আপনি যদি বোকা হন তাহলে পৃথিবীর সবাই বোকা! আইনস্টাইনও বোকা।
আইনস্টাইনের স্ত্রীর নাম কী বলতো?
জানি না।
কী আশ্চর্য এমন বিখ্যাত একজন মানুষ, তুমি তার স্ত্রীর নাম জান না?
জ্বি না।
এই জন্যে তোমার কি লজ্জিত বোধ করা উচিত না?
জ্বি উচিত। উনার স্ত্রীর নাম কী?
আমি নিজেও জানি না।
আপনি জানেন না?
না।
সত্যি জানেন না?
না সত্যি জানি না।
কংকা নামের মেয়েটা তখন অভিভূত হয়ে তাকিয়ে থাকবে। তার কাছে এই মানুষটাকে তখন খুব কাছের মানুষ বলে মনে হতে থাকবে। আইনস্টাইনের স্ত্রীর নাম তিনি জানেন না বলে নিজেকে চট করে মেয়েটির স্তরে নামিয়ে আনলেন। এই কাজটা তিনি করলেন খুব সূক্ষ্ম ভাবে। শুধু তাই না, আরো কিছু খেলা তিনি খেলবেন—নিজেকে মাঝে মধ্যে মেয়েটির চেয়েও নিচের স্তরে নিয়ে যাবেন। মেয়েটিকে আনন্দিত হবার সুযোগ দেবেন। মেয়েটির যখন দিশেহারা অবস্থা হবে তখন আবার নিজেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে ফেলবেন।
বকু!
আমি চমকে উঠলাম। আশ্চর্য মা ঘুমান নি! জেগে আছেন।
ঘুমাও নি মা?
ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল।
আবার ঘুমিয়ে পড়।
খুব বাজে একটা স্বপ্ন দেখেছি বকু।
বাজে স্বপ্নটা কী?
স্বপ্নে দেখলাম তোর বাবাকে সাপে কেটেছে। বিষে তার শরীর নীল হয়ে গেছে।
দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হবার কিছুই নেই মা। বাবাকে সাপে কাটে নি। সাপ খোপ নিয়ে অনেক কাণ্ড হয়েছে বলেই এমন স্বপ্ন দেখেছ।
এরকম একটা বাজে স্বপ্ন কেন দেখলাম।
আমাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করছ বলে এ রকম স্বপ্ন দেখেছ। আমাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করার কিছু নেই।
মা সত্যি বলছিস?
হ্যাঁ সত্যি।
স্কুল ঘরে কিচ্ছু হয় নি তাই না?
শুধু উনার ডান পা মাড়িয়ে দিয়েছিলাম। অন্ধকারে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম — তাই। পা মাড়িয়ে দেয়া নিশ্চয়ই ভয়ঙ্কর কিছু না। আমি সঙ্গে সঙ্গে সরি বলেছি।
বকু!
কী মা?
আমার খুব অস্থির লাগছে।
অস্থির লাগছে কেন?
আমার মনে হচ্ছে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে যাচ্ছে।
ভয়ঙ্কর কিছুই ঘটতে যাচ্ছে না। সকাল হোক—দেখবে তোমার কাছে সব স্বাভাবিক লাগতে শুরু করবে। রাতের বেলা সবকিছুই একটু অস্বাভাবিক লাগে।
তোর বাবাকে খবর দিয়ে নিয়ে এলে কেমন হয়?
বাবাকে খবর দিয়ে নিয়ে আসবে?
হুঁ। তোর শুটিং শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেও থাকল। সোহরাব ভাইকে বললে উনি তোর বাবাকে খবর দেয়ার ব্যবস্থা করবেন।
তোমার ধারণা খবর পেলেই উনি ছুটে আসবেন?
তোর কোন সমস্যা হয়েছে শুনলে সে থাকতে পারবে না। ছুটে চলে আসবে।
আমারতো কোন সমস্যা হয় নি মা।
মা উঠে বসে শান্ত গলায় বললেন, হয়েছে। আমার মন বলছে তুই যে ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা বলছিস, সেই ঘটনা ঘটেছে।
আমি খিলখিল করে হেসে উঠলাম। হাসির শব্দে মার অস্থিরতা একটু যেন কমল। তিনিও হাসলেন। আমি বললাম, দেখছ মা, আমি কত ভাল অভিনয় জানি। একটা ঘটনা তোমাকে কেমন বিশ্বাস করিয়ে ফেলেছি। অভিনয় ভাল। জানি না মা?
