ধর্মপাশায় গুনীন সুরুজ মিয়া থাকেন। তন্ত্ৰ-মন্ত্রের সাগর। জানেন না হেন জিনিস নেই। কোনো মুসলমানের কালী সাধনা থাকে না। উনার কালী সাধনাও আছে। মাসুদ কয়েকবারই তার কাছ থেকে জিনিসপত্র নিয়েছে। ফল পাওয়া গেছে। উনার মন্ত্র পড়া সুরমার নাম-ডাক আছে। এই সুরমা চোখে মেখে কঠিন হাকিমের সামনে দাঁড়ালে ঘটনা ঘটে। হাকিম যখন সুরমা দেয়া চোখের দিকে তাকান তখনই একশান হয়, হাকিমের দিল নরম হয়। যতবার তাকাবেন। ততবার দিল নরম হবে। গুনিন সুরুজ মিয়ার সুরমা চোখে দিয়ে অনেক খুনের আসামি খালাস পেয়ে গেছে।
মাসুদ পড়া সুরমার জন্যে সুরুজ মিয়াকে দশ টাকা। গত মাসের সাত তারিখ দিয়ে গেছে। অমাবস্যা ছাড়া সুরমায় মন্ত্র দেয়া যায় না। মাঝখানে অমাবস্যা গেছে। এখন ধর্মপাশা গেলে সুরমা নিয়ে আসা যাবে। মাসুদ ঠিক করে রেখেছে, এখন থেকে বাবার সামনে পড়ার আগে চোখে সুরমা দিবে। তার বাবা তো হাকিমের মতোই।
ধর্মপাশায় যাবার আরেকটি কারণ আছে। ধর্মপাশার নূর হোসেনের কাছে হারমোনিয়াম কেনার জন্যে একশ’ টাকা দিয়ে রেখেছে। নূর হোসেন বাদ্য-বাজনার জিনিস ভালো চেনে। মাসুদের দরকার মেলডি কোম্পানির ডাবল রিড হারমোনিয়াম। নূর হোসেনের কলিকাতা থেকে হারমোনিযাম আনিয়ে রাখার কথা। কলিকাতার সাথে নূর হোসেনের যোগাযোগ আছে। সে যদি হারমোনিয়াম এনে থাকে তাহলে সাইকেলের কেরিয়ারে করে নিয়ে আসবে। নয়াবাজারের দোকানে লুকিয়ে রাখবে। মাসুদের বাবা নয়াবাজারে কখনোই যান না।
আকাশে পঞ্চমীর চাঁদ। ফাঁকা সড়ক। সড়কের ধুলায় চাঁদের আলো পড়েছে। চিকচিক করছে। সড়কটাকে মাসুদের মনে হচ্ছে নদীর মতো। কিছুদূর গিয়েই মাসুদের মনখারাপ হয়ে গেল। পরীবানুর জন্যে মন টানছে। এমনই মন টানছে যে পেটে ব্যথা শুরু হয়েছে। ধর্মপাশা আরেক দিন যাওয়া যাবে। আজ রাতটা না হয় পরীবানুর সঙ্গে কাটুক। পরীবানু তার বিবাহিতা স্ত্রী। সে যদি পরীবানুর সঙ্গে থাকে কারো কিছু বলার নাই। সে পরীবানুর বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে সাইকেলের ঘণ্টা দিতে পারে। গলা উচিয়ে ডাকতেও পারে— পরী! পরীবানু!
মাসুদ সড়কের মাঝখানে ব্রেক কষে সাইকেল থামাল। সে অনেকদূর এসে পড়েছে। অর্ধেকের বেশি। এখন সে কী করবে? ধর্মপাশা যাবে না পরীবানুর কাছে ফেরত যাবে? লটারি করলে হয়। লটারিতে যেটা ওঠে। সেটা। লটারি করার বুদ্ধি কী? মাসুদ ঠিক করল, সে সাইকেল হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে। তার চোখ থাকবে রাস্তার দুই দিকে। যদি সে দেখে ধর্মপাশার দিক থেকে কেউ আসছে তাহলে সে রওনা হবে ধর্মপাশা। যদি দেখা যায় নয়াপাড়ার দিক থেকে কেউ আসছে তাহলে যাবে নয়াপাড়া। রাত তেমন হয় নি। কিন্তু চারদিক নীরব। রাস্তায় কোনো লোক চলাচল নেই। মাসুদ অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা করতে তার খুবই ভালো লাগছে।
সাইকেলের ঘণ্টা বাজাতে হলো না, তার আগেই পরীবানু দরজা খুলে বের হয়ে এলো। তার হাতে কুপি। কুপির লাল আলো পড়েছে তার মুখে। কী সুন্দর যে তাকে লাগছে! সাইকেল হাতে মাসুদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে মোটেই অবাক হলো না। যেন সে জানত নিশিরাতে মাসুদ এসে উপস্থিত হবে।
মাসুদ গলা নিচু করে বলল, সবাই কি ঘুমে?
