। যে কোন জাহাজ মাথুন দ্বীপের কাছাকাছি এসে পড়তেই একটি ভীষণ আকার জীব জাহাজখানাকে খেলনা জাহাজের মত হাতের মুঠোয় তুলে টুকরো টুকরো করে ফেলে। জাহাজখানা বিনষ্ট হয়েই তার সঙ্গে সমস্ত যাত্রী প্রাণ হারায়। সলিল সমাধি হয় তাদের।
এতোক্ষণ লুসি নিশ্চুপ শুনে যাচ্ছিলো, এবার সে বলে উঠলো–বাবা, এ ডায়রীখানার লেখক যে সেই এই নরখাদক..
বললেন ক্যাপটেন আরফিন হুই–ডায়রীখানা পড়া শেষ করলে হয়তো সব জানতে পারবো। ডায়রীখানার শেষ দিকটা বেশ নষ্ট হয়ে গেছে।
তোমার যদি কষ্ট হয় তাহলে আমাকে দাও বাবা। আমি না হয় পড়তে চেষ্টা করি?
না মা, আমিই পারবোএকটু থেমে বললেন ক্যাপটেন হুই, তারপর পড়তে শুরু করলেন
আমরা মাথুনদ্বীপ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। বাবার মুখে যে বর্ণনা আমি শুনেছিলাম তাই দেখছি কাজেই আমার সব চিন্তার অবসান হলো। সবাই আমার সঙ্গী সাথীরা মিলে আনন্দধ্বনি করছি। আমার ক্যাপটেন বন্ধু আমার করমর্দন করে বললেন–বন্ধু তুমি জয়ী……কিন্তু তার কথা শেষ হতে না হতেই একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেলো। আমাদের জাহাজখানা এক দিকে কাৎ হয়ে গেলো অকস্মাৎ। সমস্ত জাহাজ একপাশে কাৎ হবার সঙ্গে সঙ্গে আমরা গড়িয়ে পড়লাম। তেলের ড্রাম এবং পানির ড্রামগুলো সব গড়িয়ে গেলো একদিকে। কেউ কেউ ড্রামের আঘাতে আহত হলো। জাহাজের জিনিসগুলো গড়িয়ে পড়লো তার সঙ্গে অনেকেই ছিটকে পড়লো সমুদ্রে।
