রমিলা ক্ষীণ স্বরে বলল, জি।
লীলা ফিরে এসেছে, খবর পেয়েছো?
জি।
তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছে?
না।
সে যে ফিরত আসতেছে এটা তুমি কীভাবে বললা?
জানি না।
সিদ্দিকুর রহমান ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, কাঁঠালের বিচি জোগাড় করে রেখেছি। যাও, মুরগির সালুন রাধো।
রমিলা ঘোমটা সরিয়ে সিদ্দিকুর রহমানের দিকে তাকিয়ে হাসল। সিদ্দিকুর রহমান রমিলার ঘরের দরজা খুলে দিলেন।
এখনো ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি পড়ছে। সিদ্দিকুর রহমান ভেতরের উঠোনে বসে আছেন। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে রমিলা তোলা উনুনে রান্না বসিয়েছে। দৃশ্যটা দেখতে সিদ্দিকুর রহমানের খুব ভালো লাগছে।
সুলেমান বসেছে তার পায়ের কাছে। পায়ের আঙুলে রসুন দিয়ে গরম করা সরিষার তেল মাখিয়ে দিচ্ছে। [ র রহমান বললেন, সুলেমান শোনো, তোমরা দুই ভাই যে অপরাধ করেছ সেটা ক্ষমা করলাম। শেষবারের মতো করলাম। মাসুদকে বলবা সকালে যেন আমার সঙ্গে দেখা করে।
সুলেমান মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে বলল, জি আচ্ছা।
ডাক্তার কি আসছে?
জি আসছে। প্রফেসর সাবরে দেইখা গেছে।
ডাক্তার কী বলল?
বলেছেন অবস্থা ভালো না। রোগী টিকিব না।
দুঃসংবাদে সিদ্দিকুর রহমান বিচলিত হলেন না। সারা শরীরে আরামদায়ক আলস্য নিয়ে তিনি বসে আছেন। বৃষ্টির শব্দ শুনছেন। তাঁর বড় ভালো লাগছে।
সুলেমান।
জি।
জগৎ যে রহস্যময় এটা জানো?
সুলেমান জবাব দিল না। জগতের রহস্য নিয়ে বিচলিত হবার মানসিকতা তার নেই। তার কাজ বড় সাহেবের হুকুম তামিল করা। সারাজীবন এই কাজটাই সে করবে। একটু আগে বিরাট একটা ফাড়া কেটেছে। ফাড়া কাটার আনন্দেই সে আনন্দিত।
সুলেমান শোনো, জগৎ বড়ই রহস্যময়। কেন জানো?
জি না।
কারণ খুব সোজা। যিনি জগৎ তৈরি করেছেন তিনি রহস্য পছন্দ করেন। তিনি নিজেও রহস্যময়। এখন বুঝেছ?
জি।
যেসব মানুষের ভেতর রহস্য আছে। তিনি তাদেরও পছন্দ করেন। যার ভেতর রহস্য নাই, তাকে তিনি পছন্দ করেন না। তার প্রতি কোনো আগ্রহ বোধ করেন না।
সুলেমান প্রায় অস্পষ্ট স্বরে বলল, তামুক খাইবেন? হুক্কা আনি?
আনো।
সুলেমান হুঙ্কা আনতে যাচ্ছে না। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। বড় সাহেবকে একা রেখে সে যেতে পারে না। আশেপাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। লোকমান গেল কোথায়? তার তো এখানে থাকার কথা।
যাত্ৰা ভঙ্গ করে ফিরে আসার সময় মঞ্জু যতটা বিরক্ত হয়েছিলেন এখন ততটাই আনন্দ পাচ্ছেন। বদু তার গায়ে তেল মালিশ করছে। আরামে তার ঘুম চলে এসেছে। তেল মাখানো পর্ব শেষ হলে বৃষ্টির পানিতে গোসল করবেন। জানিয়েছেন। বৃষ্টি-স্নানের দুজন সঙ্গীও তার জুটেছে। জাইতরী ও কইতরী দুই বোন। জাইতরী আগে আড়ালে আড়ালে থাকত, আজ সে প্রকাশ্য হয়েছে এবং মহাআনন্দে হাড়হড় করে কথা বলে যাচ্ছে। এই মেয়ের কথার স্রোতে কইতরী টিকতে পারছে না। জাইতরী মেয়েটা কথাও বলছে গুছিয়ে এবং বেশ রহস্য করে–
কইতরী আপনারে ভালো পায়। আমি পাই না।
তুমি পাও না কেন?
