আমি অবাক হয়ে বললাম, কোথায় দেখেন?
আমার আশেপাশে দেখি। আমার বিছানায় বসে আমার সাথে গফসফ করে। হাসে। একবার সারা রাইত আমার সাথে শুইয়া আছিল।
এখন কি উনি আশেপাশে আছেন?
না এখন নাই। কেউ ধারে কাছে থাকলে আসে না। লজ্জা পায়।
আমি বললাম, মা, আপনি যা দেখেন সেটা চোখের ভুল। মৃত মানুষের ফিরে আসার ক্ষমতা থাকে না।
উনি আমার এই কথাটা খুব শান্ত ভঙ্গিতে শুনলেন। তারপর বললেন, হইতে পারে, আমি পাগল-মানুষ। পাগল-মানুষের তো কোনো দিশা থাকে না।
আমি আপনার চিকিৎসা করাতে চাই। ভালো চিকিৎসা। ঢাকায় নিয়ে আপনাকে বড় বড় ডাক্তার দেখাব। প্রয়োজনে দেশের বাইরে নিয়ে যাব। আপনার আপত্তি আছে?
আছে। আপত্তি আছে গো মা।
আপত্তি কেন?
ভালো হয়ে গেলে চঞ্চলিরে। আর দেখব না।
উনাকে হয়তো দেখবেন না। কিন্তু তার বদলে ভালো ভালো অনেক কিছু দেখবেন।
ভয়ঙ্কর খারাপ জিনিস দেখেছি গো মা। ভালো কিছু আমার দেখতে ইচ্ছা করে না।
ভয়ঙ্কর খারাপ কী দেখেছেন?
বলব। তোমারে একদিন বলব। কোনো-একজনরে বলতে ইচ্ছা করে।
এখনি বলুন, পরে আপনার মনে থাকবে না।
মনে থাকবে।
ডিমের তরকারি দিয়ে ভাত খেলাম। তিনি পাশে বসে খাওয়ালেন এবং সারাক্ষণই পিঠে হাত দিয়ে রাখলেন। এত মমতায় তিনি কি তার নিজের ছেলেমেয়েকে কোনোদিন খাইয়েছেন? এই সুযোগ তাঁর পাওয়ার কথা না।
লীলা।
জি?
মাগো, খেয়ে মজা পাইতেছ?
পাচ্ছি।
চালতা দিয়ে ছোট মাছের তরকারি। আমি খুব ভালো রাঁধতে পারি। তোমারে রাইন্ধা খাওয়াব। ইনশাল্লাহ।
আচ্ছা।
আমার আরেকটা শখ আছে মা। পাগল-মাইনষের শখ। শখটা তুমি পূরণ করবা?
অবশ্যই করব। আপনি বলুন কী শখ?
একটা রাইত আমার সঙ্গে থাকবা। দু’জনে বিছানায় শুইয়া সারারাত গফসাফ করব।
অবশ্যই। আপনি যদি বলেন আমি আজই আপনার সঙ্গে ঘুমুতে পারি।
ভয় লাগবে না?
ভয় লাগবে কেন?
আমি পাগল-মানুষ। ঘুমের মধ্যে আমি যদি তোমার গলা চাইপ্যা ধরি?
না, আমার ভয় লাগবে না।
মহিলা খিলখিল করে হাসতে শুরু করলেন। হাসি আর থামেই না।
এই মহিলা প্রায়ই সিমাসা বলেন। সিমাসা হলো ধাঁধা। যেমন–
ভোলা মিয়ার শয়তানি
বাইরে লোহা ভিতরে পানি।
এর অর্থ হলো নারিকেল। আমার মা হলেন সিমাসা রানি। তিনি অসংখ্য সিমাসা জানেন। আবার সিমাসা মুখে মুখে তৈরিও করতে পারেন।
যাই হোক, রাতে আমি আমার নিজের ঘরে ঘুমুতে এলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাবা এসে উপস্থিত হলেন। তার সঙ্গে ফিরে আসার পর আমার কোনো কথা হয় নি। তবে একটা ব্যাপার বুঝতে পেরেছি, তিনি আমাকে দেখে খুবই আনন্দিত হয়েছেন। তিনি হয়তো ভেবেছেন আমি নিজেই তার কাছে যাব। আমি যাই নি। তিনিও আমাকে ডাকেন নি। হয়তো আমাকে ডাকতে তাঁর অহঙ্কারে বেধেছে। এখন সমস্ত অহঙ্কার একপাশে ফেলে নিজেই এসেছেন। আমি বললাম, বাবা, কিছু বলবেন? তিনি বললেন, না। তিনি আমার ঘরে রাখা চেয়ারে বসলেন। আমি বললাম, বাবা আপনি খেয়েছেন? তিনি না-সূচক মাথা নাড়লেন। আমি বললাম, আমি তো জানি না যে আপনি এখনো খান নি। তিনি বললেন, জানলে কী করতে?
