কথাগুলো বলে সিদ্দিকুর রহমান নিজের উপরই বিরক্ত হলেন। মস্তিষ্ক বিকৃত একজন মানুষের সঙ্গে এ-ধরনের জটিল কথাবার্তা চালানো অর্থহীন। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, শুনেছি। দুপুরে তুমি কিছু খাও নাই। খিদা লেগেছে? এখন কিছু খাবে?
খিদা হয়েছে। কিন্তু এখন খাব না।
কখন খাবে?
আপনার মেয়ে লীলা আসতেছে। সে আসার পরে খাব। দুজন একসঙ্গে খাব।
লীলা ঢাকায় চলে গেছে। আজ দুপুরে তাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসা হয়েছে। সে আসবে না।
রমিলা দৃঢ় গলায় বলল, সে ফিরত আসবে।
অসুস্থ মানুষের কাছে যুক্তিতর্ক উপস্থিত করার কোনো অর্থ হয় না। সিদ্দিকুর রহমান এই নিয়ে কোনো কথা বললেন না, তবে তার মধ্যে সামান্য সংশয় তৈরি হলো। আগেও একবার রমিলা হঠাৎ করে বলেছিল। লীলা আসবে। লীলা ঠিকই এসেছে। আজো সে-রকম কিছু ঘটবে না তো? সিদ্দিকুর রহমান বললেন, লীলা কখন আসবে?
রমিলা ফিসফিস করে বলল, এশার নামাজের ওয়াক্তে। ঘর-দুয়ার অন্ধকার করে রাখছেন কেন? বাতি জ্বালান। কাঁঠালের বিচি দিয়া মুরগির সালুন রান্দার ব্যবস্থা করেন। লীলা। এই সালুন বড় পছন্দ করে। আমার ইচ্ছা এই সালুনটা আমি রান্দি।
আগুনের কাছে তোমার যাওয়া নিষেধ।
তাইলে থাক। অন্য কাউকে দিয়া এই সালুন রান্দাইয়া রাখেন।
সিদ্দিকুর রহমান জবাব দিলেন না। তবে তিনি বিস্মিত হয়ে লক্ষ করলেন, রমিলার কথায় তিনি প্রভাবিত হচ্ছেন। কাঁঠালের বিচি দিয়ে মুরগির সালুন রোধে রাখার ব্যবস্থা করতে ইচ্ছা করছে।
এশার নামাজের আগে-আগে প্রবল বর্ষণ শুরু হলো। কার্তিক মাসে আষাঢ় মাসের বৃষ্টি। এই বৃষ্টির আলাদা নাম আছে। কাত্যাইয়ান না? দমকা বাতাস ঝোড়ো হাওয়া। আকাশ ভেঙে নেমেছে বৃষ্টি। সিদ্দিকুর রহমান উঠানে বসে বৃষ্টি দেখছেন। তিনি সামান্য চিন্তিত। যে-বিষয় নিয়ে তিনি চিন্তিত সেটা ভেবেও তাঁর মেজাজ খারাপ হচ্ছে। তিনি চিন্তিত লীলাবতীকে নিয়ে। কোনো বিস্ময়কর কারণে সত্যি সত্যি যদি তাঁর মেয়ে এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে ফিরে আসে তাহলে খুবই সমস্যায় পড়বে। পশ্চিম পাড়ায় ছোট খালের উপরে যে কাঠের পুলটা আছে সেটা নড়বড় করছে। পাশেও অত্যন্ত ছোট। পনের-বিশদিন আগে মহিষের একটা গাড়ি পুল থেকে খালে পড়ে গিয়েছিল। মানুষ মারা যায় নি, কিন্তু একটা মহিষ মারা গেছে। লোকমান বা সুলেমান এদের কোনো একজনকে টর্চ হাতে কাঠের পুলের কাছে পাঠিয়ে দিলে খারাপ হয় না। কিন্তু তিনি কী বলে লোকমানকে পাঠাবেন? তাঁর মেয়ে লীলা, যে দুপুরের ট্রেনে ঢাকা চলে গিয়েছিল, সে ফেরত আসছে— এই খবর তিনি পেয়েছেন কোথায়? তার পাগল স্ত্রীর কাছে। ব্যাপারটা হাস্যকর না?
