বাহ সুন্দর তো।
সুন্দরতো বটেই। মানুষ এবং তার ছায়া নিয়ে টু শট বানানো–কনসেপ্ট হিসেবে ইন্টারেস্টিং। আচ্ছা তুমি এখন যাও।
আপনার কি শরীর খারাপ? না শরীর খারাপ না। I am just fine.
আমি তার ঘর থেকে বের হয়ে এলাম। ঘরের বাইরেই সোহরাব চাচা। দেখে মনে হল তিনি আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন।
তাঁর মুখ আগের মতই বিরক্ত ও বিষণ্ণ। মনে হচ্ছে তিনি রেগেও আছেন। কার উপর রেগে আছেন? আমার উপর? সোহরাব চাচা আমার সঙ্গে সঙ্গে আসছেন। আমি বললাম, চাচা আপনি কি আমাকে কিছু বলবেন? সোহরাব চাচা নিচু গলায় বললেন, হ্যাঁ বলব। স্যারের সঙ্গে তোমার কথা হয়েছে?
হ্যাঁ।
কী কথা হয়েছে?
শাক নিয়ে কথা হয়েছে। বাংলাদেশে কত রকম শাক পাওয়া যায় এইসব।
আর কোন কথা হয় নি?
না।
শাক সজির বাইরে কোন কথা হয় নি?
জ্বি না। কী কথা হবে?
সোহরাব চাচা জবাব দিলেন না। তিনি হন হন করে উল্টো দিকে যাচ্ছেন। খুব সম্ভব ডিরেক্টর সাহেবের ঘরে যাচ্ছেন। কোন সমস্যা কি হয়েছে? আমাকে নিয়ে কোন সমস্যা? হোক সমস্যা। আমি মার ঘরের দিকে রওনা দিলাম।
আশ্চর্য মার ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে করছ না। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। ডাকবাংলোর সামনে একটা জীপ গাড়ি এসে থেমেছে। জীপ থেকে বেশ কিছু অচেনা মানুষজন নামছে। এদের মধ্যে একট মেয়ে আমার বয়েসী। খুব মিষ্টি চেহারা। মাথাভর্তি কোকড়ানো চুল। মেয়েটি অভিভূতের মত চারদিকে তাকাচ্ছে। একবার তাকাল আমার দিকে। আমি হাসলাম। এত দূর থেকে সে নিশ্চয়ই আমার হাসি দেখতে পাচ্ছে না। দেখতে পেলে তার ভাল লাগতো। সে দ্বিতীয়বার আমার দিকে তাকাতেই আমি হাত নাড়লাম। দিলু হলে তাই করতো। মেয়েটি এখন অবাক হয়ে আমাকে দেখছে। সোহরাব চাচা ওদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। জীপের ড্রাইভার বড় বড় স্যুটকেস টেনে নামাচ্ছে। এরা মনে হয় আমাদের সঙ্গে থাকবে।
পাপিয়া ম্যাডামের মেয়েটা উঠোনে একা একা হাঁটছে। এর সঙ্গে আমার এখনো কথা হয় নি। আজ কোন এক ফাঁকে তার সঙ্গে ভাব করব। একী মেয়েটা বিড় বিড় করে কথা বলছে নাকি? কার সঙ্গে কথা বলছে? কল্পনার কোন বান্ধবী। দিলুর মত তারও কি কোনো ইমাজিনারি ফ্রেন্ড আছে?
আমি মার ঘরে ঢুকলাম। ঘরে মা একা। তাঁর মাথায় পানি দেয়া হয়েছে। চুল ভেজা। মা চাদর গায়ে অসহায় ভঙ্গিতে শুয়ে আছেন। আমি ঘরে ঢুকতেই চোখ মেললেন। তার চোখ টকটকে লাল। তিনি আগ্রহ নিয়ে বললেন, বকু একটা গাড়ি এসে থেমেছে না? শব্দ শুনলাম। আমি বললাম, হ্যাঁ।
কে এসেছে তোর বাবা?
বাবা আসবে কীভাবে? বাবার কি আসার কথা?
সোহরাব ভাইকেতো বলেছি উনাকে খবর দিতে।
উনি খবর পাঠালেও বাবার আসতে আসতে দুতিন দিন লাগবে।
দুতিনদিন লাগবে কেন? ঢাকা থেকে এখানে আসতে পাঁচ ছঘন্টা লাগে। পাগলের মত কথা বলিস কেন?
