ক্যাপটেন হুই গুহার বাইরে বেরিয়ে এলেন।
লুসি এবং অন্যান্য সবাই ক্যাপৃটেন আরফিন হুইয়ের সঙ্গে বেরিয়ে এলো। সকলের দৃষ্টি তার হস্তস্থিত ডায়রীখানার দিকে।
একটি পাথরখন্ডের উপরে বসলেন ক্যাপটেন আরফিন হই এবার তিনি ডায়রীখানা পুনরায় পড়তে শুরু করলেন–
আমার প্রচেষ্টা সার্থক হলো। আমার বন্ধু-বান্ধবদের খুব করে বোঝালাম। এক মাস দুমাস তারপর এক বছর দু’বছর এমনি করে কয়েক বছর ধরে নানাভাবে বুঝিয়ে তাদের রাজি করলাম। তখন দেখা গেলো চব্বিশজন লোক আমার সঙ্গে মাথুনদ্বীপে যাবার জন্য তৈরি হলো। আনন্দ আমার ধরছে না। আমার বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে হাজির হলাম বাবার সামনে। সব শুনে বাবার চোখ কপালে উঠলো। তিনি ভাবতেও পারেননি আমি মাথুন দ্বীপে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছি। বাবার একমাত্র সন্তান আমি। আমাকে নিয়ে বাবার অনেক আশা-ভরসা। আমাকে বাবা লেখাপড়া শিখিয়ে মস্তবড় একজন মানুষ হিসেবে তৈরি করেছেন। বাবা চাইলেন না আমি বাবার সে ইচ্ছাটা পূর্ণ করি।
কিন্তু বাবার কোনো আপত্তিই টিকলো না। আমার বন্ধু ক্যাপটেন ক্যালোরালোরী তার জাহাজখানা আমাকে ব্যবহার করতে দেবেন বলে রাজি হলেন। তিনিও আমাদের সঙ্গে যাবেন বলে চিন্তাভাবনা করে নিয়েছেন।
বন্ধু-বান্ধব নিয়ে সত্যি সত্যি একদিন আমি বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের জাহাজ প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিচ্ছে। আমরা চলেছি মাথুন দ্বীপের উদ্দেশ্যে।
লুসি বলে উঠলো–বাবা, এ যে ঠিক তোর নাবিক বন্ধুর ডায়রীর কাহিনীর মত……
হাঁ মা লুসি, কতকটা সেই রকমই লাগছে। শেষ দিকটা না জানি কত ভয়াবহ হবে ক্যাপটেন আরফিন হুই ডায়রীখানা পড়ছেন, অন্যরা স্তব্ধ নিঃশ্বাসে শুনছে।
দীর্ঘ দিন ধরে আমরা প্রশান্ত সহাসাগর পাড়ি দিচ্ছি। মাটির সঙ্গে আমাদের কোনো সাক্ষাৎ নেই। আমার সঙ্গে প্রচুর খাবার নিয়েছি তাই খেয়ে জীবন ধারণ করছি। সমুদ্রের পানি পান করা সম্ভব নয়, তাই খাবার পানি কয়েক ড্রাম নিয়েছি সাথে।
অবসর সময় কাটানোর জন্য নানা রকম বাদ্যযন্ত্র এবং খেলাধূলার সরঞ্জাম নিয়েছি। খুব আমোদেই কাটছে আমাদের। তবে ভয়ও হচ্ছে শেষ পর্যন্ত আমরা মাথুন দ্বীপে পৌঁছতে পারবো কিনা। একবার নয় দু’বার আমরা সাইক্লোনের কবলে পড়েছি। জাহাজখানা রক্ষা পেয়েছে করুণাময়ের অসীম দয়ায়।
মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে ফিরে যাই কিন্তু ক্যাপটেন ক্যালোরালোরী আমাকে সাহস যুগিয়ে চলেছেন। ক্যালো রালোরীর অফুরন্ত উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠ আমার মনকে সতেজ করে তুলছে। আমি একটুও তাই হতাশ হইনি।
ক্রমেই খাবার ফুরিয়ে আসছে। আমরা চিন্তিত হয়ে পড়ছি। মাখুনদ্বীপ আমাদের চেনাজানা নয় তাই অনেক পথ ঘুরেফিরে আসতে সময় কেটে যাচ্ছে। আমাদের কাছে কোনো ম্যাপ নেই। বাবার মুখে শোনা পথ ধরে জাহাজখানা এগুচ্ছে। মাঝে মধ্যে আমরা পথ হারিয়ে ফেলছি।
একদিন আমরা হঠাৎ একটি দ্বীপের সন্ধান পেলাম। গভীর রাতে দূরে বহু দূরে একটি আলোকস্তম্ভ দেখে আমরা অনুমান করলাম নিশ্চয়ই কোনো দ্বীপ হবে, তবে মাথুন দ্বীপ যে নয় তা সত্য। কারণ বাবা মুখে শুনেছি মাথুন দ্বীপে কোনো মানুষ বা জীবজন্তু নেই। এ কোন্ দ্বীপ যেখানে আলোকস্তম্ভ আছে এবং আলো জ্বালাবার জন্য মানুষ আছে?
