লুসি ভাবনার খেই হারিয়ে ফেলে।
হঠাৎ চমকে ওঠে লুসি।
সবাই এগিয়ে চলছিলো। ঘন জঙ্গল পেরিয়ে এখন তারা সামনের পর্বতমালার দিকে এগুচ্ছিলো। মাথুন দ্বীপে এমন পর্বতমালা আছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, কারণ ঘন জঙ্গলে গোটা আকাশটা যেন ঢাকা পড়ে গিয়েছিলো। জঙ্গল পেরিয়ে এপারে এসে অবাক হলো সবাই। ক্যাপটেন আরফিন হুই জানেন না। এ দ্বীপটা কত বড়, শুধু আরফিন হুই কেন কেউ জানে না। এতো বড় দ্বীপ, প্রশান্ত মহাসাগরের অর্ধেক জুড়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে একটা ভাসমান পৃথিবীর মত।
ক্যাপ্টেন আরফিন হুই এবং তার দলবল সবাই ক্ষান্ত হয়ে পড়েছে, গোটা জঙ্গলটা তারা জ্বলন্ত মশাল হাতে চষে ফিরেছে কিন্তু সেই নরখাদটিকে কোথাও খুঁজে পায়নি।
অনেকের দেহ কাঁটার আচড়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে।
বহু কাটা বিদ্ধ হয়েছে অনেকের শরীরে। পায়ে ভারী বুট থাকায় পা তাদের অক্ষত রয়েছে বটে কিন্তু চলৎশক্তি রহিত প্রায়।
ভোরের সূর্যকিরণে মাথুনের মাটিতে অসংখ্য সূর্য কণিকা ঝ ম করছে। চারদিকে শুধু অপূর্ব চুমকির ছড়াছড়ি। অতৃপ্ত নয়নে সবাই দেখছে কিন্তু কেউ একমুঠো হাতে তুলে নিচ্ছে না, কারণ তারা জীবন রক্ষার্থে মরিয়া হয়ে উঠেছে। সবার মনেই আতঙ্ক না জানি কোন্ মুহূর্তে ঐ নরখাদক আবার কাকে ধরে নিয়ে যায়।
জাভেদ সর্বাগ্রে চলেছে।
তার হাতে বিষাক্ত তীর-ধনু, একটি তীর ঐ নরখাদকের দেহে বিদ্ধ করতে পারলে তাদের আর কোনো ভয় থাকবে না। ওর মৃত্যু হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
জাভেদ একা একা গোটা জঙ্গলটা তন্নতন্ন করে খুঁজেছে কিন্তু কোথাও সেই নরখাদকের দেখা পায়নি।
একটি নয়, তিনজন নাবিক নিখোঁজ হয়েছে।
সবাইকে সেই বিস্ময়কর মানুষটা কাঁধে তুলে নিয়ে চলে গেছে অতি সহজে, সবার অজ্ঞাতে। ডিরোমা নিজেও ভীত হয়ে পড়েছে, সোনার মোহ তার কেটে গেছে। এবার নাবিকদের মধ্যে ডিরোমা বিদ্রোহ মনোভাব জাগিয়ে তুলেছে। সবাই জাহাজে ফিরে যাবার জন্য আগ্রহান্বিত, তারা ক্যাপটেন আরফিনের কথা শুনতে রাজি নয়।
কিন্তু ক্যাপ্টেন আরফিন বিফল মনে ফিরে যাবার লোক নন, তার ইস্পাতের মত কঠিন দেহটা ক্ষতবিক্ষত হলেও দৃঢ় তার মনোবল। হারিয়েছেন তার প্রাণপ্রিয় কয়েকজন নাবিককে। হারিয়েছেন দেহের শক্তি কিন্তু মনোবল তিনি হারাননি। নর খাদককে পরাজিত করে, তাকে হত্যা করে মাথুন দ্বীপকে শত্রুমুক্ত করবেন, তারপর ইচ্ছামত মাথুনের স্বর্ণ মেশানো মাটি জাহাজ ভর্তি করে নিয়ে যাবেন নিজের দেশে। আসবে কোটি কোটি টাকা, ইচ্ছামত দীনহীন গরিব মানুষদের মধ্যে তিনি বিলিয়ে দেবেন প্রাণভরে।
সে আশা কি পূর্ণ হবে ক্যাপটেন আরফিন হুইয়ের।
