মা আবারো উঠে বসলেন। আবারো আগের মত জিজ্ঞেস করলেন, বকু ঘুমুচ্ছিস? এবারে আমি বললাম, হ্যাঁ ঘুমুচ্ছি। মা শুয়ে পড়লেন। তার মানে আমি কী বলছি না বলছি তাও তাঁর মাথায় ঢুকছে না। মার জন্যে আমার কষ্ট হচ্ছে— তাঁর নিজের জগৎ ভেঙ্গে ছারখার হয়ে গেছে। তিনি এখন ঘোরের মধ্যে চলে গেছেন। এই ঘোর সহজে কাটার না।
বকু?
হুঁ!
কাল থেকে শুটিং পুরোপুরি শুরু হবে?
হুঁ। রাতের কাজের জন্যে জেনারেটার এনেছে। রাতের কাজ হবে।
হুঁ।
পাপিয়ার মেয়েটাকে দেখেছিস— সামনের দুটা দাঁত বড় বড়। মিকি মাউসের মত লাগে।
দেখেছি।
নীরাকে তোর কেমন লাগল?
ভাল।
শুরুতে তাকে যত অহংকারী মনে হয়েছিল—তত অহংকারী কিন্তু সে না।
হুঁ।
তবে কাউকে কিছু না বলে হুট করে চলে গেল। তোকে কিছু বলেছে?
না।
উনার মেয়েটা দেখতে কেমন ফকিরনীর মেয়ের মত না!
হুঁ , ফকিরনীর মেয়ের মত।
হয়ত কোন ফকিরনীর কাছ থেকেই নিয়েছে। এটা তাঁর নিজের মেয়ে না। পালক মেয়ে। জালালের মা বলল।
ও আচ্ছা।
মানুষ কেন যে পালক নেয়। পালা পাখির জ্বালা বেশি। তারপরেও পুষ্যি নেয়। উচিত না।
আমি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললাম। মা তুচ্ছ সব কথা বলে যাচ্ছেন। লক্ষণ ভাল না। একবার এ রকম শুরু হলে চলতেই থাকবে। মা সারারাত নিজের মনে কথা বলতে থাকেন। আমাকে হুঁ দিয়ে যেতে হবে। বাবা আমাদের ছেড়ে যাবার পরও এরকম হল। মার কথা বলা রোগ হল। সারা রাত কথা বলতেন। অর্থহীন সব কথা। আমি ঘুমিয়ে পড়লে আমাকে ঘুম থেকে জাগাতেন। আবার শুরু হত কন্যা।
বকু!
কী মা?
গরম লাগছে। গরমে শরীর জ্বলে যাচ্ছে।
বাথরুমে যাও, হাত মুখ ধুয়ে আস।
মা বাধ্য বালিকার মত উঠলেন। বাথরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুলেন। বাথরুম থেকে বের হয়ে গেলেন বারান্দায়। তিনি বারান্দায় হাঁটাহাটি করছেন। স্যান্ডেল পায়ে হাঁটছেন–স্যান্ডেলের শব্দ হচ্ছে। মা এত শব্দ করে হাঁটেন না। আজ কি ইচ্ছা করে শব্দ করছেন? অনিদ্রা রোগ হলে মানুষ শব্দ না করে থাকতে পারে না। মা আবারো বাথরুমে ঢুকলেন। মনে হয় এখন গোসল করছেন। মাথায় মগে করে পানি ঢালা হচ্ছে। ঢালা হচ্ছেতো, ঢালাই হচ্ছে। বাথরুমে পানি থাকে না বলে ড্রাম ভর্তি পানি রাখা হয়। তিনি কি পুরো ড্রাম শেষ করবেন? তার গোসল শেষ হল। তিনি ঘরে ঢুকে কাপড় বদলালেন। চুল আঁচড়ালেন। তারপর টেবিল থেকে আমার হাত ঘড়িটা নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রইলেন। হাত থেকে ঘড়ি নামিয়ে রাখার পর আমি বললাম, কটা বাজে মা? মা আবারো ঘড়ি দেখে বললেন— আড়াইটা। তার মানে আগের বার হাতে ঘড়ি নিয়ে তাকিয়েছেন, সময় দেখেন নি। মার জন্যে আমার কষ্ট হচ্ছে। ইচ্ছা করছে কোন একটা মন্ত্র পড়ে তার অস্থিরতা দূর করে দি। সে রকম মন্ত্র আমার অবশ্যি জানা আছে। মন্ত্র পড়ে মাকে সামলে ফেলতে পারব। আমি উঠে বসলাম। শান্ত গলায় বললাম, মা শোন তুমি এত অস্থির হচ্ছ কেন?
