আপনি কী দেখেছিলেন?
আমি দেখলাম আমার দুটা হাত লম্বা হতে শুরু করেছে। হাতটা যেন রবারের। কেউ টানছে আর লম্বা হচ্ছে। গল্পে জ্বীনের হাতের কথা পড় না? জ্বীন খেতে বসেছে। কাগজি লেবু দরকার। লম্বা হাত বাড়িয়ে বাড়ির উঠোনের কোণার কাগজি লেবু গাছ থেকে লেবু ছিড়ে নিয়ে এল। সেই রকম।
অদ্ভুত তো! অদ্ভুততো বটেই।
সিদ্ধির সরবত খাবার পরই গাছ গাছড়ার ব্যাপারে আমার খুব কৌতূহল হয়। এই বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করি। বোটানীর ছাত্র না হয়েও—গাছ গাছড়া সম্পর্কে আমি অনেক জানি। প্রমাণ দেব?
না প্রমাণ দিতে হবে না। প্রমাণ দেবেন কেন? আপনি যা বলবেন, আমি তাই বিশ্বাস করব।
যে যা বলে তুমি কি তাই বিশ্বাস কর?
না।
সিদ্ধির সরবতের গল্পটা তোমার মনে হয় ভাল লাগে নি।
আপনার এ রকম মনে হচ্ছে কেন?
যাদেরকেই আমি সিদ্ধির সরবত খাবার গল্পটা বলেছি তারাই গল্পের এক পর্যায়ে বলেছে—আমি একটু খেয়ে দেখতে চাই। কোথায় পাওয়া যায়? তুমি কিছু বল নি।
আপনি কি একই গল্প সবাইকে করেন?
আমি একা কেন সবাইতো তাই করে। সব মানুষেরই তার নিজের কিছু গল্প থাকে। এই গল্পগুলিই সে সবাইকে করে।
ও।
আচ্ছা দেখি তোমার জ্ঞান। বল কত রকমের শাক আমাদের দেশে পাওয়া যায়?
জানি না।
অবশ্যই জান। অন্তত কিছু কিছুতো জান—পুঁই শাক, লাল শাক, কলমী শাক, পালং শাক…. এর বাইরে কী জান?
এর বাইরে কিছু জানি না।
আচ্ছা দাঁড়াও তোমাকে কিছু শাকের নাম শুনিয়ে দেই…. সরিষা শাক, জয়ন্তি শাক, গুলঞ্চ শাক, হিঞ্চ শাক, ঘেঁটু শাক, সুষনি শাক, কালকাসুন্দে শাক, বেতো শাক, লাউ শাক, শেভেঞ্জে শাক….। এদের মধ্যে একটা শাক আছে যা খেলে পাগল ভাল হয়। মনোবিকারগ্রস্তদের বিকার কমে। শাকটার নাম হল সুষনি শাক। বোটানিক্যাল নাম হল—Marsilea quadrifolia. তোমার কাছে ইন্টারেস্টিং লাগছে কি-না বল?
লাগছে।
ভেরি গুড। আচ্ছা এখন যাও—আমাদের ক্যামেরা ওপেন করার সময় হয়ে এসেছে।
আপনি কী জরুরি কথা যেন বলবেন বলেছিলেন।
জরুরি কথা? ও হ্যাঁ জরুরি কথা। আচ্ছা এখন থাক—পরে বলব। অনেক অপ্রয়োজনীয় কথার মাঝখানে হঠাৎ একটা প্রয়োজনীয় কথা, শুনতেও ভাল লাগে না। বলতেও ভাল লাগে না।
আমি হঠাৎ লক্ষ্য করলাম তিনি খুব অস্বস্থি বোধ করছেন। না অস্বস্থি না, অস্থিরতা। মনে হচ্ছে তিনি কোন কিছুতে মন বসাতে পারছেন না। চেয়ারে বসেছিলেন, চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। আবার বসলেন। ড্রয়ার খুলে সোনালী ফ্রেমের চশমা বের করে পরলেন। আয়নায় নিজেকে দেখলেন। এই চশমাটাও তার পছন্দ হল না। তিনি ড্রয়ার হাতড়াচ্ছেন। ড্রয়ারের জিনিসপত্র নামাচ্ছেন। তিনি আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন— রুমালী তোমার সঙ্গে কি নীরার কথা হয়েছে?
