চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। সুলেমান হারিকেন জ্বলিয়ে তার ইজিচেয়ারের পেছনে এনে রাখল। সিদ্দিকুর রহমান বললেন— সুলেমান, মাসুদকে কি তুমি ট্রেনে তুলে দিয়েছিলে?
সুলেমান বলল, জি।
টিকিট কেটে দিয়েছ, না-কি বিনা টিকিটে তুলে দিয়েছ?
বিনা টিকিটে।
এটা ভালো করেছ। সে কি কান্নাকাটি করছিল?
জি না।
চোখের পানি ফেলে নাই?
জি না।
এটা খারাপ না। শুনে আনন্দ পেলাম। কিছুটা তেজ তাহলে এখনো আছে। বিষধর সাপের বিষ আর পুরুষের তেজ–দুটাই এক জিনিস। বিষধর সাপের বিষ শেষ হয়ে গেলে সাপের মৃত্যু হয়। পুরুষের তেজ শেষ হওয়া মানে পুরুষের মৃত্যু। বুঝেছ?
জি।
মেয়েদের তেজটা কী জানো?
জি না।
মেয়েদের তেজ তাদের চোখের পানিতে। যখন কোনো মেয়ের চোখের পানি শেষ হয়ে যায়— তখন সেই মেয়েরও মৃত্যু হয়। বুঝেছ?
জি।
তোমাকে কেন জানি চিন্তিত মনে হচ্ছে। সুলেমান, তুমি কি কোনো বিষয় নিয়া চিন্তিত?
সুলেমান জবাব দিল না। মাথা নিচু করে বসে রইল। তাকে দেখে এখন সত্যি সত্যি খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, কোনো বিষয়ে নিয়া চিন্তা করার প্রয়োজন হলে সেটা আমারে বলো। আমি চিন্তা করব। চিন্তা করার ক্ষমতা আল্লাহপাক সব মানুষকে দেন নাই। অল্পকিছু মানুষ চিন্তা করতে পারে। জগতের বেশিরভাগ মানুষ তোমার মতো কাজ করতে পারে। চিন্তা করতে পারে না।
সুলেমান এখনো মাথা নিচু করে আছে। তার দৃষ্টি উঠানে নিবদ্ধ। সিদ্দিকুর রহমান ঠিকই ধরেছেন। সে খুবই চিন্তিত এবং ভীত। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে গেছে। কারণ একটু আগে সে বড় ধরনের একটা মিথ্যা কথা বলেছে। তার ধারণা— মিথ্যা কথাটা ধরা পড়ে গেছে। এখনি সওয়াল-জবাব শুরু হবে। তার কঠিন শাস্তি হবে। সিদ্দিকুর রহমানের নিয়ম হলো, কঠিন শাস্তি দেবার আগে-আগে তিনি হালকা মেজাজে হাসিমুখে কথাবার্তা বলেন। অপরাধীর সঙ্গে ঠাট্টা-তামাশাও করেন। অপরাধীর ধারণা হয়ে যায় সে মাপ পেয়ে গেছে। সে যখন মোটামুটিভাবে নিশ্চিন্ত হতে শুরু করে তখনি শাস্তির হুকুম হয়। তার বেলাতেও কি এই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে! সেরকমই তো মনে হচ্ছে। সুলেমান গুটিয়ে গেল।
মিথ্যা কথা সে যা বলেছে তা হলো, মাসুদকে সে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসে। নি। উত্তরপাড়ার সুরুজ মিয়ার বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছে। এই কাজটা যে সে নিজ থেকে করেছে তা-ও না। এত সাহস তার নেই। কাজটা সে করেছে লীলাবতীর কথামতো। লীলাবতী বলে গিয়েছিল— মাসুদ ফিরে এলে তার বাবা তাকে আবার ট্রেনে করে পাঠিয়ে দিতে বলবেন। এই কাজটা তখন যেন না করা হয়। মাসুদকে যেন লুকিয়ে রাখা হয়। দু’একদিন পর তার বাবার রাগ খানিকটা পড়বে। ছেলের জন্যে মনখারাপ হবে। তখন যেন মাসুদকে নিয়ে আসা হয়। বুদ্ধিটা খুবই ভালো। সমস্যা একটাই— যার বুদ্ধি সে উপস্থিত নাই। বুদ্ধি দেয়া মানুষটা চলে গেছে। যন্ত্রণা এসে পড়েছে তার ঘাড়ে। অন্যের বুদ্ধিতে এত বড় যন্ত্রণা মাথায় নেয়া ঠিক হয় নাই।
সুলেমান!