মা নিচু গলায় বললেন, অস্থির হবার মত কিছু হয় নি?
আমি বললাম, না।
তিনি হতাশ মুখে তাকিয়ে আছেন। যেন নিতান্ত বাচ্চা একটা মেয়ে যে আমার কাছ থেকে আশা ও আনন্দের কোন কথা শুনতে চায়। কারোর চিন্তা শক্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেলে এই অবস্থা হয়। মা আমার সামনে চেয়ারে বসলেন। আমি সহজ গলায় বললাম–মা শোন। আমার যে সমস্যা নিয়ে ভেবে ভেবে তুমি অস্থির হয়েছ সে সমস্যা আমিই দূর করব। তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না।
তোর সমস্যা তুই কীভাবে দূর করবি?
সব আমি ভেবে ঠিক ঠাক করে রেখেছি।
সেটা কী?
যেদিন শুটিং শেষ হবে সেদিন আমি সোমেশ্বরী নদীর পারে বেড়াতে যাব। তারপর ঝাপ দিয়ে নদীতে পড়ে যাব। যেহেতু সাঁতার জানি না, মবিলের মত টুক করে চলে যাব নদীর তলায়। সব সমস্যার সমাধান।
কথাগুলি আমি বললাম হেসে হেসে, কাজেই মা আরো এলোমেলো হয়ে গেলেন। তিনি তাকিয়ে আছেন—এখন আর তাঁর চোখে পলক পড়ছে না।
মা।
হু।
তুমি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসতো।
হাসব কেন?
হাসবে কারণ আমি তোমার সঙ্গে অভিনয় করেছি। তোমাকে ভয় দেখানোর জন্যে ভয়ঙ্কর কিছু কথা বলেছি। এই জাতীয় কিছুই হয় নি।
কিছুই হয় নি?
না।
তুই ঝড়ের সময় উনাকে নিয়ে স্কুল ঘরে যাস নি? মওলানা সাহেবতো বললেন, গিয়েছিলি।
গিয়েছি। তাতে কী হয়েছে? প্রচণ্ড ঝড়ের সময় আমরা কি বাইরে থাকব? বাইরে থাকলে মরে যেতাম।
তাতো ঠিকই।
আমরা দৌড়ে স্কুল ঘরে ঢুকলাম আর তখনই মওলানা সাহেব ঢুকলেন।
হ্যাঁ তাইতো!
নিজের মেয়ের সম্পর্কে তোমার যে কী ধারণা মা। ছিঃ। নিজের মেয়ের উপর তোমার বিশ্বাস নেই?
মা এখনো অপলকে তাকিয়ে আছেন। তবে এখন তাঁর চোখে পানি জমতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে তিনি কাঁদতে শুরু করবেন।
আমার সম্পর্কে তোমার কী ধারণা সেটা টেস্ট করার জন্যেই গল্পটা তোমাকে বানিয়ে বলেছি। আশ্চর্য তুমি পুরোপুরি বিশ্বাস করে ফেলেছ। কর নি?
হুঁ করেছিলাম।
আমি মাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, তোমার মনটা কি খুব বেশি খারাপ হয়েছিল মা?
হুঁ।
এখন মন ঠিক হয়েছে?
মা ধরা গলায় বললেন–হ্যাঁ! মন ঠিক হয়েছে।
এসো শুয়ে পড়ি।
না শোব না— আয় গল্প করি।
এসো শুয়ে শুয়ে গল্প করি। এসো।
আমি মাকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। মা কেঁদেই যাচ্ছেন। তবে তিনি যে কাঁদছেন তা তিনি বুঝতে পারছেন না। বুঝতে পারলে আঁচলে চোখের পানি মুছতেন। তা মুছছেন না। আমি মাকে জড়িয়ে ধরে খুশি খুশি গলায় বললাম,
জানি না।