মা তোমার জ্বর মানে হয় খুবই বেশি। তুমিতো কথাই বলতে পারছ না। তোমার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।
আমি মার কপালে হাত রেখে চমকে উঠলাম–জ্বর আসলেই বেশি। পানি ঢেলে কোন লাভ হয় নি। জ্বর কমে নি। মার শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। কেমন টেনে টেনে শ্বাস নিচ্ছেন।
জীপে করে কে এসেছে বকুল?
জানি না মা।
জীপের শব্দ শুনে মনে হল তোর বাবা এসেছে।
একবারতো বলেছি মা, বাবা আসে নি।
তোর বাবা এলে থাকবে কোথায়?
এই ঘরেই থাকবে, আর থাকবে কোথায়?
আরে না। তা কী করে হয়! তোর বাবার সঙ্গে আমি কি আর এক ঘরে থাকতে পারি? তুই আর তোর বাবা এইখানে থাকিস। আমি অন্য কোথাও চলে যাব।
বাবা এসে কোথায় থাকবে সেটা নিয়ে তোমাকে এখন মাথা গরম করতে হবে না। বাবা আসুক তারপর দেখা যাবে। আমার মেকাপ কেমন হয়েছে মা?
মা আমার দিকে না তাকিয়েই অনাগ্রহের সুরে বললেন, ভাল।
তুমি কী ভাবছ মা?
কিছু ভাবছি না। আচ্ছা শোন, তোর বাবা আবার সঙ্গে করে ঐ ধুমসী মাগীটাকে আনবে নাতো?
আনতেও পারে। মা শোন-ধুমসী মাগী টাইপ কথা বলো নাতো শুনতে খারাপ লাগে।
ধুমসী মাগীকে কী বলব–শুকনো মাগী বলব?
আচ্ছা ঠিক আছে—যা বলতে ইচ্ছে করে বলো।
মা শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরে আছেন। যেন হাত ছেড়ে দিলেই আমি কোথাও চলে যাব। আমাকে আটকে রাখতে হবে।
মা তোমার কি খুব বেশি খারাপ লাগছে?
হুঁ।
পানি খাবে?
খাব।
আমি মাকে পানি এনে দিলাম। মা খেতে পারলেন না। একটু মুখে দিয়েই রেখে দিলেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, বকু পানিটা ভয়ংকর তিতা লাগছে। পানি তিতা লাগা খুব অলক্ষণ। মৃত্যুর আগে আগে আল্লাহ পাক পানি থেকে স্বাদ উঠিয়ে নেন। পানি তিতা বানিয়ে দেন।
কত অদ্ভুত কুসংস্কারের মধ্যে যে তুমি বাস কর না মা। রাগ লাগে। জ্বর-জ্বারি হলে পানি তিতা লাগে। পানি কেন সব খাবারই তিতা লাগে।
এই তিতা সেই তিতা না-রে মা। অন্য রকম তিতা।
মা চুপ কর। তোমার কথাবার্তা অসহ্য লাগছে। সামান্য জ্বর হয়েছে আর তুমি কী শুরু করেছ!
মা অনেক কষ্টে পাশ ফিরলেন, একটা হাত আমার কোলে দিলেন। মাকে দেখে আমার এখন ভয়ংকর মায়া লাগছে। ইচ্ছে করছে আমিও মার সঙ্গে চাদরের নীচে চলে যাই। মাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকি। দিলুতো তাই করবে। সে মাকে এই অবস্থায় ফেলে কোথাও যাবে না।
বকু!
কী মা?
তোর বাবার খুব ভাল একটা গুণ কী জানিস? অসুখ বিসুখে সে খুব সেবা করতে পারে। আমাদের একটা কাজের ছেলে ছিল রুসমত নাম। তার একবার টাইফয়েড হল। উঠে বসতে পারে না, নড়তে চড়তে পারে না এমন অবস্থা। তোর বাবা তাকে মুখে তুলে ভাত খাইয়ে দিত। সেই ছেলে এমনই হারামজাদা তোর বাবার পকেট থেকে একদিন মানিব্যাগ নিয়ে পালিয়ে গেল।
