পরীবানু ক্ষীণস্বরে বলল, হুঁ।
মাসুদ গাছপালার ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে সাইকেল চালাচ্ছে। একসময় সে নদীর দিকে চলল। নদীর পাড়ে চর পড়েছে। ফাঁকা চরে সাইকেল চালানোর মজাই অন্যরকম। পরীবানুর শুরুতে ভয় ভয় লাগছিল, এখন মজাই লাগছে। সে ক্ষণে ক্ষণে চাপা গলায় হাসছে।
কে? মাসুদ না? মাসুদ, এদিকে আসো।
নদীর চরে সিদ্দিকুর রহমান দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর একপাশে লোকমান একপাশে সুলেমান। সুলেমানের হাতে বন্দুক। তাঁর গলার স্বর শুনেই মাসুদ সাইকেল নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। সিদ্দিকুর রহমান আবার ডাকলেন, মাসুদ কাছে আসো।
মাসুদ বাবার কথার পর পরই সাইকেল নিয়ে ঝড়ের গতিতে বের হয়ে গেল। পরীবানুর কথা একবারও তার মনে হলো না। সিদ্দিকুর রহমান লোকমানের দিকে তাকিয়ে বললেন, লোকমান, তুমি মেয়েটাকে তার বাড়িতে পৌছে দিয়ে আসো।
নদীর পাড় ঘেঁসে সিদ্দিকুর রহমান হাঁটছেন। সুলেমান তার পিছু পিছু যাচ্ছে। সে চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। রাত-বিরাতে এইভাবে বের হওয়া ঠিক না। কখন কী ঘটে তার কি ঠিক আছে?
সুলেমান!
জি চাচাজি।
আমার গাধা ছেলে স্ত্রীকে সাইকেলের পিছনে নিয়া চক্কর দিতেছিল। দৃশ্যটা তোমার কাছে কেমন লাগল?
ভালো না চাচাজি। বিরাট অন্যায় হয়েছে।
সিদ্দিকুর রহমান বললেন, আমার কাছে ভালো লেগেছে। আমি আনন্দ পেয়েছি। গাধাটাকে আমি ডেকেছিলাম কী জন্যে জানো? গাধাটাকে ডেকেছিলাম একটা কথা বলার জন্যে। কথাটা হলো–যা তুই যতক্ষণ ইচ্ছা সাইকেলে করে চঞ্চর দে।
সুলেমান চাপা নিঃশ্বাস ফেলল। সে এতদিন ধরে মানুষটার সঙ্গে আছে, তারপরেও মানুষটার বিষয়ে সে কিছুই জানে না। এটা কেমন করে হয়?
বাড়ির উঠোনে ইজিচেয়ার
বাড়ির উঠোনে ইজিচেয়ার। ইজিচেয়ারের হাতলে লাল ঠোঁটের হলুদ পাখি বসে আছে। লীলা অবাক হয়ে পাখির দিকে তাকিয়ে আছে। কাক, চড়ুই এবং কবুতর— এই তিন ধরনের পাখি মানুষের আশেপাশে থাকতে পছন্দ করে। অন্যসব পাখি দূরে দূরে থাকে। মানুষ দেখলেই উড়ে কোনো গোপন জায়গায় চলে যায়।
লীলা মুগ্ধ হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। নড়াচড়া করতেও ভয় পাচ্ছে— পাখিটা যদি উড়ে চলে যায়! থাকুক আরো কিছুক্ষণ বসে। ধান এনে উঠোনে ছড়িয়ে দিলে কি পাখিটা টুকটুক করে ধান খাবে? বাড়ির ভেতর থেকে জলচৌকি নিয়ে লোকমান বের হচ্ছে। লীলা ইশারায় তাকে থামতে বলল। লোকমান ইশারা বুঝতে পারল না। এগিয়ে এলো। দরজার চৌকাঠের সঙ্গে জলচৌকি লেগে শব্দ হলো। হলুদ পাখি উড়ে চলে গেল। লীলার মনটা খারাপ হয়ে গেল। লোকমান বলল, আমারে কিছু বলছেন?
না, কিছু বলছি না।
লোকমান বলল, জলচৌকি কী করব?
