ইহা সাংকেতিক পত্র। পড়িবার নিয়ম— যে অক্ষর পাঠ
করিবেন তাহার আগের অক্ষর ধরিতে হইবে।
উদাহরণ,
খড়িয— ইহার অর্থ করিম। খ হইবে ক, ড় হইবে র, য হইবে ম।
লীলা প্রতিটি লেখা পড়ে খুবই মজা পেয়েছে। লেখাগুলি সে যত্ন করে রেখে দিয়েছে। মাঝে মাঝে পড়ে। কিছু কিছু সাংকেতিক চিঠির অর্থ সে উদ্ধার করতে পারে নি। যেমন একটা লেখা এরকম—
মত ৪০ নত ২৭ যত ১১
পিতা ৯৩২ মাতা ০৭ ভগ্নি ১২
অতঃপর ০০১২০৩৪০০৯৯২১
পক্ষী ৫ স্বৰ্গ ৩ আকাশ
১১-৩১-৫১-৯১-১৮
…
সাংকেতিক লেখার অর্থ উদ্ধারের কোনো সূত্রও মহিলা রেখে যান নি। লীলার ধারণা কোনো একদিন সাংকেতিক লেখার অর্থ তাঁর মেয়ে উদ্ধার করবে। এমন আশা নিয়েই সংকেতগুলি তৈরি করা। সে যেমন আগ্রহ করে মার লেখা পড়েছে, একদিন তার মেয়েও সেরকম আগ্রহ করে লীলার লেখা পড়বে। যখন লীলা লিখতে বসে তখন এই ব্যাপারটা তার মাথায় থাকে। এমন কিছু লেখা যাবে না। যা পড়ে তার মেয়ে মন-খারাপ করে। একবার লেখা শুরু হয়ে যাবার পর আর মেয়ের কথা লীলার মনে থাকে না।
মেঘলা সকাল। জানালা দিয়ে সামান্য আলো আসছে। পর্দা সরিয়ে দিলে কিছু আলো পাওয়া যেত। লীলা পর্দা সরায় নি। আধো আলো আধো অন্ধকারেই তার লিখতে ভালো লাগে। সে লিখছে—
গতকাল রাতে আমার খুব ভালো ঘুম হয়েছে। অথচ ভালো ঘুম হবার কথা ছিল না। আমার ঢাকায় যাবার কথা ছিল। আমি ঢাকায় না গিয়ে আবারো বাবার বাড়িতে ফিরে এসেছি। সঙ্গে করে এক রোগীকে নিয়ে এসেছি। ভদ্রলোক স্থানীয় এক কলেজের শিক্ষক। তার নাম আনিস। ভদ্রলোক কুজো হয়ে হাঁটেন বলে তাঁর নাম কুঁজা মাস্টার। এই নামেই সবাই তাঁকে ডাকে।
বাড়িতে তাকে ফিরিয়ে আনা ঠিক হয় নি। কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। তাঁর শরীর এখন ভয়ঙ্কর খারাপ। জ্বর একশ চার-একশ পাচের মধ্যে। মাথায় পানি ঢাললে জ্বর কিছু কমে। পানি ঢালা বন্ধ করলেই হুট করে বেড়ে যায়। রাতেই ডাক্তার ডেকে আনা হয়েছে। ডাক্তার রোগী দেখে বলেছেন, অবস্থা ভালো না। আজ রাতেই ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
ডাক্তাররা এ ধরনের কথা বললে আতঙ্কগ্ৰস্ত হতে হয়। আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, ডাক্তারের ভয়ঙ্কর কথা শোনার পরও কেউ আতঙ্কগ্ৰস্ত হলো না। পরে আসল রহস্য জানলাম। এই ডাক্তার (সতীশ পাল) নাকি নিদান ডাক্তার। রোগীর অবস্থার সামান্য উনিশ-বিশ দেখলেই তিনি নিদান ডাকেন। অর্থাৎ গম্ভীর হয়ে বলেন, রোগী টিকবে না। যাদের সম্পর্কে তিনি এ-ধরনের কথা বলেছেন তারা কেউই না-কি মারা যায় নি। বরং যাদের সম্পর্কে নিদান ডাকা হয় নি তাদের কেউ-কেউ চলে গেছে। নিদান ডাক্তার সতীশবাবু যে-রোগী সম্পর্কে বলেন রোগী টিকবে না সেই রোগীর আত্মীয়স্বজনরা না-কি খুবই খুশি হন। হাস্যকর সব কাণ্ড! তবে সবার কথাবার্তায় আমি মজা পেয়েছি। ডাক্তার সাহেবের একটা ব্যাপার আমার ভালো লেগেছে— তিনি রোগীকে রেখে চলে যান নি। রোগীকে সঙ্গে নিয়ে ময়মনসিংহ সদর হাসপাতালে গেছেন। সবচে যেটা অদ্ভুত, আমার বাবাও সঙ্গে গেছেন। এই বিষয়ে পরে লিখব।
