অন্যান্য সকলের সঙ্গে লুসি আর ফুল্লরা।
লুসি ফুল্লরার হাত ধরে সাহায্য করছে তার চলায়। কখনও বা হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছে ফুল্লরা, কখনও বা বসে পড়ছে মাটিতে কারণ তার পা দু’খানা বড় অবশ লাগছিলো।
ফুল্লরার ইচ্ছা নয় সে লুসির সাহায্য গ্রহণ করে। সে চায় না তার হাত ধরে তুলে দেয় লুসি। ফুল্লরা তবুও অনিচ্ছাসত্বেও লুসির হাত ধরতে বাধ্য হচ্ছিলো।
এক সময় পর্বতমালার সেই অংশে পৌঁছে গেলে সবাই মিলে। দেখলো তারা নরখাদকটি তার অতি প্রিয় খাদ্য গলিত নরদেহটার উপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। তার হাতের মুঠায় আধ-খাওয়া একখানা হাত। জাভেদ বা হাতে নরখাদটিকে চীৎ করে ফেললো।
একসঙ্গে সবাই চমকে উঠলো নরখাদকটির কি ভয়ংকর চেহারা। এতদিন কেউ তাকে স্পষ্টভাবে দেখবার সুযোগ পায়নি। আজ সবাই হতবাক হয়ে দেখছে। সমস্ত শরীরে ময়লা জমে কালো কয়লার মত লাগছে। মাথার চুল প্রায় পিঠের মাঝামাঝি কাঁধে ঘাড়ে জটা ধরে খোবড়ার মত পড়ে আছে। দাড়ি আর গোঁফে ঢাকা গোটা মুখ। দাড়ি আর গোঁফে মানুষের রক্ত আর মাংসের রক্ত শক্ত হয়ে জমে আছে। প্রু চোখের উপর ঝুলে পড়েছে। দাঁতগুলো মস্ত বড় এবং ময়লা জমে পাথরের তৈরি দাঁত মনে হচ্ছে। দাঁতগুলো ভীষণ বড়, ঠোঁটের নিচে ঝুলে পড়েছে। পিঠের এ পাশে জাভেদের নিক্ষিপ্ত বিষাক্ততীর বিদ্ধ হয়ে আছে।
জাভেদ নরখাদকের প্রাণহীন দেহ হতে বিষাক্ত তীরখানা একটানে তুলে নিলো।
ক্যাপটেন আরফিন বললেন–বিস্ময়কর মানুষ! মানুষের মাংস খেয়ে ওর এমন একটা নেশা ধরে গিয়েছিলো যার জন্য সে ভয়ংকর হয়ে উঠেছিলো।
ডিরোমা বললো–ওটা মানুষ নয়, ভূত অথবা রাক্ষস!
হাসলো লুসি–ভূত আছে নাকি? তবে রাক্ষস হতে পারে। জাভেদ রাক্ষসটিকে বধ করে বাবার যাত্রাকে জয়যুক্ত করে তুললো।
ডিরোমা মুখখানা ভার করে ফেললো। একটা হিংসাত্নক মনোভাব তার ভেতরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। একবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো সে জাভেদকে।
ক্যাপটেন আরফিন হুইয়ের ক্লান্ত জড়ানো মুখোভাব এক্ষণে দীপ্ত হয়ে উঠেছে। তার দেহের ক্ষতগুলো যেন মুহূর্তে সম্পূর্ণ সেরে গেছে। আরফিন হুই জাভেদের হাতখানা মুঠায় চেপে বললেন-বন্ধু, আমার প্রিয় সন্তান, আমার স্নেহের জাভেদ, তোমার জন্য আমার প্রাণভরা আশীর্বাদ রইলো। তুমি আমাকে সর্বতোভাবে জয়ী করলে……আমি ভাবতেও পারিনি নরখাদকটিকে এভাবে এত সহজে নিপাত করতে সক্ষম হবে। শুধু তোমার জন্য আমরা এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারলাম।
জাভেদ বললো—আপনারা এবার আপনাদের কাজ সমাধা করুন।
হাঁ জাভেদ, তোমার কথা ঠিক। এবার আমরা কাজ শুরু করবো তবে আমার ইচ্ছা একবার পতটা পরীক্ষা করে দেখবো।
হাঁ বাবা, ঠিক বলেছো। আমরা পর্বতটার উপরে উঠতে চাই। কিন্তু তোমার কষ্ট হবে বাবা!
