আমার মনে হয় তুমি পাগল হয়ে যেতে।
বকু?
হুঁ।
সিনেমা করার দরকার নেই বকুল, চল কাল ভোরে ঢাকায় চলে যাই।
চল যাই।
সত্যি যাবি?
তুমি বললে অবশ্যই যাব।
কিন্তু এরা খুব বিপদে পড়বে।
তাতো পড়বেই। আমার মত একটা মেয়ে জোগাড় করা। তাকে দিয়ে পুরো জিনিসটা রিশুট করা।
এটা ঠিক হবে না বকুল।
তাহলে থাক।
বকু!
হুঁ।
এবার ঢাকায় গিয়ে তোর বাবাকে বলব, ভাল একটা ছেলে দেখে তোর বিয়ে দিয়ে দিতে।
বাবাকে বলতে হবে কেন?
মেয়ের বিয়েতে বাবারাই দেয়।
আমার বিয়ে তুমি দেবে মা–আর কেউ না।
তোর বিয়ের জন্যে আমি টাকা আলাদা করে রেখেছি।
কত টাকা?
চল্লিশ হাজারের মত।
ঢাকায় ফিরলে সেখান থেকে আমাকে দশ হাজার টাকা দিওতো মা।
কী করবি?
কাজ আছে। আমি একটা সিডিপ্লেয়ার কিনব। আমার খুব শখ।
তোর বাবাকে বললেই কিনে দেবে। তোর বিয়ের টাকায় আমি হাত দেব। অসম্ভব।
বাবাকে আমি কিছু বলতে পারব না।
তোর বলতে হবে না। আমি বলব।
ঠিক আছে মা। তুমি বোল। এখন একটু ঘুমাও অনেকক্ষণ গল্প করা হয়েছে।
বকু?
কী মা?
তুই কি উনাকে খুব পছন্দ করিস?
কাকে?
ডিরেক্টর সাহেবকে?
না।
না কেন?
উনার মধ্যে প্রচুর ভান আছে মা। আমার ভান পছন্দ না। মানুষ হবে সহজ সরল। যা ভাববে তাই বলবে, তাই করবে। উনি কখনো তা করেন না। উনি যা ভাবেন কখনো তা বলেন না।
সেলিমকে কি তোর পছন্দ?
এই প্রশ্নের উত্তর দেব না। উত্তর দিলেই তুমি রেগে যাবে।
না রাগব না। বল সেলিমকে তোর পছন্দ কি-না।
পছন্দ।
গাধা টাইপ ছেলেতো। কথা নেই বার্তা নেই সাপ খেয়ে ফেলল।
সাপ খেয়েছে বলেই পছন্দ। কেঁচো খেলে আরো পছন্দ হত।
ফালতু কথা বলবি না। আমি তোর বিয়ে দেব একজন ডাক্তার ছেলের সঙ্গে।
ঠিক আছে দিও।
ফ্যামিলীতে একজন ডাক্তার থাকা ভাল। অসুখ বিসুখে তখন অস্থির হতে হবে না।
মা ঘুমানোর চেষ্টা কর। বিয়ের পর আমি কিন্তু তোদের সঙ্গে থাকব।
অসম্ভব। তুমি হলে শাশুড়ি তুমি জামাইয়ের সঙ্গে থাকবে এটা কেমন কথা! তুমি আমাদের ভালবাসা-বাসি দেখবে, ঝগড়া ঝাটি দেখবে তা হবে না।
আমি তাহলে যাব কোথায়?
সেটাও অবশ্যি একটা কথা। তোমারতো আবার যাবার জায়গা নেই।
বকু!
কী মা?
আমার যেন কেমন লাগছে?
কী রকম লাগছে?
