আমি বললাম, উনাকে নিয়ে ঢাকা পর্যন্ত যাবার অবস্থা ছিল না।
মা যেমন আমার পিঠে হাত রেখে আমাকে হকচকিয়ে দিয়েছিলেন, বাবা এখন তা-ই করলেন, এমন একটা কথা বললেন যে আমি নিজে পুরোপুরি হ’কচাকিয়ে গেলাম। তিনি হঠাৎ হুক্কা টানা বন্ধ করে আমার দিকে তাকালেন— শান্ত গলায় বললেন, এই ছেলেটাকে কি তোমার পছন্দ?
আমি জবাব দিলাম না। বাবা বললেন, অনেক সময় মানুষ তার নিজের পছন্দের কথা নিজে বুঝতে পারে না। বোকাদের ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটে না। বোকারা খুব ভালোমতো জানে কোনটা তার পছন্দ, কোনটা তার পছন্দ না। মাসুদের কথা ধরো। সে ভালোমতো জানে পরীবানু নামের মেয়েটাকে তার পছন্দ। এই মেয়েটার জন্যে যা-কিছু মানুষের পক্ষে করা সম্ভব তা সে করবে। মাসুদ যদি তোমার মতো অতি বুদ্ধিমান কেউ হতো তাহলে সে তার পছন্দের ব্যাপারটা ধরতে পারত না। তার মাথার মধ্যে নানান হিসাব-নিকাশ খেলা করত।
আপনার ধারণা আমার খুব বুদ্ধি?
হ্যাঁ, আমার তা-ই ধারণা।
আমি বললাম, অসুস্থ মানুষটাকে দেখে আমার খুব মায়া লেগেছে। পছন্দ বলতে এইটুকুই। আপনি যে-অর্থে পছন্দের কথা বলছেন— সেই অর্থে না।
বাবা বললেন, না হলেই ভালো।
না হলেই ভালো কেন?
অপদার্থ ধরনের ছেলে। অপদাৰ্থ মানুষরা তাদের আশেপাশের মানুষকেও অপদাৰ্থ বানিয়ে ফেলে। তাছাড়া তার মাথাও কিঞ্চিৎ খারাপ বলে আমার ধারণা।
আপনার এরকম ধারণার পেছনে কারণ কী?
চোখের চাউনি দেখে মনে হয়েছে। পাগলদের চোখের চাউনি সাধারণ মানুষের মতো না। পাগলদের দৃষ্টি আমার মতো ভালো কেউ জানে না। এই প্রসঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন নেই। যাও, ঘুমাতে যাও। আমার মনটা আজ কিঞ্চিৎ খারাপ। কিঞ্চিৎ না, একটু বেশিই খারাপ। মন-খারাপ নিয়ে আমি কথা বলতে পারি না।
মন-খারাপ কেন?
বাবা চাপা গলায় বললেন, সুলেমান আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলেছে। এটা জানতে পেরেছি বলেই মন-খারাপ। এরা আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলবে— কথা গোপন করবে, এটা আমি কল্পনাও করি নি।
আমি বললাম, কী কথা গোপন করেছে?
বাবা শান্ত গলায় বললেন, মাসুদ পরীবানু মেয়েটিকে গোপনে বিবাহ করেছে। মৌলানা ডেকে বিবাহ। এই ঘটনা সুলেমান-লোকমান দুজনই জানে। কিন্তু কেউ আমাকে কিছু বলে নাই।
আমি অবাক হয়ে বললাম, আপনি কি নিশ্চিত মাসুদ বিয়ে করেছে?
হুঁ। ব্যাপারটা সবাই জানে। শুধু আমি জানি না। আনিস মাস্টারও জানে।
আপনি এখন কী করবেন?
আমার কী করা উচিত?
পরীবানুকে বাড়িতে নিয়ে আসা উচিত।
কথাটা চিন্তা-ভাবনা করে বলেছ?
আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লাম। বাবা তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। তাঁর চোখে পলক পড়ছে না। নিম্পলক চোখে তাকিয়ে তিনি কী দেখার চেষ্টা করছেন? আমার চোখে উন্মাদের দৃষ্টি আছে কি না?