না মা, আমার কষ্ট হবে না। তোমাদের সাহায্য পেলে আমি অনায়াসে পর্বতমালার উপরে উঠতে পারবো। কিন্তু তার পূর্বে এই নরখাদকটির সম্বন্ধে আমার জানা দরকার। ক্যাপটেন আরফিন দুই তীক্ষ্ণ নজরে দেখতে লাগলেন নরখাদটিকে। নরখাদকটির হা করা মুখগহ্বরে তখনও নরমাংস ভর্তি রয়েছে। একটা পচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।
লুসি আর ফুল্লরা নাকে রুমাল চাপা দিলো।
অন্যান্য নাবিকও নাক ধরেছে।
সকলের চোখেমুখে বিস্ময়কর ভাব ফুটে উঠেছে, সবাই দেখছে অবাক চোখে। তাদেরই একজন সঙ্গীর করুণ অবস্থা দর্শন করে সকলে মর্মাহত হলো, কি ভয়ংকর নৃশংস দৃশ্য! অনেকেই মৃত দেহটার অংশবিশেষ দেখে তাদের সঙ্গীকে চিনতে পারলো।
ক্যাপ্টেন আরফিন হুই বললেন নাবিক ডান্ হুইয়ের শেষ পরিণতি এটা!
অন্যান্য নাবিক বললো—-হা ক্যাপটেন আমরাও চিনতে পেরেছি ডন হুইয়ের গলিত দেহটা…..
সকলে মিলে নাকে কাপড় চাপা দিয়ে ডন হুইয়ের গলিত দেহটা পর্বতের গায়ে একটা গর্ত খনন করে ঢেকে দিলো।
তারপর সবাই পর্বতটার উপরিভাগে উঠতে লাগলো।
ক্যাপটেন হুইয়ের দেহ বেদনায় জর্জরিত, তাই তিনি খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন তবুও উপরে উঠতে লাগলেন। লুসি আর ডিরোমা তাকে সাহায্য করছিলো।
অদ্ভুত আর অপূর্ব।
রৌদ্রশিখায় পর্বতমালাটিকে মণি-মুক্তাখচিত কোনো পর্বত বলে মনে হচ্ছে। সবাই মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছে। এত সুন্দর আর মনোরম দৃশ্য এ পৃথিবীতে কোথাও বুঝি নেই। ক্যাপটেন আরফিন হুই উচ্ছল আনন্দে ভরপুর। তার চোখ দুটো দীপ্ত উজ্জ্বল মনে হচ্ছে।
লুসি পিতার মুখের দিকে তাকিয়ে বেশ তৃপ্তিবোধ করছে। এ দ্বীপে যাকে ভয়, তার নিপাত ঘটেছে। এবার ক্যাপটেন হুই আনন্দমুখর হয়ে উঠেছেন। সবাইকে নিয়ে নরখাদকটির মৃতদেহ টেনে পর্বতটার এক উচ্চস্থানে নিয়ে এলেন ক্যাপটেন হুই। এবার তার দেহটা নিচে নিক্ষেপ করবেন।
এমন সময় জাভেদ ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছুটে এলো, ক্যাপটেন হুইকে লক্ষ্য করে বললো— বাবা এদিকে এসো……বাবা এদিকে এসো..
ক্যাপটেন আরফিন হুই এবং তার দলবল সবাই জাভেদের দিকে এগিয়ে গেলেন। বিস্ময়ভরা চোখে তারা দেখলো একটা গুহার মধ্যে বহু নরকংকাল স্তূপাকার হয়ে রয়েছে। একটা মরচে ধরা রাইফেল শক্ত হয়ে পড়ে আছে এক পাশে।
জাভেদ বললো—এই গুহায় নরখাদকটা বাস করতো।
ক্যাপটেন আরফিন হুই বলে উঠলেন–ঠিক চলেছে জাভেদ, এই গুহায় ঐ নরখাদকটা বাস করতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নরখাদকটা এই দ্বীপে কি ভাবে এলো চিন্তার বিষয়। তবে আমার মনে হয় সে আমাদেরই মত সাধারণ মানুষ……