খুব ক্লান্ত ছিলাম। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিল। ভেবে রেখেছিলাম গরম পানি দিয়ে গোসল করেই সরাসরি বিছানায় চলে যাব, তখন শুনলাম আমার মা আমার জন্যে রান্না করেছেন। কাজেই খিদে না থাকলেও খেতে বসতে হবে। আমি খুব সহজেই লিখলাম আমার মা, আসলে লেখা উচিত আমার সৎমা। সৎমা শুনতে ভালো লাগে না, লিখতেও ভালো লাগে না। এরচে সরাসরি মা লেখাই ভালো। এই মহিলা মানসিকভাবে অসুস্থ। কিন্তু আমি লক্ষ করেছি, বেশির ভাগ সময় তিনি আমার সঙ্গে খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন। আমাদের দুজনের যখন কথাবার্তা হয় তখন বাইরে থেকে শুনে কারোর বোঝার সাধ্য নেই যে তিনি অসুস্থ। এই মহিলার কিছু অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা আছে বলেও আমার মনে হয়। মাঝে মাঝে ভবিষ্যতের কিছু কথা বলেন। সেগুলি ফলে যায়। কাকতালীয় হতে পারে। আবার নাও হতে পারে।
আমার এই মা গতরাতে কাঁঠালের বিচি দিয়ে মুরগির মাংস রান্না করেছেন। কাঁঠালের বিচি তরকারি হিসেবে আমার খুব অপছন্দ। মানুষ কাঁঠাল যখন খায় তখন কাঁঠালের বিচিটা মুখে থাকে। মুখ থেকে বের করে। যে-জিনিসটা একজনের মুখ থেকে এসেছে সেটা খেতে আমার ঘেন্না করে। আমি খেতে বসলাম। মা নিজেই ভাড় বেড়ে দিলেন। তরকারির বাটিতে চামচ ডুবিয়ে তিনি থমকে গেলেন এবং আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, মা, তুমি কাঁঠালের বিচি খাও না। তাই না? আমি বললাম, আপনি কী করে বুঝলেন?
তিনি তার জবাব দিলেন না। চুপ করে রইলেন। আমি বললাম, আমি মাংস আর ঝোল দিয়ে খাব। তিনি বললেন, না। তুমি একটু বসো, আমি ডিমের সালুন রান্না করে দিব। আমার সময় লাগবে না।
এই মহিলাকে একটা ঘরে তালাবন্ধ করে রাখা হয়। আজ দেখি তিনি স্বাধীন মানুষের মতো চলাফেরা করছেন। তবে তাকে যে দূর থেকে লক্ষ করা হচ্ছে এটা আমি বুঝতে পারছি। বাবা লক্ষ করছেন। সুলেমান নামের বডিগার্ড ধরনের একজন কর্মচারী, সেও লক্ষ করছে।
রান্না করার সময় তিনি সহজ-স্বাভাবিক মানুষের মতো টুকটাক গল্প করতে লাগলেন। কী সুন্দর গল্প বলার ভঙ্গিা! হাত নাড়ছেন, শরীর দোলাচ্ছেন।
বুঝছে মা, আমার একটা ছোট ভাইন ছিল। তার নাম চঞ্চলি। চঞ্চল ছিল, এইজন্যে নাম চঞ্চলি। আমরা দুই ভাইন পুষকুনির পাড়ে গিয়েছি, তখন হঠাৎ আমার পা পিছল খাইল। আমি পড়ে গেলাম পানিতে। সাঁতার জানি না। ড়ুইবা যাইতেছি, তখন চঞ্চলি আমারে বাচানোর জন্যে লাফ দিয়া পানিতে পড়ল। আমি ঠিকই পানি থেকে উঠলাম, চঞ্চলি উঠল না। তবে তারে আমি প্রায়ই দেখি।