বুঝতে পারছি না। আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না রে বকু।
তুমি কথা বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে থাক। একটা কথাও বলবে না। আমি তোমার মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছি।
মনে হয় জ্বর আসছে।
আসলে আসুক। তুমি ঘুমাও।
মা চুপ করলেন। আমি তার মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছি। মা ঘুমুচ্ছেন। তবে ঘুমের মধ্যেও তাঁর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। একজন মা তার সন্তানের জন্যে এত ভালবাসা ধরে রাখেন? আশ্চর্য! আমার কোলে যদি কখনো কোন বাবু আসে আমিও কি তাকে এত ভালবাসব? এত ভালবাসা কি ঠিক? না ঠিক না। সব ভালবাসাই পরিমিতির মধ্যে থাকা দরকার। এই যে আমি মার মাথার পাশে বসে আছি, তার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছি। মা ঘুমের মধ্যেই কাঁদছেন। তারপরেও যদি এই মুহূর্তে উনি এসে বলেন— রুমালী! চল ঘুরে আসি। আমি সঙ্গে সঙ্গে মাকে ফেলে উঠে আসব। মার দিকে দ্বিতীয়বার ফিরে তাকাব না। মানুষ কেন এমন বদলে যায়? কাউকে পেলে জিজ্ঞেস করতাম। এই বিশেষ ঘটনাটা কি সব মানুষের ক্ষেত্রেই ঘটে না শুধু আমার ক্ষেত্রে ঘটছে? আমি কি আর দশজনের চেয়ে আলাদা, না-কি আমি আর দশজনের মত? এটা কাকে জিজ্ঞেস করব? কে আমার প্রশ্নের উত্তর দেবে?
ছেলেরা কি মেয়েদের মত ভালবাসতে পারে? রাধা শ্রীকৃষ্ণকে যেমন ভালবেসেছিলেন–কৃষ্ণ কি কখনো রাধাকে সেই ভাবে ভালবেসেছেন? ভালবেসে থাকলে তিনি রাধাকে ফেলে চলে যেতে পারতেন না। আর রাধা বাকি জীবন ‘কৃষ্ণ কোথা? কৃষ্ণ কোথা?’ বলে দেশ দেশান্তরে পাখি হয়ে উড়ে বেড়াতে পারত না। অবশ্যি এইসব গল্পগাথা। গল্পে অনেক কিছু হয় বাস্তবে হয় না। আবার বাস্তবেও অনেক কিছু ঘটে যা গল্পে লেখা হয় না। এই যে মোসাদ্দেক স্যার সিলিং ফ্যানের সঙ্গে শাড়ি পেঁচিয়ে মরে গেলেন। যে আভার জন্যে এই কাণ্ডটা করলেন সেই ঘটনায় আর কিছুই হয় নি। তার জীবন সুন্দর মতই এগুচ্ছে। আভার মতো কোন কাণ্ড যদি আমি করে ফেলি তাতেও কারো কিছু হবে না। আমাদের ডিরেক্টর সাহেব আবারো ছবি করতে আসবেন। যখের ছবি, পক্ষাঘাতগ্রস্থ রোগীর ছবি। আমার মত আরেকটি মেয়ে চোখ বড় বড় করে তার গল্প শুনবে। তিনি মিটি মিটি হাসতে হাসতে বলবেন, তারপর খুকী তোমার নাম যেন কী? মেয়েটি লজ্জিত ভঙ্গিতে বলবে, আমার নাম কংকা।
ও আচ্ছা কংকা। খুব সুন্দর নাম। তবে নামটা কিন্তু পেত্নীর।
পেত্নীর নাম?
হা পেত্নীর নাম। ত্রৈলক্যনাথের একটা বই আছে—বইটা কংকাবতীকে নিয়ে লেখা। সেই কংকাবতী হল একটা পেত্নী।
ও আচ্ছা (মেয়েটি অভিভূত হতে শুরু করেছে)।
কংকা, তোমার বুদ্ধি কেমন?
আমার বুদ্ধি খুব কম।
আচ্ছা তোমার আই কিউ টেস্ট করা যাক—তিনটা পিঁপড়া নিয়ে একটা ধাঁধা বলছি দেখি পার কি না।
আমি পারব না। আমার মোটেই বুদ্ধি নেই।
আমার ধারণা তোমার অনেক বুদ্ধি।
এ রকম ধারণা কেন হল?
যাদের বুদ্ধি বেশি তারা তাকানোর সময় খুব সামান্য হলেও ভুরু কুঁচকে তাকায়। কপালে সূক্ষ্ম দাগ পড়ে।
আশ্চর্য জানতাম নাতো। ভুরু কুঁচকে তাকায় কেন?
বুদ্ধিমানরা যে কোন দৃশ্য খুব ভাল ভাবে দেখতে চায়। তা করতে গিয়ে তার ভুরু কুচকে যায়। যারা সহজ সরল মানুষ—কিংবা বোকা মানুষ তারা সরল ভাবে তাকায়। তাদের ভুরু কখনো কুঁচকায় না, বা কপালেও কখনো দাগ পড়ে না। যেমন আমাকে দেখ। আমার কপালে দাগ পড়ে না। আমি তাকানোর সময় ভুরু কুঁচকাই না।