অনেকদিনের সাধ তার স্ত্রী এলুনের নামে একটি ধর্মশালা তৈরি করবেন। যে ধর্মশালায় লক্ষ লক্ষ অসহায় মানুষকে ধর্মশিক্ষা দেওয়া হবে। বাবার স্বপ্ন সব জানে লুসি, আরও জানে কত কষ্টই না করেছেন তিনি জীবনে।
ভাবছিলো আর পথ চলছিলো লুসি একজন নাবিক সামনে আংগুল দিয়ে দূরে দেখিয়ে উচ্চকণ্ঠে বললো—ঐ দেখুন ক্যাপটেন। ঐ দেখুন……
সকলের দৃষ্টি চলে গেলো দূরে অনেক দূরে পর্বতমালার মাঝামাঝি একটি অসমতল স্থানে। দেখা গেলো সেই ভয়ংকর নরখাদক ওদিকে মুখ করে একটি অর্ধগলিত মনুষ্যদেহ খাচ্ছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে একটি হাত মৃত দেহটা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে দাঁত দিয়ে মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে।
ক্যাপটেন আরফিন হুই কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, লুসি বললো–বাবা, তোমরা চুপ করো। একটু শব্দ শুনলেই পালিয়ে যাবে। জাভেদের দিকে তাকালো লুসি।
জাভেদের চোখ দুটো জ্বলছে।
হাতের তীরফলক ধনুতে সংযোগ করে লক্ষ্য করছে জাভেদ।
ক্লান্ত অবসন্ন ক্যাপটেন আরফিনের দলবলের চোখেমুখে ফুটে উঠলো একটা প্রতিহিংসার আগুন। তাদেরই সঙ্গী তিন জনকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে খেয়েছে ঐ নরখাদক।
জাভেদের তীর ততক্ষণে ধনু থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেছে।
মুহূর্তে পর্বতমালার মধ্যভাগে সমতল স্থানে সেই বিস্ময়কর মানুষটা ঢলে পড়লো। একটা শব্দও বের হলো না তার মুখ থেকে।
উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন আরফিন হুই ও তার দলবল সকলেই। ওরা ভুলে গেলে ক্লান্তি অবসাদ সব কষ্টের কথা।
লুসি ছুটে গিয়ে জাভেদের কণ্ঠ জড়িয়ে ধরলো, আনন্দ উচ্ছল কণ্ঠে বললো—জাভেদ, তুমি মহাবীর, অসীম সাহসী…..তুমি আমার বন্ধু…..আমার প্রিয়…।
ফুল্লরার মুখমন্ডল কালো হয়ে উঠলো, সে পছন্দ করলো না লুসি জাভেদকে ঘনিষ্ঠভাবে আলিঙ্গন করায়।
এদিকে সবাই ছুটলো সেই নরখাদকটির ভুলুণ্ঠিত দেহটার দিকে।
পর্বতমালার যে স্থানটিতে নরখাদক বসে তার শিকার খাচ্ছিলো ঐ জায়গাটি পর্বতের উপরিভাগের মাঝামাঝি।
আরফিন হুইয়ের দলবল সেই স্থান লক্ষ্য করে চলতে লাগলো।
তারা ক্ষণিকের জন্য ভুলে গেলে তাদের সব কষ্টের কথা। প্রাণপণ শক্তিতে এগুচ্ছে
উঁচুনীচু অসমতল জায়গা।
আগাছা ঝোঁপঝাড় তেমন কিছু নেই, তবে মাটি আর পাথরের কুচির সঙ্গে অসংখ্য স্বর্ণকণিকা মেশানো আছে। সূর্যের আলোকে পর্বতমালাটিকে মনিমুক্তাখচিত রাজসিংহাসন বলে মনে হচ্ছে।
কিন্তু সেদিকে কারও খেয়াল নেই।
তখন সবাই দৌড়ে চলেছে ঐ নরখাদটি যেখানে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে সেখানে।
তীর-ধনু হাতে জাভেদ।
ডিরোমা আর ক্যাপটেন আরফিন হুই চলেছে তার পেছনে।
