তোমাকে বলেছে কে?
খবর আসছে। সাইকেল নিয়া এইজন্যে টেলিগ্রাফ অফিসে গেলাম। পোষ্টমাস্টার সাহেবের সঙ্গে কথা বললাম। টেলিগ্রাফ উনার কাছে এসেছে।
পরীবানু বলল, বাবার অবস্থা কি খুবই খারাপ?
ডাক্তাররা বলেছে উনি টিকতে নাও পারেন।
তুমি তাহলে এখানে বসে আছ কেন? ময়মনসিংহ যাও।
যাব। কাল সকালে যাব। তোমারে খবরটা দিতে আসছি।
পরীবানু পাখা দিয়ে হাওয়া করা বন্ধ করে শান্ত গলায় বলল, সবসময় মিথ্যা বলা ঠিক না। সবসময় মিথ্যা বললে অভ্যাস হয়ে যাবে। সত্য কথা বলতে পারবা না।
মাসুদ খাওয়া বন্ধ করে আহত গলায় বলল, কোনটা মিথ্যা বললাম? যাও কোরান মজিদ আনো। কোরান মজিদে হাত দিয়া বলব— যা বলেছি। সত্য বলেছি। বসে আছ কেন? কোরান মজিদ নিয়ে আসো।
বামেলা করো না। ভাত খাও।
আমি যে সত্য বলতেছি— এটা ফয়সালা না হলে ভাত মুখে দিব না। ভাত এখন আমার কাছে শিয়ালের গু।
পরীবানু বলল, আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি সত্য বলতেছ। আমার ভুল হয়েছে। মাফ চাই।
মাসুদ বলল, বাপজানের অসুখ নিয়া আমি মিথ্যা বলব না। এটা তোমার বোঝা উচিত।
পরীবানু বলল, একবার তো বলেছি। ভুল করেছি। সালুন ভালো হয়েছে?
হ্যাঁ ভালো হয়েছে। ডিমের সালুন আমার প্রিয়। অত্যধিক প্রিয়। একটা ডিম দিয়ে আমি দুই গামলা ভাত খেতে পারি।
মাসুদ খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল। বারান্দায় গেল হাত ধুতে। পরীবানু। জগে করে পানি ঢালছে, মাসুদ হাত ধুচ্ছে। মাসুদের মন আনন্দে পূর্ণ। পরীবানু। আশপাশে থাকলেই তার ভালো লাগে। আজ অন্যদিনের চেয়েও বেশি ভালো লাগছে। পরীবানু বলল, তোমারে একটা খবর দেওয়া হয় নাই। তোমার বাবা সন্ধ্যার সময় ফিরে আসছেন। খবর পাঠায়েছেন, আগামীকাল সন্ধ্যার পর আমাকে তুলে নেবেন।
মাসুদের মুখ হা হয়ে গেল।
পরীবানু সহজ গলায় বলল, পান দিব?
মাসুদ জবাব দিতে পারল না। সে পরীবানুর দিকে তাকিয়ে আছে। পঞ্চমীর চাঁদ ড়ুবে যাচ্ছে। তার কিছু আলো এখনো অবশিষ্ট আছে। সেই আলোয় পরীবানুকে কী সুন্দর যে লাগছে!
পরীবানু বলল, তুমি এই বাড়িতে থাকবে, না চলে যাবে?
মাসুদ বলল, বুঝতেছি না। আমার কী করা উচিত?
পরীবানু বলল, তোমার নিজ বাড়িতে চলে যাওয়া উচিত।
কেন?
তোমার বাবা হঠাৎ খোঁজ করে যদি তোমাকে না পান তাহলে মিজাজ খারাপ করবেন।
মাসুদ বলল, আমার উপরে উনার মিজাজ আর খারাপ হবে না। আমি ব্যবস্থা নিয়েছি। ধর্মপাশার সুরুজ গুনীনের পড়া সুরমা চোখে দিয়া রাখব। সঙ্গে সঙ্গে একশান।
পরীবানু হাসছে। শব্দ করেই হাসছে।
মাসুদ আহত গলায় বলল, হাসো কেন?
পরীবানু বলল, তুমি পুলাপানের মতো কথা বলবা, আমি হাসব না!
মাসুদ বলল, পুলাপানের কথা কী বললাম?
