সোহরাব চাচা আমাকে চমকে দিয়ে বললেন, রুমালী তোমার অভিনয় খারাপ হবে না। আমার দেখা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীদের মধ্যে তুমি একজন। যে কোন অবস্থায় তোমার অভিনয় ভাল হবে।
সুবীরদা একটা ভেজা কাপড় আমার মুখের উপর দিয়ে দিলেন। আমি চোখ বন্ধ করে পড়ে আছি। আমি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীদের একজন, সোহরাব চাচা এই কথা কেন বললেন, তা বের করার চেষ্টা করছি। তিনি কি কিছু জানেন? না কিছু অনুমান করেছেন?
ডিরেক্টর সাহেবকে আজ খুব সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে তাঁর বয়স দশ বছর কমে গেছে। তিনি ধবধবে শাদা প্যান্টের উপর লাল-নীল স্ট্রাইপ দেয়া হাফ সার্ট পরেছেন। আজ কি তিনি চুল অন্যরকম করে আঁচড়েছেন? তাকে একটু যেন অচেনা লাগছে। তার চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। এই ভদ্রলোকের চশমা প্রীতি আছে। তার অনেকগুলি চশমা। তিনি একেক সময় একেক চশমা পরেন। তিনি আমাকে দেখে হাসি মুখে বললেন, রুমালী তোমার খবর কী?
ঝড় বৃষ্টির রাতে স্কুল ঘরের কথা তাঁর কি কিছু মনে নেই?
আমিও তার মতই সহজ এবং স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করছি। পারছি না। আমার হাত পা ভারী হয়ে আসছে। গলার স্বর বসে যাচ্ছে। সোহরাব চাচার কথা মত আমি যদি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হয়েও থাকি–এই মানুষটার সামনে সহজ হবার সাধারণ অভিনয় করতে পারছি না। কিংবা কে জানে সহজ হবার অভিনয়ই হয়তো সবচে কঠিন।
তোমাকে একটা জরুরি কথা বলার জন্যে ডেকেছি।
বলুন।
বোস! জরুরি কথাটা এমন না যে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতে হবে।
আমি বসলাম। তিনি চেয়ার টেনে আমার সামনে বসলেন। হাসি মুখে বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, জরুরি কথার আগে জরুরি না এমন একটা জিনিস দেখ। আমার হাতে এটা কী দেখ? নাও হাতে নিয়ে দেখ। এটা হচ্ছে একটা বুনো ফল। ফটার নাম হল–মন-ফল। ইংরেজী করলে হবে Mind-Fruit.
মন-ফল?
হ্যাঁ মন-ফল। পাহাড়ি অঞ্চলের গাছে হয়। কাটায় ভর্তি গাছ। ঢল যখন নামে তখন পানিতে ভেসে আসে।
কাগজী লেবুর সাইজের ফলটা আমি হাতে নিলাম। পচা টাইপ গন্ধ আসছে। বুনো ফলের বুনো গন্ধ। আমি বললাম, ফলটার বিশেষত্ব কী?
কাচা অবস্থায় ফলটা বিষাক্ত। যখন পাকে তখন অল্পবয়েসী মেয়েরা ফলটা খুব আগ্রহ করে খায়। তখন তাদের মন না-কি অন্য রকম হয়ে যায়। এই জন্যেই ফলটার নাম মন-ফল Mind-Fruit. মেয়েরা এই ফল লুকিয়ে চুরিয়ে খায়।
শুধু মেয়েরাই খায়? ছেলেরা খায় না।
শুনেছি ছেলেরা খায় না। তাদের উপর ফলের তেমন প্রভাবও নেই। ফলটা অবিবাহিত কুমারী মেয়েদেরই প্রিয়। তোমার কাছে ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগছে না?
জ্বি লাগছে।
আমার ধারণা এই ফলে কোন হেলুসিনেটিং ড্রাগ-ট্রাগ আছে। মাইন্ড অলটারিং ড্রাগ, ধুতরায় যেমন আছে তেমন। ঠিক করেছি ফলের কার্যকারিতা আমি পরীক্ষা করে দেখব।
খাবেন?
