মওলানা সাহেব!
জ্বি আম্মাজী।
আপনি দেখি মেকাপ দেয়ার সব কৌশল শিখে ফেলছেন।
মওলানা সাহেব হাসলেন। তার হাসি সুন্দর। হাসির মধ্যে শিশু শিশু ভাব আছে। দিলুর সঙ্গে খুব সূক্ষ্মভাবে তার কিছু মিল আছে। তার কৌতূহল বেশি। তিনি কথা বলতে পছন্দ করেন।
আমি বললাম, মওলানা সাহেব! মেকাপ নেয়া কি গুনাহর কাজ?
গুনাহ হবে কেন?
আল্লাহ্ যে চেহারা দিয়ে পাঠিয়েছেন, সেই চেহারা বদলে ফেলা হচ্ছে এটা গুনাহ না?
আমি এত কিছু জানি না মা। আমার জ্ঞান বুদ্ধি খুবই কম। তবে মেকাপ দিয়ে চেহারা সুন্দর করা হয়— এর মধ্যে দোষের কী? আল্লাহ্ পাক সুন্দর পছন্দ করেন।
সুন্দর পছন্দ করেন কেন?
কারণ তিনি সুন্দর।
তিনি সুন্দর আপনাকে কে বলল?
কেউ বলে নাই। আমার অনুমান।
সুবীরদা বিরক্ত মুখে বললেন, মওলানা সাহেব এখান থেকে যান। আমার অসুবিধা হচ্ছে। মেকাপ নিতে নিতে আর্টিস্ট যখন কথা বলে তখন চামড়ায় ভাঁজ পড়ে। সেই ভঁজ উঠতে চায় না।
মওলানা সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বললেন, জি আচ্ছা জনাব যাচ্ছি। তিনি লজ্জিত মুখে চলে যাচ্ছেন। আমার মায়া লাগছে। সুবীরদা এমন কঠিন আচরণ কখনো করেন না। আজ করছেন, কারণ আজ তার মন খারাপ। আমার আগে তিনি পাপিয়া ম্যাডামকে মেকাপ দিয়েছেন। ম্যাডাম তার সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছেন। মেকাপ শেষ হবার পর ম্যাডামের হাতে আয়না দেয়া হল। তিনি আয়নায় কিছুক্ষণ নিজেকে দেখে বললেন, এটা কী মেকাপ দিয়েছ? আমি কি সার্কাসের সঙ? এই বলে তিনি থেমে থাকেন নি–আয়না ছুঁড়ে ফেলেছেন। আয়নাটা ঘাসের উপর পড়েছে বলে ভাঙ্গে নি। পাপিয়া ম্যাডাম বলেছেন, মেকাপ তুলে আবার দাও। মন বসিয়ে কাজ কর। কাজ করবে বাংলাদেশে মন পড়ে থাকবে কোলকাতায় তাতো হবে না।
সুবীরদা পাপিয়া ম্যাডামের মেকাপ তুলে আবার মেকাপ দিলেন। এরপরেও যে তিনি শান্ত ভঙ্গিতে আমার মেকাপ দিতে পারছেন তাই যথেষ্ট। সুবীরদা না হয়ে অন্য কেউ হলে পারত না।
সুবীরদা!
কী মা?
আপনার মন খারাপ ভাব কি কমেছে?
পাপিয়া ম্যাডামের ব্যাপারটার কথা বলছ?
জ্বি।
দূর কোন মন খারাপ না। ছোট কাজ যারা করে তাদের এইসব অপমান গা সহা। যখন অপমানটা করে তখন কষ্ট হয়। তারপর আর কষ্ট থাকে না।
এখন নেই?
একটু একটু আছে।
একটু একটু আছে কেন?