পরীবানু বলল, যাও বাড়িতে যাও।
মাসুদ বলল, বাড়িতে যাব না। ধর্মপাশা যাব। সুরমা নিয়া আসব। সাইকেলে শ্যা শা করে চলে যাব।
নতুন সাইকেল কিনেছ?
হুঁ।
টাকা কই পেয়েছ?
মাসুদ বলল, টাকা-পয়সা মেয়েছেলের দেখার বিষয় না। টাকা-পয়সা নিয়া
কথা বলব না।
মেয়েছেলে কী করবে? ভাত সালুন রানবে?
হুঁ।
প্রতি বৎসর একটা করে সন্তান দিবে?
কী প্যাচাল শুরু করলা? পান দিবা বলছিলা পান কই? সামান্য জর্দা দিও। জর্দা বিহীন পান আর নুন বিহন সালুন একই।
পরীবানু বলল, তুমি যে আমাকে মিথ্যা বললা এই বিষয়ে কিছু বলব না?
মাসুদ কিছু বলল না। উদাস চোখে সাইকেলের দিকে তাকিয়ে রইল।
মাসুদ পান চিবাচ্ছে। আড়চোখে পরীবানুর দিকে তাকাচ্ছে। পরীবানুর মুখের ভাব দেখার চেষ্টা করছে। মাসুদ যখন মুখ ভর্তি করে পান খায় তখন যদি পরীবানু আশপাশে থাকে তাহলে একটা ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে পরীবানু তার হাত বাড়িয়ে দেয় মুখের চাবানো পানের জন্যে। এই ঘটনা আজ ঘটছে না। পরীবানু হাত বাড়াচ্ছে না। মাসুদের মনটা খারাপ হয়ে গেল। সে কি তার মিথ্যা কথায় রাগ করেছে? স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে টুকটাক মিথ্যা বলবে, এতে দোষ হয় না।
পরী!
হুঁ।
পান খাবে?
না।
রাগ করেছ না-কি?
না, আমার শরীরে এত রাগ নাই। তাছাড়া মা কি ছেলের উপর রাগ করতে পারে?
মাসুদ হতভম্ব গলায় বলল, মা কে? আর ছেলে কে?
পরীবানু হাসতে হাসতে বলল, আমি মা, তুমি ছেলে। মনে নাই তুমি আমাকে মা ডাকলা? পা ছুঁয়ে কদমবুসি করলা?
রাগে মাসুদের গা জুলে যাচ্ছে। ইচ্ছা করছে পরীবানুর গালে ঠাশ করে একটা চড় লাগাতে। স্ত্রীকে শাসন করার জন্যে মাঝেমধ্যে তার গায়ে হাত তোলা জায়েজ আছে। জুম্মাঘরের ইমাম শুক্রবারে খুতবা পাঠের পর বলেছেন। উনি তো না জেনে বলেন নাই। জেনেশুনে বলেছেন।
পরীবানুর গালে সে যে একটা চড় বসাবে— এই বিষয়ে মাসুদ পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল, কিন্তু তার রাগ সেরকমভাবে উঠছে না। সব দিন তার রাগ দ্রুত উঠে না।
পরী!
হুঁ।
এই ধরনের কথা আর কোনোদিন বলব না।
আচ্ছা বলব না।
পরীবানু মাসুদের মুখের কাছে হাত বাড়িয়েছে। এখন সে পান খাবে। মাসুদের আবার মন খারাপ হয়ে গেল। মাসুদের মুখে কোনো পান নেই। রাগের কারণে পান গিলে ফেলেছে।
মাসুদ বলল, পরী, আমার একটা কথা রাখবা?
পরীবানু বলল, তোমার একটা কথা না, সব কথাই রাখব।
মাসুদ বলল, কথাটা কী শুনলে তুমি পিছাইয়া পড়বা। যদি রাখো তাহলে ভবিষ্যতে তোমার দশটা অপরাধ ক্ষমা করব।
কথাটা কী?
রাত অনেক হয়েছে। গ্রামের মানুষজন ঘুমে। আসমানে চাঁদও নাই। অন্ধকার।
কথাটা বলো।
তুমি আমার সাইকেলের পিছনে বসো। আমি তোমারে নিয়া ঘুরব। কেউ কিছু জানব না। রাজি আছ?
