হঠাৎ লুসি বলে উঠলো—বাবা, বাবা ঐ দেখো একটা মোটা বই…ঐ যে…আংগুল দিয়ে লুসি দেখিয়ে দিলো গুহার মধ্যে একটা পাথরখন্ডের ওপরে একটা বই রয়েছে।
ক্যাপটেন আরফিন হুই এগিয়ে গিয়ে বস্তুটি হাতে তুলে নিলেন এবং বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন–এটা বই নয়–এটা ডায়রী। বহুদিন ব্যবহার না হওয়ায় ময়লা জমে এমন হয়েছে।
যারা গুহায় প্রবেশ করেছিলো তারা সবাই ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগলো। সকলের চোখেমুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছে। যে নরখাদক তাদের ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছিলো সেই নরখাদক কি তবে একজন সাধারণ মানুষ!
লুসি ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে বললোবাবা, ডায়রী ওটা?
হাঁ মা, এটা একটা ডায়রী। কিন্তু বড় নরম হয়ে উঠেছে কাগজগুলো…ক্যাপটেন আরফিন দুই ডায়রীখানা মেলে দেখতে লাগলেন। ফুল্লরা নরকংকালগুলোর দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছিলো।
জাভেদ মরচে ধরা রাইফেলখানা হাতে তুলে নিয়ে দেখতে লাগলো। বহুদিন এটাতে হাত না পড়ায় একেবারে মরচে ধরে জমাট শক্ত হয়ে উঠেছে। ক্যাপটেন আরফিন হুই ডায়রীটা হাতে নিয়ে তাকালেন রাইফেলখানার দিকে। তার মুখমন্ডলে একটা বিরাট জানার বাসনা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সব যেন রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে তার কাছে।
লুসি বললো–বাবা, তুমি ডায়রীখানা পড়তে পারো কিনা দেখো তো? আমাদের মনে হচ্ছে ডায়রীখানার মধ্যে আমরা নরখাদকের জীবন সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে পারবো।
হাঁ মা, তোমার কথা সত্য। আমরা এ ডায়রী থেকে অনেক কিছু জানতে পারবো বলে আমার মনে হয়। তবে কাগজগুলো এতো নরম আর মচমচে হয়ে পড়েছে যে, হাত স্পর্শ করানো যাবে কিনা সন্দেহ। সত্যি আশ্চর্য, নরখাদক এত নরদেহ পেলো কোথা হতে। স্তূপাকার নরকংকালগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন ক্যাপটেন আরফিন হুই।
কারও মুখে কোনো কথা নেই, সবাই হতবাক বিস্মিত, সব যেন তাদের কাছে অদ্ভুত কান্ড বলে মনে হচ্ছে। নির্জন দ্বীপে এত গুলো মানুষকে হত্যা করে লোকটা খেয়েছে এটা কম বিস্ময়কর নয়।
ক্যাপটেন হুই ডায়রীখানা মেলে ধরলেন, আরও আশ্চর্য হলেন তিনি ডায়রীখানায় সুন্দর ইংরেজী ভাষায় লেখা আছে আমার জীবন কাহিনী—ডঃ ডাওনার্ড।