আমরা রাতের অন্ধকারে আলো লক্ষ্য করে এগিয়ে চললাম। আমাদের মধ্যে সবাই খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠলো। কারণ খাবার পানি এবং খাদ্য দুটোই শেষ হয়ে এসেছিলো। নিশ্চয়ই ঐ দ্বীপে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাবো।
আমাদের জাহাজের স্পীড বাড়িয়ে দেওয়া হলো।
ঐ আলোকবিন্দু লক্ষ্য করে আমরা ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি। ক্রমে আলোর বলটা বড় হয়ে এলো। আমরা ক্রমান্বয়ে এগিয়ে চললাম আলোর বলটার দিকে।
কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমাদের জাহাজখানা আলোর বলটার নিকটে পৌঁছে গেলো। তখনও রাতের অন্ধকার জমাট হয়ে আছে। আমরা দেখলাম কোনো দ্বীপ নয়, একটা জাহাজ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আলোকটা সেই জাহাজের কোনো এক ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে আসছে।
সবার চোখেমুখে বিস্ময় ফুটে উঠলো। আমরা ভাবতেও পারিনি ওটা কোনো জাহাজের ক্যাবিনের আলো। মাঝসাগরে এমন স্থিরভাবে জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে, জাহাজে কোনো লোকজন আছে বলে মনে হলো না। ঐ একটিমাত্র ক্যাবিনে আলো জ্বলছে আর সমস্ত জাহাজখানা অন্ধকারে আচ্ছন। ক্যাপটেন আমাকে বললো, বিস্ময়কর ব্যাপার বটে। আমরা যা ভেবেছিলাম তা নয়। কোনো দ্বীপ বা কোনো আলোকস্তম্ভ নয়, একটি ভাসমান জাহাজ।
আমরা রাত ভোর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগলাম। যদিও আমরা সমস্ত রাত আমাদের জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে থেমে থাকা জাহাজখানার দিকে তীক্ষ্ণ লক্ষ্য রাখলাম তবুও কিছু আন্দাজ করতে পারলাম না। এক সময় ভোর হলো। পূর্বাকাশ ফর্সা হয়ে আসতেই আমরা সজাগ হয়ে উঠলাম। ঠান্ডায় খোলা আকাশের নিচে জমে যাবার উপক্রম হয়েছিলো যদিও শরীরে আমাদের মোটা পশমী কোট আর মাথায় ক্যাপ ছিলো। সূর্যের আলো প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে রূপালী চাঁদ বিছিয়ে দিলো।
আমরা তখন স্পষ্ট দেখতে পেলাম ঐ থেমে থাকা জাহাজখানার উপরে। দূরবীক্ষণ যন্ত্র চোখে লাগিয়ে জাহাজখানার ভেতরের অংশ লক্ষ্য করতে লাগলাম।
থামলেন ক্যাপটেন আরফিন হুই। তার চোখে বিস্ময় ঝরে পড়ছে। তিনি তাকালেন কন্যা লুসির দিকে।