পরীবানু বলল, হুঁ।
তোমাদের খাওয়া-দাওয়া শেষ?
পরীবানু বলল, সাইকেল রেখে হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে যাও। কল পাড়ে সাবানা-গামছা আছে।
মাসুদ বলল, কল চাপার শব্দে তোমাদের বাড়ির লোকজনের যদি ঘুম ভেঙে যায়?
পরীবানু বলল, ঘুম ভাঙলে ভাঙবে। তুমি কি পৃথিবীর সবাইকেই ভয় পাও?
মাসুদ বলল, আরে না। ভয় পাব কী জন্যে? ভাব দেখাই যে ভয় পাই। আসলে পাই না।
পরীবানু কাল চাপছে। মাসুদ চোখে-মুখে পানি দিচ্ছে। পানি গরম। মাসুদ বলল, একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করেছি। গরমের সময় টিউব কলের পানি থাকে ঠাণ্ডা। আর শীতের সময় গরম। ঘটনা চমৎকার না?
হুঁ।
তুমি এত গম্ভীর কেন? মন কি কোনো কারণে খারাপ?
না।
জব্বর ভুখ লাগছে। ঘরে কি চিড়-মুড়ি আছে?
পরীবানু জবাব দিল না। মাসুদ বলল, কিছু না থাকলে নাই। গল্প করে রাত পার করে দিব। খালি পেটে আলাপ ভালো জমে এটা জানো?
না।
খালি পেটে আলাপ ভালো জমে, ভরা পেটে জমে ঘুম। হা হা হা। ভালো বলেছি না?
হুঁ।
মাসুদ পরীবানুর ঘরের মেঝেতে পাতা পাটিতে বসে আছে। তার সামনে থালায় গরম ভাত। সঙ্গে বেগুন দিয়ে ডিমের সালুন। মাসুদের অতি পছন্দের জিনিস। ভাত কিছুক্ষণ আগে রান্না হয়েছে। ধোঁয়া উঠছে। ভাতের উপর গরম ঘি দুই চামচ ঢালা হয়েছে। ঘিয়ের সুঘাণে মাসুদ মোহিত হয়ে গেল।
মাসুদ বলল, কে রাঁধল? তুমি?
পরীবানু বলল, আমার বাড়িতে কি দশটা দাসী-বান্দি আছে?
অতি সুখাদ্য হয়েছে।
এখনো তো মুখে দেও নাই। বুঝলে কীভাবে?
দর্শনে বুঝা যায়। পহেলা দর্শনধারী।
পরীবানু হাতে পাখা নিয়ে বসেছে। গরম ভাত পাখা নেড়ে ঠাণ্ডা করছে। তার ঠোঁটে চাপা হাসি। সেই হাসি একটু বাড়ল। শব্দময় হলো। সে সঙ্গে সঙ্গেই হাসি বন্ধ করে বলল, দর্শনে সব বোঝা যায় না। তোমাকে দেখে বোঝার উপায় নাই যে তুমি বোকা।
আমি বোকা?
হুঁ।
মাসুদ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, পরী শোনো, আমি বোকা হই। আর যাই হই এখন বিরাট এক দায়িত্ব আমার হাতে।
কী দায়িত্ব?
খাঁ বাড়ির সবকিছু এখন আমার দেখা লাগবে, উপায় নাই। বাবার অবস্থা খারাপ। পক্ষাঘাত হয়েছে, উনার নড়ার অবস্থা না।