জানলে আপনাকেও সঙ্গে নিয়ে খেতে বসতাম।
তিনি বললেন, আমার একা একা খাওয়ার অভ্যাস।
আমি বললাম, আমি যে-কয়দিন আপনার সঙ্গে থাকব আপনি আমার সঙ্গে খাবেন। বাবা কিছু বললেন না। কিন্তু তাকে দেখে মনে হলো তিনি খুশি হয়েছেন। খুশির ভাবটা চাপতে চেষ্টা করছেন। চাপতে পারছেন না। আমি বললাম, রাত অনেক হয়েছে, খেতে চলুন। বলেই আমি উঠে দাঁড়ালাম। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি ঘুমাও। আমি বললাম, আপনার খাওয়া হোক, তারপর ঘুমাব। আপনি যখন খাবেন আমি সামনে বসে থাকব।
বাবার খাবার সময় আমি পাশে বসে রইলাম এবং একটা কাণ্ড করে তাকে পুরোপুরি হকচাকিয়ে দিলাম। খাবার সময় মা যেভাবে আমার পিঠে হাত রেখেছিলেন। আমি ঠিক তা-ই করলাম। বাবার পিঠে হাত রাখলাম। আমি ভেবেছিলাম। তিনি খাওয়া বন্ধ করে আমার দিকে তাকাবেন। তিনি তা করলেন না। যেভাবে খাচ্ছিলেন সেইভাবেই খেয়ে গেলেন। খাওয়া শেষ করে মুখে পান। দিলেন। সুলেমান এসে তার হাতে হুক্কা ধরিয়ে দিল। তিনি হুঙ্কার নিলে টান দিচ্ছেন। গুড়ুক গুড়ুক শব্দ হচ্ছে। হুক্কার শব্দটা যে এত মজার তা আগে লক্ষ করি নি। শব্দটার মধ্যে ঘুমপাড়ানি ভাব আছে। আমার মনে হচ্ছে, বিশাল খটটার একপাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লে ভালো লাগত।
লীলা!
জি?
ঘুম পাচ্ছে মা?
জি।
তাহলে ঘুমাও। আরাম করে ঘুমাও। এই খাটে তোমার মা ঘুমাত।
বাবার এই কথা আগেও একবার শুনেছি। সেবার বিস্মিত হয়েছিলাম। আজ হঠাৎ বলে ফেললাম, শুধু মা ঘুমান নি। মার পরে আরো একজন ঘুমিয়েছেন। কথাটা বলেই আমার মনে হলো আমি কাজটা ঠিক করি নি। এই কথাটা না বললেও চলত। আমি লক্ষ করলাম। বাবার হুক্কা টানা বন্ধ হয়ে গেছে। তার মুখের চামড়া একটু যেন শক্ত হয়ে গেল। তিনি হুক্কার নল একপাশে রেখে শরীর ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। বড় করে নিঃশ্বাস টেনে কথা বলা শুরু করলেন–লীলা শোনো। তোমার মা’র মৃত্যুর অনেক দিন পরে আমি বিবাহ করি। তোমার মা এবং আমি যে-খাটে ঘুমাতাম, সেই খাটটা খুলে রেখে দেয়া হয়েছিল। তুমি আসার পর খাটটা জোড়া লাগানো হয়েছে। তুমি বিষয়টা লক্ষ করো নাই। অতিরিক্ত বুদ্ধিমান মানুষদের সমস্যা কী জানো মা? তাদের প্রধান সমস্যা….
এই পর্যন্ত বলেই তিনি চুপ করে গেলেন। হুঙ্কার নলটা টানতে শুরু করলেন। আবারো ঘুম-পাড়ানি গুড়ুক গুড়ুক শব্দ হচ্ছে। আমি বললাম, আপনি আমার কথায় কিছু মনে করবেন না। তিনি বললেন, যাও, ঘুমাতে যাও। তিনি এখন আর মায়ের খাটে আমাকে ঘুমুতে বললেন না। প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ পাল্টাবার জন্যেই হয়তো বললেন, আনিস ছেলেটাকে নিয়ে চিন্তিত আছি। ছেলেটাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে তুমি ভালো করেছ না মন্দ করেছ বুঝতে পারছি না। নিতান্তই পল্লীগ্রাম, চিকিৎসার সুব্যবস্থাও নাই।