তুমি বলতে চোচ্ছ পরীবানু মেয়েটিকে এই বাড়িতে নিয়ে আসা উচিত?
জি।
আর মাসুদের ব্যাপারে কী করণীয়? আচ্ছা থাক, এই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে না। তুমি ঘুমাও। ফি আমানিল্লাহ। দরজার খিল লাগায়ে শুয়ে পড়ে। একা ভয় পাবে না তো?
জি না।
রমিলা মাঝেমধ্যে খুব চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ তার চিৎকার শুনলে ভয় পেতে পার।
আমি ভয় পাব না।
বাবা খাট থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, তোমার উপর দায়িত্ব দিলাম। এই বাড়িতে পরীবানুকে আনার। পরীবানুর দায়িত্ব তোমার। মাসুদের দায়িত্ব আমার।
বাবা চলে গেলেন। তখনো আমি জানি না যে আনিস সাহেবকে নিয়ে বাবা নিজেই ময়মনসিংহ রওনা হয়েছেন। এটা আমি জানলাম। পরদিন সকালে। আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না।
এখন আমি আমার ভাই মাসুদ সম্পর্কে কিছু বলি। প্রথমে চেহারার বর্ণনা— সুপুরুষ। স্বাস্থ্য ভালো। চোখ বড় বড় (আমার বাবার চোখও বড় বড়, এটা মনে হয়। আমাদের পারিবারিক বিশেষত্ব। সবার চোখ বড় বড়)। মাথার চুল কোকড়ানো।
স্বভাব— কথা কম বলে। কারো চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না। তাকে দেখলেই মনে হয় কোনো ভয়ে সে অস্থির হয়ে আছে। কথা বলার সময় সে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন দিকে তাকাবে। ভীতু প্রকৃতির ছেলে, তবে গলার স্বর ভারী এবং গম্ভীর। সে গান-বাজনা কেমন শিখেছে জানি না, তবে সে শিস বাজিয়ে পাখিদের শিসের নকল করতে পারে। তার শিস বাজানোর সুন্দর একটা ঘটনা বলি। আমি তাকে সঙ্গে নিয়ে শহরবাড়ি যাচ্ছি। একটা বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে পথ। হঠাৎ মাসুদ বলল, বুবু, একটা মজা দেখবে?
আমি বললাম, কী মজা?
মাসুদ হাত মুখের কাছে ধরে শিস দিতে লাগল। বুলবুলি পাখি যেরকম শিস দেয় সেরকম শিস। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা বুলবুলি পাখি শিস দিতে লাগল। তারপর আরো কয়েকটা। আমি অবাক। মাসুদ বলল, বুবু, আমি ঘুঘু পাখির ডাক ডাকতে পারি। আমি যখন ঘুঘুর ডাক ডাকি, তখন বনের ঘুঘুও ডাকে।
বাবা বাড়িতে নেই, ময়মনসিংহ গিয়েছেন–এই খবর পেয়েই মনে হয়। মাসুদ বাড়িতে উপস্থিত। এমনভাবে সে হাঁটাহাঁটি করছে যেন সে-ই বাড়ির কর্তা। মুখভর্তি পান। পান চিবিয়ে বেশ কায়দা করে পানের পিক ফেলছে। আমি বললাম, মাসুদ, তুমি না-কি বিয়ে করেছ?
মাসুদ পানের পিক ফেলে বলল, করতেও পারি।
আমি বললাম, করতেও পারি। আবার কী? হয় বলো করেছি। অথবা বলো করি নাই।
মাসুদ বলল, আমি অধিক কথা বলি না।
আমি বললাম, বাবা খুব রাগ করেছেন।
মাসুদ বলল, আমি এইসব কেয়ার করি না।
সে যে সত্যিই কেয়ার করে না এটা বুঝাবার জন্যেই বোধহয় ছিপ নিয়ে মাছ মারতে গেল। সেই মাছ মারার আয়োজনও বড়। একজন গেল তার মাথায় ছাতি ধরার জন্যে। একজন গেল হারমোনিকা বাদক। একজন ঢোল নিয়ে গেল।