আমার জাহাজ এখন প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিচ্ছে। যাত্রাকাল হতে আজ পর্যন্ত আমরা বহু বিপদ পেরিয়ে এসেছি। আমার বাবার মুখে শুনেছিলাম মাথুন দ্বীপের কথা। তিনি বলতেন মাথুন দ্বীপে একটি সোনার খনি আছে। শুধু সোনা আর সোনা। কোনোক্রমে এ দ্বীপে পৌঁছতে পারলে তার জীবনে কোনো অভাব থাকবে না। কিন্তু বাবা বলতেন ঐ দ্বীপে মানুষ বা কোন জীবজন্তু নেই। মাথুন দ্বীপে কোনোদিন কোনো জাহাজ গিয়ে পৌঁছতে পারে না। মাথুন-এর কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে একটি ডুবুপর্বত আছে, ঐ পর্বতের মধ্যে একটি গুহায় অদ্ভুত ধরনের এক জীব বাস করে যার আকার ভয়ংকর এবং বিশাল। সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে থাকে সে সর্বক্ষণ, মাঝেমধ্যে সে মাথা উঁচু করে পৃথিবীর আলো বাতাস উপভোগ করে। সে নাকি বৃহৎ আকার তিমি এবং এই ধরনের জলীয় জীব খেয়ে জীবন ধারণ করে। কোনো জাহাজ বা কোনো জলযান যদি ভুলক্রমে মাথুন দ্বীপের কাছাকাছি এসে পড়ে তাহলে আর রক্ষা নেই, জাহাজখানাকে অনায়াসে সে তলিয়ে দেয় এবং মানুষগুলোকে খেয়ে ফেলে। এটা ঐ ভয়ংকর জীবটার নেশা।
আমাদের জাহাজ যতই এগুচ্ছে ততই মনে একটা বিপদের আশঙ্কা জাগছে। বাবা বলেছিলেন মাধুনে যাবার জন্য আমি বহুবার তৈরি হয়েছি কিন্তু হয়ে ওঠেনি। জাহাজ গুছিয়ে নেওয়ার পর সঙ্গী-সাথীরা সবাই পিছিয়ে গেছে জীবনের ভয়ে। কারণ তারা জানে মাথুন দ্বীপে যাওয়া অসম্ভব। আজ অবধি কেউ ঐ দ্বীপে পৌঁছতে পারেনি। বাবার এ উক্তি আমার মনকে আরও নাড়া দিলো। একটা শপথ গ্রহণ করলাম নিজের মনে। বাবার ইচ্ছা আমাকেই পূর্ণ করতে হবে, যেমন করে তোক জীবন মরণ শপথ নিয়ে যাবোই আমি মাথুন দ্বীপে। জাহাজ ভর্তি করে সোনা নিয়ে আসবো, দেশের সবচেয়ে বড় ধনবান হবো আমি–ডঃ ডাওনা লর্ড।
ক্যাপ্টেন আরফিন হুই অনেক চেষ্টা এবং কষ্ট করে ডায়রীর লেখাগুলো পড়ছিলেন। ডায়রীর পাতাগুলো ধীরে ধীরে নাড়া-চাড়া করতে হচ্ছিলো তার। ডায়রীখানা তিনি এমন যত্ন সহকারে হাতের মধ্যে ধরেছিলেন যেন খুলে বা ছিঁড়ে না যায়।
লুসি আর অন্যান্য সবাই অবাক বিস্ময়ে শুনছিলে না।
ডিরোমা রাইফেলখানা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলো।
জাভেদ কিন্তু ডায়রীর লেখাগুলো শুনছিলো না, সে অন্যদিকে ঘুরেফিরে ভালভাবে দেখছিলো। ফুল্লরাও জাভেদের পাশে পাশে এগুচ্ছিলো এবং দু’একটা প্রশ্ন করছিলো। সকলেই একটা দারুণ উল্কণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছে।
ক্যাপ্টেন আরফিন হুইকে লক্ষ্য করে বললো লুসি-বাবা, তুমি পড়ো কারণ ঐ ডায়রীখানার মধ্যে কি লেখা আছে আমরা জানতে চাই। তোমার বন্ধুর ডায়রী থেকে তুমি জানতে পেরেছিলে মাথুন দ্বীপ সম্বন্ধে। আর ডাঃ ডাওনা লর্ড তার বাবার ডায়রী থেকে। জেনেছিলেন। বাবা, নরখাদকটি তাহলে তোমার আমার মত একজন সভ্য মানুষ?
হাঁ মা, নরখাদটিই যে ডঃ লর্ড কিনা এটা এখনও ঠিক বুঝতে পারছি না। কিংবা ঐ নরকংকালগুলোর মধ্যেও থাকতে পারে উঃ লর্ডের কংকাল।
ঠিক বলছো বাবা, ডায়রীখানা না পড়া পর্যন্ত আমরা সঠিক কিছু অনুধাবন করতে পারছি না।