মা বললেন, হ্যাঁ।
আমি বললাম, মা আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। এতক্ষণ আমি তোমার সেবা করেছি, এখন তুমি আমার সেবা করবে। আমি ঘুমুব তুমি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে।
আচ্ছা ঘুমো।
আমি শুয়ে পড়লাম এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লাম। একটা স্বপ্ন দেখলাম ঘুমের মধ্যে। আমি একটা ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে আছি। ডিরেক্টর সাহেব আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তাঁর মুখের দিকে তাকাচ্ছি না। আমি তাকিয়ে আছি অন্যদিকে। সেখানে গোলগাল মুখের কোকড়ানো চুলের একটা বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার কোলে একটা ফুটবল ফুটবলটা সে ডলের মত বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে আছে। তিনি বললে, রুমালী তোমার মেয়ের কাণ্ড দেখেছ? ফুটবল কিনে দিয়েছি—একবারও সে ফুটবলটা মাটিতে নামিয়ে কিক দেয় নি। পুতুলের মত কোলে কোলে নিয়ে ঘুরছে। সে মেয়ে বলেই এই কাণ্ডটা করছে। ছেলে হলে এতক্ষণে সে ফুটবল খেলা শুরু করত।
তাই বুঝি?
হ্যাঁ তাই। মেয়েদের মধ্যে মাতৃভাব প্রবল বলেই সব খেলনাই তাদের কাছে সন্তানের মত। যে কোন খেলনা মেয়েদের হাতে দাও দেখবে খেলনা কোলে নিয়ে তারা ঘুরবে। আমি ভেবেছিলাম তোমার মেয়েটা অন্যদের চেয়ে আলাদা হবে। এটা দেখার জন্যেই তাকে ফুটবল কিনে দিয়েছিলাম।
তোমার মেয়ে তোমার মেয়ে করছ কেন? এই মেয়েটাতো শুধু আমার একার না। তোমারও।
তিনি তৎক্ষণাৎ বললেন-না তো ও আমার হবে কেন? এই মেয়ের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?
তখনই আমার ঘুম ভাঙ্গল। বাইরে সকাল হচ্ছে। পাখি ডাকছে।
মা হাত পা এলিয়ে আমার পাশেই শুয়ে ঘুমুচ্ছেন। আমি মার মাথায় হাত রাখলাম। জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে। আজ শুটিং শুরু হচ্ছে। হাত মুখ ধুয়েই আমাকে মেকাপে বসতে হবে। মাকে ফেলে রেখে শুটিং এ চলে যাব। মা একা একা বিছানায় ছটফট করবেন।
মেকাপ নিচ্ছি
আমি মেকাপ নিচ্ছি। সুবীরদা যন্ত্রের মত হাত চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর মধ্যে চাপা টেনশান। আগের মেকাপের সঙ্গে আজকের মেকাপের মিল থাকতে হবে। মেকাপ কনটিনিউটি অনেক বড় ব্যাপার। মওলানা সাহেব আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আগ্রহ নিয়ে তিনি দৃশ্যটা দেখছেন। মেকাপ নেবার সময় অন্য কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে খুব অস্বস্থি লাগে। এখন অবশ্যি লাগছে না। মওলানা সাহেবের বিস্ময় দেখতে ভাল লাগছে। যে কোন মানুষের বিস্ময় ও আনন্দ দেখতে ভাল লাগে। আমি মওলানা সাহেবের সঙ্গে টুকটাক গল্পও করছি।
মা জ্বরে প্রায় অচেতন হয়ে আছেন। তাঁর কথা এখন আর সেভাবে মনে পড়ছে না। মেকাপ ম্যান সুবীরদা ক্রমেই আমাকে দিলু বানিয়ে দিচ্ছেন। আমি যতই দিলু হচ্ছি ততই চারপাশের জগৎ থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছি। পুরোপুরি যখন দিলু হয়ে যাব তখন আর রুমালীর জগৎ নিয়ে ভাবব না। আমার জগৎটা চলবে দিলুর মত। দিলু খুব হাসি খুশি। সে সবার সঙ্গেই কথা বলে। অকারণে কথা বলে।