জ্বি হয়েছে।
কী ধরনের কথা?
সাধারণ কথা।
সাধারণ কথার ফাঁকে সে কি বলেনি— আমি অসুস্থ?
জ্বি বলেছেন।
কী ধরনের অসুস্থ তা বলে নি?
জ্বি না।
তুমি জানতে চাও নি?
জ্বি না।
তোমার কাছে কি আমাকে অসুস্থ মনে হচ্ছে?
জ্বি-না।
অনেক অসুখ আছে বাইরে থেকে বোঝা যায় না। আমি আসলেই অসুস্থ।
তিনি আবার আগের জায়গায় এসে বসেছেন। এখন তাকে শান্ত মনে হচ্ছে। অস্থিরতা কেটে গেছে। তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে একটু ক্লান্ত গলায় বললেন–নীরা যুক্তি-তর্ক খুব ভাল পারে। সে তার যুক্তি দিয়ে নিমিষের মধ্যে প্রমাণ করে দিতে পারে যে আমি সুস্থ আবার প্রমাণ করতে পারে আমি অসুস্থ। ও অনেকটা গার্গীর মত।
গার্গী কে?।
প্রাচীন ভারতের এক মেয়ে, যাজ্ঞবল্ক্য নামের এক মহাজ্ঞানী পন্ডিতকে যুক্তিতে হারিয়ে সে লেজেগোবরে করে দিয়েছিল। তর্কে হেরে ভূত হয়ে যাজ্ঞবল্ক্য শেষ পর্যন্ত বললেন,— গার্গী তুমি প্রশ্নের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ। তুমি যদি না থাম তাহলে তোমার মাথা খসে পড়বে। পৌরাণিক গল্প।
আমার ইচ্ছা করছিল বলি, তর্কে হেরে আপনিও কি যাজ্ঞবল্কৈর মত বলেন— তুমি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ তুমি থাম নয়তো তোমার মাথা খসে পড়বে। তা বললাম না। কুণ্ঠিত গলায় জানতে চাইলাম, আজ আমার কোন অংশটা হবে?
সবাইকেইতো সবারটা বলেছি তোমাকে বলা হয় নি?
জ্বি না।
আচ্ছা পরে বলব।
পরে কেন। এখনি বলুন। আমি নিজের মনে একটু ভাবব।
তিনি চিন্তিত মুখে আরেকটা সিগারেট হাতে নিলেন। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে সিগারেটে আগুন ধরালেন। সিগারেটে টান দিয়ে খুব কাশতে লাগলেন। জীবনের প্রথম সিগারেটে টান দিলে মানুষ যে ভাবে কাশে তিনি সেই ভাবে কাশছেন। মনে হচ্ছে তাঁর জগৎটা আবারো এলোমেলো হয়ে গেছে। তিনি এ রকম করছেন কেন?
দিলুর যে অংশটা আজ শুট করা হবে সেটা হচ্ছে সিক্লোয়েন্স ওয়ান হানড্রেড থার্টি টু। দিলুর এক কাল্পনিক বান্ধবী আছে— Imaginary friend. তার নাম তৃণা। দিলু যখন কোন ব্যাপারে খুব আপসেট হয় তখন সে কোন এক নির্জন জায়গায় চলে যায়। তার কল্পনার বান্ধবীর সঙ্গে কথা বলে। ঐ অংশটা।
কল্পনার বান্ধবীকে কি সত্যি সত্যি দেখানো হবে?
না দেখানো হবে না। দিলুর এই কাল্পনিক বান্ধবী কখনো দিনে আসে না। আসে রাতে। কাজেই আমি কী করব শোন দিলুকে রাতে আধো আলো, আধো অন্ধকারে বসিয়ে দেব। লাইট সোর্স এমন রাখা হবে যেন দেয়ালে দিলুর দুটা ছায়া পড়ে। দিলু তার একটা ছায়ার সঙ্গে কথা বলবে। দিলু এবং তার দুটা ছায়াকে নিয়ে থ্রি শর্টে শুট করা হবে। থ্রি শট থেকে টু শট। দিলু এবং দিলুর। একটা ছায়া। টু শট থেকে সিঙ্গেল শট। ক্লোজ আপ। দিলুর ক্লোজ আপ, ছায়ার ক্লোজ আপ।