ঐ যে ম্যাডাম বললেন, কাজ কর বাংলাদেশে মন পড়ে থাকে কোলকাতায় এই জন্যে। আমাদের স্বজাতির অনেকেই ভারতে চলে গেছে এটা যেমন ঠিক আবার অনেকেই মাটি কামড়ে এখানে পড়ে আছে এটাও ঠিক। কেউ যখন বলে তোমার মন পড়ে আছে কোলকাতায় তখন তারাই মনে করিয়ে দেয় যে বাংলাদেশটা পুরোপুরি আমার না।
সুবীরদা, মানুষ রাগ করে যে কথা বলে সে কথা ধরতে নেই।
মাগো রাগের সময়ই মানুষ সত্য কথাগুলি বলে। মনের ভেতর চাপা পড়ে থাকা কথা তখন বের হয়ে আসে।
আপনি ঠিক বলেন নি। রাগের সময় আমরা সব সময় উল্টা পাল্টা কথা বলি। মা খুব রেগে গেলে আমাকে বলেন— তুই মর। তুই মরলে আমার শান্তি হয়। আপনি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করেন না যে মা আমার মৃত্যু চান।
না বিশ্বাস করি না।
তাহলে কি আপনি স্বীকার করলেন যে রাগের সময়ই মানুষ ভুল কথাগুলি বলে?
সুবীরদা হেসে ফেলে বললেন, হ্যাঁ স্বীকার করলাম। তোমার বুদ্ধি খুব ভাল। ধারাল বুদ্ধি।
ধারাল বুদ্ধিটা কী?
যে বুদ্ধি কেটে কেটে যায়–সেটাই ধারাল বুদ্ধি।
বুদ্ধি তাহলে অনেক প্রকার?
অবশ্যই। শান্তি-বুদ্ধি যেমন আছে অশান্তি-বুদ্ধিও আছে। শান্তি-বুদ্ধির কেউ তোমায় আশে পাশে থাকলে তোমার শান্তি শান্তি লাগবে। অশান্তি-বুদ্ধির কেউ তোমার আশে পাশে থাকলে তোমার অশান্তি লাগবে।
আমার কোন ধরনের বুদ্ধি?
ঐ যে বললাম, ধারাল বুদ্ধি।
শান্তি-বুদ্ধি, না অশান্তি-বুদ্ধি?
অশান্তি-বুদ্ধি!
আমি হেসে ফেললাম। সুবীরদাও হাসছেন। কী আশ্চর্য ব্যাপার আমি কত সহজ ভাবে হাসছি। গল্প করছি। অথচ আমার মা জ্বরে ছটফট করছেন। এতক্ষণে তাঁর কথা একবার মনেও পড়ে নি। আমি দিলু হয়ে যেতে শুরু করেছি। মেকাপ শেষ হবার পর দিলুর পোশাকটা পরব। দিলু হবার দিকে আরকটু এগুব।
সোহরাব চাচা গম্ভীর মুখে আমার দিকে আসছেন। তিনি একই সঙ্গে গম্ভীর, এবং বিরক্ত। অথচ তাঁরই এখন সবচে হাসি খুশি থাকার কথা। লোকজন সব চলে এসেছে। ডিরেক্টর সাহেব সুস্থ। পুরোপুরি শুটিং শুরু হতে যাচ্ছে। জেনারেটারের অভাবে রাতের কাজ আগে কিছু হয় নি। জেনারেটার চলে এসেছে। এখন রাতেও কাজ হবে। শুটিং বন্ধ থাকায় যে ক্ষতি হয়েছে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যাবে।
রুমালী।
জ্বি চাচা।
স্যার তোমাকে ডাকছেন।
জ্বি আচ্ছা।
তোমার মার যে এত জ্বর সেটাতো তুমি আমাকে বল নি। অসুখ বিসুখ হলে আমাকে জানাবে না?
আপনি এত ব্যস্ত। আপনাকে বিরক্ত করতে ইচ্ছা করছিল না।
এটাতো বিরক্ত হবার কিছু না। অসুখ বিসুখ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। যাই হোক, আমি সব ব্যবস্থা করেছি। ডাক্তার চলে আসবেন। জালালের মাকে বলে এসেছি মাথায় পানি ঢালতে।
থ্যাংক য়্যু চাচা।
স্যার কী বলে শুনে, মার কাছে গিয়ে বোস। সব রেডি হলে আমি তোমাকে ডেকে নিয়ে যাব।
সোহরাব চাচা চলে যাচ্ছিলেন। আমি ডাকলাম, চাচা একটা কথা শুনে যান। তিনি থমকে দাঁড়ালেন। আমি বললাম, আজ আপনি আমার সঙ্গে এমন রেগে রেগে কথা বলছেন কেন? প্লীজ রেগে থাকবেন না। আপনি রেগে থাকলে আমার অভিনয় খারাপ হবে।