জি চাচাজি?
আমার মেয়ে লীলাবতীকে যখন ট্রেনে তুলে দিলা তখন কি সে কাঁদতেছিল?
জি।
অল্প কেঁদেছে, না বেশি কেঁদেছে? বেশি কেঁদেছে। ঘনঘন শাড়ি দিয়ে চোখ মুছেছে। সিদ্দিকুর রহমান ইজিচেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। আগ্রহ নিয়ে বললেন— আমার এই মেয়ে যে পুরোপুরি তার মা’র মতো হয়েছে তা কিন্তু না। তার মাকেও আমি ট্রেনে তুলে দিয়েছিলাম। সে এক ফোটা চোখের পানি ফেলে নাই।
সুলেমান শঙ্কিত বোধ করছে। সে আবারো একটা মিথ্যা কথা বলে ফেলেছে। লীলাবতী কোনো চোখের পানি ফেলে নাই। সহজ স্বাভাবিকভাবে ট্রেনে উঠে বসেছে। বরং হাসিমুখে সবার দিকে তাকিয়েছে। তাহলে আগ বাড়িয়ে সুলেমান এই মিথ্যা কথাটা কেন বলল?
বাড়ির ভেতর থেকে রমিলার কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে। রমিলা চাপা গলায় কাঁদছেন। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে অস্পষ্ট স্বরে দুএকটা কথাও বলছে। সিদ্দিকুর রহমানের হঠাৎ ইচ্ছা করল— রমিলা কান্নার ফাঁকে ফাঁকে কী বলছে আড়াল থেকে সেটা শোনেন। খুবই অন্যায়। ইচ্ছা। তাঁর মতো মানুষের এ ধরনের ইচ্ছা হওয়া উচিত না। কিন্তু ইচ্ছাটা তিনি চাপা দিতে পারছেন না। তিনি ইজিচেয়ার থেকে নামলেন। ইজিচেয়ারের পেছনে রাখা হারিকেনটা হাতে নিলেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো— হারিকেন-হাতে উঠে দাঁড়ানো মাত্র রমিলার কান্না থেমে গেল।
সন্ধ্যাবেলায় তিনি খবর পেয়েছিলেন রমিলার গায়ে কোনো কাপড় নেই। এখন দেখা গেল।রমিলা শাড়ি পরে জড়সড় হয়ে খাটে বসে আছে। নতুন বউদের মতো মাথায় ঘোমটা দিয়েছে।
সিদ্দিকুর রহমান ডাকলেন, রমিলা!
রমিলা জবাব দিল না। আরো যেন গুটিয়ে গেল। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, শরীরটা কি এখন ভালো লাগছে?
রমিলা বলল, জি।
একটু আগে কাঁদতেছিলা কেন?
রমিলা বিড়বিড় করে বলল, আমি পাগল-মানুষ। আমার হাসন কান্দনের কোনো ঠিক নাই। ইচ্ছা হইলে হাসি। ইচ্ছা হইলে কান্দি।
সিদ্দিকুর রহমান বললেন, পাগল হওয়ার দেখি অনেক সুবিধা আছে। ইচ্ছামতো কাজকর্ম করা যায়। আমার অনেককিছু করতে ইচ্ছা হয়। করতে পারি না।
রমিলা সিদ্দিকুর রহমানকে বিস্মিত করে বলল, পাগলা হইয়া যান, তাইলে করতে পারবেন।
সিদ্দিকুর রহমান বললেন, পাগল হলো নিজের ইচ্ছামতো হাসা এবং কাদা ছাড়া আর কিছুই করতে পারব না। হাসি-কান্না এই দুটা কাজের মধ্যে পড়ে না। হাসি-কান্না কাজের ফল, কাজ না।