হ্যাঁ খাব।
আপনিতো বললেন, ছেলেদের উপর কোন প্রভাব পড়ে না।
এই জন্যেই বেশি করে খাব। আমি গোটা চারেক ফল জোগাড় করতে বলেছি। সহজে পাওয়া যায় না।
এই ফলটা কি পাকা?
বাইরের খোসা সবুজ হলেও ফলটা না-কি পাকা।
আপনার খেয়ে দরকার নেই। আমাকে দিন–আমি খেয়ে কী হয় আপনাকে বলব।
আরে না। তুমি কী খাবে! আমি আগে পরীক্ষা করে নেই। ইন্টারেস্টিং কিছু পেলে তখন তোমাকে বলব। এই সব পরীক্ষা মাঝে মাঝে খুব ফ্যাটালও হয়। সিদ্ধির শরবত খেয়ে একবার প্রায় মরতে বসেছিলাম। গল্পটা শুনবে?
আমি গল্পটা শুনতে চাচ্ছি না। কারণ আমি দ্রুত দিলু হয়ে যাচ্ছি। দিলু অন্যের গল্প শুনতে তেমন আগ্রহী না। সে নিজের গল্প করতে চায়। আমার অনেক গল্প আছে যা আমি উনাকে শুনাতে চাই। মুখে সাবানের ফেনা নিয়ে ফু দিয়ে আমি খুব সুন্দর বাবল বানাতে পারি। দূর থেকে দেখলে মনে হবে মুখ থেকে একের পর এক বেলুন বের হচ্ছে। কিন্তু উনি নিজেই এখন গল্প করবেন। সিগারেট ধরালেন। সিগারেট ধরানো মানে লম্বা গল্পের প্রস্তুতি।
সে এক মজার গল্প। না মজার না, টেনশানের গল্প। এখনো মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। এই দেখ গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
তিনি হাত এগিয়ে দিলেন। হাতের লোম সত্যি খাড়া হয়ে আছে।
আমি হাসলাম, তিনি গল্প শুরু করলেন। খুব আগ্রহ করে যে গল্পই বলা হোক শুনতে ভাল লাগে। অসাধারণ গল্প ও অনাগ্রহের সঙ্গে বললে শুনতে ভাল লাগে না। ডিরেক্টর সাহেব সব গল্পই খুব আগ্রহের সঙ্গে করেন। তবে আমার সমস্যা হচ্ছে—আমি উনার কোন গল্পই মন দিয়ে শুনতে পারি না। গল্পের মাঝামাঝি জায়গায় সব কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। মনে হয় তিনি অনেক দূর থেকে কথা বলছেন। তাঁর চেহারা অস্পষ্ট হয়ে আসে। কেন এ রকম হয়?
রুমালী শোন, সিদ্ধির সরবতের ব্যাপারটা তোমাকে বলি— শাক্ত হিন্দুরা কালীপূজার রাতে এই সরবত তৈরি করে। মহাদেব শিব তাঁর সঙ্গী নন্দি ভূঙ্গিকে নিয়ে এই সরবত খেতেন বলে শিবের অনুসারিরাও পূজার অঙ্গ হিসেবে খায়। পেস্তা বাদাম পিশে, দুধ চিনি মিশিয়ে এই সরবত তৈরি করা হয়। ঘটিতে করে বরফ কুচি মিশিয়ে পরিবেশন করে। খেতে অতি স্বাদু। তবে সরবতের আসল ইনগ্রেডিয়েন্ট ধুতরো পাতার রস। ধুতরো পাতা কচলে সেই রস সরবতে মিশিয়ে দেয়া হয়। ফল ভয়াবহ। ধুতরো পাতার রসে আছে—পাওয়ারফুল মাইন্ড। অলটারিং হেলুসিনেটিং ড্রাগ। যে খায় কিছুক্ষণের মধ্যেই তার জগৎটা যায় পাল্টে। সে ভয়ংকর ভয়ংকর সব জিনিস দেখতে থাকে।
কী রকম ভয়ংকর?
নির্ভর করে সরবতটা কে খেয়েছে তার মানসিকতার উপর। কেউ ভূত-প্রেত দেখে, কেউ দেখে তার আত্মা শরীর থেকে বের হয়ে আকাশে উড়ে যাচ্ছে।