আপনারে বলব না।
কেন বলবে না?
বললে ভাববেন আমি মন্দ মেয়ে।
তুমি কি ভালো মেয়ে?
হুঁ।
যে ভালো সে নিজে জানে সে ভালো। যে মন্দ সে নিজে জানে না। সে মন্দ।
এই বাড়িতে মন্দ কে?
আপনেরে বলব না।
এই বাড়িতে মন্দ কতজন আছে?
একজন।
সে কে?
একবার তো বলেছি আপনেরে বলব না।
কইতরী এবং জইতরী এই দুই বোনের ভেতর ভালো কে?
আমি ভালো।
সুন্দর কে?
আমি।
সবই তুমি?
হুঁ।
তোমার আরেক বোন লীলা, সে তো তোমার চেয়েও সুন্দর।
হুঁ।
সে তোমার চেয়ে ভালো?
হুঁ। কিন্তুক সে আলাদা।
সে আলাদা কেন?
আপনেরে বলব না।
তোমরা দুই বোন যে বৃষ্টিতে আমার সঙ্গে ভিজবে তোমাদের বাবা বকবে না?
না।
বকবে না কেন?
বাপজানের মন এখন ভালো। উনার মন ভালো থাকলে কাউকে বকেন না।
মন ভালো কেন?
বড়বুবু ফিরা আসছে–এইজন্য মন ভালো।
বড়বুবু ফিরে আসায় তোমরা খুশি হয়েছ?
হুঁ। আইজ রাইতে আমরা বড়বুবুর সঙ্গে ঘুমাব।
লীলা মাঝখানে আর তোমরা দুই বোন দুই পাশে?
হুঁ।
আজ রাতে তোমাদের খুবই মজা হবে?
হুঁ।
বৃষ্টির পানিতে তিনি যখন দুই কন্যাকে নিয়ে নামলেন তখন জাইতরী ঘোষণা করল— আমি আপনেরে ভালো পাই।
মঞ্জু বললেন, কেন?
জইতরী বলল, জানি না। কী জন্যে। কিন্তু আমি আপনেরে ভালো পাই।
শুনে খুশি হলাম।
আমার একটা নিয়ম আছে।
কী নিয়ম?
আমি একবার যখন কাউকে ভালো পাই তারে সারা জীবনই ভালো পাই।
এই নিয়ম কি তুমি নিজে বানিয়েছ?
হুঁ।
জইতরী এসে মঞ্জুর হাত ধরল। তার দেখাদেখি কইতরীও হাত ধরল। বৃষ্টির পানি বরফের মতো ঠাণ্ডা। দুই বোনই শীতে কাঁপছে, তারপরও তাদের আনন্দের সীমা নেই।
মঞ্জুর মনে হলো, এই দুই কন্যাকে রেখে তার পক্ষে ফিরে যাওয়া অসম্ভব হবে। লীলা চলে যেতে চাইলে চলে যাবে, তিনি থাকবেন।
রমিলা লীলাকে নিয়ে খেতে বসেছেন। বেশ আয়োজন করেই খেতে বসা হয়েছে। পাটির উপর বড় জলচৌকি বসানো হয়েছে। মা-মেয়ে বসেছে। জলচৌকির দুপাশে।
রমিলা মাথা নিচু করে খাচ্ছেন। তার মাথায় বিরাট ঘোমটা। ঘোমটার ভেতর দিয়ে আড়াচোখে মেয়েকে দেখছেন। যতবারই দেখছেন ততবারই লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলছেন।
মাগো, তুমি যে ফিরত আসবা আমি জানতাম।
লীলা বলল, এখন আপনার কথা আমার বিশ্বাস হয়।
তোমার কার সাথে বিবাহ হবে সেইটাও আমি জানি। বলব?
না। আমার ভবিষ্যৎ জানতে ইচ্ছা করে না।
রমিলা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমারো জানতে ইচ্ছা করে না।