লীলা বলল, উঠানের ঠিক মাঝখানে রাখেন। ইজিচেয়ার সরিয়ে দিন।
লোকমান ইজিচেয়ার হাতে নিয়ে এগুচ্ছে। ঠিক তখন হলুদ পাখিকে আবার দেখা গেল। সে এসে কাপড় শুকানোর দড়িতে বসল। বসেই আবারো উড়ে চলে গেল।
লীলা বলল, হলুদ পাখিটাকে কি দেখেছেন?
লোকমান বলল, জি দেখেছি।
পাখিটার নাম কী?
হইলাদা পাখি।
এই পাখিটার আর কোনো নাম নেই?
জি না। আর কী নাম থাকব?
অবশ্যই এই পাখিটার কোনো-একটা নাম আছে। টিয়া পাখির গায়ের রঙ সবুজ। তাই বলে। টিয়া পাখিকে আমরা সবুজ পাখি বলি না। কোকিলকে কালো পাখি বলি না। জলচৌকিটা রেখে আপনি লোকজনদের জিজ্ঞেস করে পাখিটার নাম জেনে আসবেন।
জি আচ্ছা।
আপনি এক কেন? আর লোকজন কোথায়?
সুলেমান চাচাজির সাথে কই জানি গেছে।
সুলেমান ছাড়াও তো এ-বাড়িতে আরো লোকজন আছে। সবাইকে আসতে বলুন।
জি আচ্ছা।
আজ এ বাড়িতে একটা বিশেষ দিন। এটা কি জানেন?
লোকমান জবাব দিল না। আজ যে এ-বাড়িতে বিশেষ দিন তা সে জানে। এ-বাড়িতে বউ আসবে। পরীবানুকে আনা হবে। তবে এই আনা অন্যরকম আনা। আনন্দ-উল্লাসের আনা না। লোকমান ভেবেছিল অন্ধকারে বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে মেয়েটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে আসা হবে। কেউ কিছু বুঝতে পারবে না। এখন মনে হচ্ছে তা না। মোটামুটি আয়োজন করেই আনার ব্যবস্থা হচ্ছে। লোকমান নিশ্চিত চাচাজি বিষয়টা পছন্দ করবেন না। তিনি খুবই রেগে যাবেন। তবে রেগে গেলেও কিছু বলবেন না। তিনি তার মেয়েকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। এই বিষয়টা এখন বোঝা যাচ্ছে।
আপনাকে বলেছিলাম পালকির ব্যবস্থা করতে। করেছেন?
লোকমান বলল, জি-না। প্রয়োজনে সেনাবাড়ির পালকি আনা হইত। সেনবাড়ির পালকি এখন নাই।
পালকি ছাড়া নতুন বউ আসবে কীভাবে? আর কোথাও পালকি নেই?
জি না।
লীলা বলল, কাঠমিস্ত্রি খবর দিয়ে আনুন। কাঠ কিনে আনার ব্যবস্থা করুন। পালকি বানানো এমন কোনো জটিল ব্যাপার না।
লোকমান বলল, কী যে কন! পালকি বানান জটিল আছে।
লীলা বলল, জটিল না। সরল সেটা বুঝবে কাঠমিস্ত্রি। আপনি ডেকে নিয়ে আসুন। আমি কথা বলব।
জি-আচ্ছা।
লীলা বলল, এখানের দোকানে রঙিন কাগজ পাওয়া যায়? লাল-নীল কাগজ?
যাইতে পারে।
আমার রঙিন কাগজ লাগবে। খোঁজ নিয়ে দেখুন। রঙিন কাগজ পাওয়া যায় केि না।
জি আচ্ছা।
এখন বলুন আপনাকে কী কী কাজ করতে দেয়া হয়েছে?
কাঠমিস্ত্রি খবর দিয়ে আনব। রঙিন কাগজ আনব।
আরেকটা কাজ করতে বলেছিলাম। হলুদ পাখির নাম জেনে আসতে। আপনাকে তিনটা কাজ দিয়েছি, আপনি তিনটা কাজ শেষ করে যত দ্রুত পারেন চলে আসবেন।
বেলা বেশি হয় নি। নটা সাড়ে নটা বাজে। লীলার হাতে অনেক সময় আছে। পরীবানু আসবে সন্ধ্যায়, তার আগে সব কাজ গুছিয়ে ফেলা যাবে। সিদ্দিকুর রহমান তাঁর মেয়ের হাতে পরীবানুকে এ-বাড়িতে আনার সমস্ত ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দিয়েছেন। লীলা কাজগুলি আগ্রহ নিয়ে করছে। সে রমিলার ঘরে ঢুকল।