সিদ্দিকুর রহমান এশার নামাজের ওয়াক্ত পর্যন্ত বারন্দায় বসে রইলেন। তার ইচ্ছা করছে সুলেমান এবং লোকমান এই দুই ভাইকে ডেকে বলেন যে, তারা যে মিথ্যাচার করেছে তা তিনি জানেন। মাসুদকে কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে তাও জানেন। তারা বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। যে একবার বিশ্বাস ভঙ্গ করে সে বারবারই করে। রমিলা বলেছিল। লীলা এশার নামাজের ওয়াক্তে ফিরে আসবে। এশার নামাজ অনেকক্ষণ হলো শেষ। লীলা ফিরে আসে নি। একজন পাগলমানুষের কথায় বিশ্বাস করা ঠিক হয় নি। মানুষের সমস্যা হলো, একবার কারো কোনো কথায় বিশ্বাস করে ফেললে বারবার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে। খাওয়াদাওয়া শেষ করে তিনি ঘুমুতে গেলেন রাত এগারটায়। ততক্ষণে ঝড় থেমে গেছে, কিন্তু বৃষ্টি আগের মতোই মুষলধারে পড়ছে। সিদ্দিকুর রহমানের মন সামান্য খারাপ। তিনি মনে হয়। সত্যি সত্যি বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন— লীলা ফিরে আসছে। তিনি কাঁঠালের বিচি দিয়ে মুরগির সালুনের ব্যবস্থাও করে রেখেছিলেন। শেষ মুহুর্তে সালুন রান্না হয় নি।
মধ্যরাতে হৈচৈ-এর শব্দে তাঁর ঘুম ভাঙল। বারান্দায় এসে দেখেন বারান্দায় পাশাপাশি তিনটা হারিকেন জুলছে। বৃষ্টির পানিতে কাকভেজা হয়ে চারজন লোক বারান্দায় উঁচু হয়ে বসে শীতে কাঁপছে। সিদ্দিকুর রহমানকে দেখে তারা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, তোমরা কারা? তাদের একজন ভীত গলায় বলল, তারা গাড়োয়ান। গরুর গাড়ি নিয়ে এসেছে।
সিদ্দিকুর রহমান বললেন, কে এসেছে গরুর গাড়িতে?
গাড়োয়ান ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে বলল, আপনার মেয়ে আসছে।
সিদ্দিকুর রহমান স্বাভাবিক গলায় বললেন, ও আচ্ছা ঠিক আছে।
এতক্ষণ সুলেমান বা লোকমান এদের কাউকেই দেখা যাচ্ছিল না। এখন সুলেমানকে দেখা গেল। ছাতা-হাতে আসছে। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, কোথায় গিয়েছিলা?
ডাক্তার সাবরে খবর দিতে গেছিলাম।
ডাক্তার কী জন্য?
লীলা বইনজি প্রফেসার সাবরে নিয়া ফিরত আসছে। প্রফেসর সাবের শইল খুব খারাপ।
লীলা কখন আসছে?
একঘণ্টার উপরে হইব।
আমারে ডাক দেও নাই কেন?
আপনে ঘুমাইতে ছিলেন। বইনজি আপনের ঘুম ভাঙাইতে নিষেধ করেছেন।
লীলা কোথায়?
পাকা বাড়িতে গেছেন। সিনান করবেন।
তার খাওয়াদাওয়া হয়েছে?
জি না।
সিদ্দিকুর রহমান গাড়োয়ান চারজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, এরা শীতে কাঁপতেছে। গামছা দেও, এরা শইল মুছুক। এরার খাওয়ার ব্যবস্থা করো।
প্রত্যেকেরে ভাড়ার উপরে পাঁচ টাকা করে বখশিস দেও। কষ্ট করে আমার
মেয়েরে এনেছে।
সিদ্দিকুর রহমান মেয়ের খোঁজ করলেন না। হারিকেন হাতে রমিলার ঘরে ঢুকলেন। সন্ধ্যাবেলা রমিলা যে-ভঙ্গিতে যেভাবে খাটে বসেছিল, এখনো সেইভাবেই বসে আছে। মাথার ঘোমটাও আগের মতোই দেয়া আছে। সিদ্দিকুর রহমান ডাকলেন, রমিলা!
