উনি গল্প করছেন আমার দিকে তাকিয়ে। আমাকেই গল্পটা শুনাচ্ছেন। নীরা ম্যাডামের দিকে তাকাচ্ছেনও না। এই ব্যাপারটাও বিস্ময়কর।
রুমালী সিনেমার এই আইডিয়াটা আমি অসুস্থ হবার পর পেয়েছি। বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে মনে হল–এমন একটা গল্প দাঁড় করালে কেমন হয়। পক্ষাঘাত গ্রস্থ একজন মানুষ সে শুধু যে নড়াচড়া করতে পারে না তাই না, কথাও বলতে পারে না। শুধু তার চোখ দুটা বেঁচে আছে–আর সবই মারা গেছে। সে কামুনিকেট করে চোখের ইশারায়। একবার চোখের পাতা ফেলা মানে হা দুবার চোখের পাতা ফেলা মানে না। তার স্ত্রী আছে, একটা কাজের লোক আছে, তিন জনের সংসার। এক সকালের গল্প। স্ত্রী এসে জিজ্ঞেস করল, আজ কেমন আছ? ভাল? সে একবার চোখের পাতা ফেলল–তার মানে হ্যাঁ।
পানি খাবে?
দুবার চোখের পাতা ফেলল— না। তারপর চোখের ইশারায় টেবিলের দিকে দেখাল। টেবিলে সিগারেটের প্যাকেট।
সিগারেট খাবে? একবার চোখের পাতা–অর্থাৎ হ্যাঁ।
স্ত্রী সিগারেট ঠোঁটে দিয়ে দেয়াশলাই দিয়ে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। কারণ বসার ঘরে এই তরুণীর অনেক দিন আগের পরিচিত একজন মানুষ এসেছেন। কিশোরী বয়সে তার সঙ্গে ভালোবাসাবাসি ছিল। যে কোন কারণেই হোক বিয়ে হয় নি। ভদ্রলোক এসেছেন মেয়েটির অসুস্থ স্বামীকে দেখতে। পুরানো দিনের কিছু কথা আপনাতে উঠে আসছে। দুজনেরই পুরানো কথা বলতে ভাল লাগছে। মেয়েটি ভুলেই গেছে যে সে তার স্বামীর ঠোঁটে সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে এসেছে, সিগারেটটা সরিয়ে দেয়া দরকার।
সিগারেটের শেষ অংশ নিতে কেউ আসছে না। ঠোঁট থেকে গড়িয়ে সেই সিগারেট পড়ল— বিছানার চাদরে। সেই চাদরে আগুন ধরল— আগুন তার দিকে এগিয়ে আসছে। আতংক গ্রস্থ হয়ে ভদ্রলোক আগুন দেখছেন— তিনি কিছু করতে পারছেন না। কাউকে ডাকতে পারছেন না। তাকিয়ে আছেন তার নিয়তির দিকে। পাশের ঘর থেকে হালকা হাসির শব্দ ভেসে আসছে। এই হল গল্প। রুমালী তোমার কেমন লাগছে?
গল্পের শেষটা কী?
এটার কোন শেষ নেই। সব গল্পেরই যে শেষ থাকতে হবে এমন কোন কথা নেই। গল্পটা তোমার কাছে কেমন লাগল?
খুব সুন্দর।
এই গল্পটা বেশি ভাল, না যখের গল্প?
দুটা গল্পই সমান সুন্দর।
এই ছবির কাজ শেষ হলেই চিত্রনাট্য তৈরি করে ফেলব। নীরা তোমার কাছে দুটা গল্পের মধ্যে কোনটা বেশি ভাল লাগল।
নীরা বললেন— দুটাতো আসলে একই গল্প। অমোঘ নিয়তির গল্প। নিয়তির গল্প তোমার চেয়ে ভাল কে বলবে? তোমার চেয়ে ভাল কেউ বলতে পারবে না। বলতে পারা উচিতও নয়।
উনি চুপ করে গেলেন। আমার চা খাওয়া হয়ে গেছে। আমি নীরার দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি উঠি?
নীরা বললেন, আচ্ছা যাও। আমি ঢাকায় চলে যাব তোমাদের ছবির শেষ পর্যায়ে আবার দেখা হবে।
জ্বি আচ্ছা।
তুমি কি সর্পভুককে দেখতে গিয়েছিলে?
জ্বি না।
আমি আজ একবার দেখতে যাব। তুমি ইচ্ছে করলে আমার সঙ্গে যেতে পার।
আমার ইচ্ছা করছে না।
ইচ্ছা করছে না কেন?
উনাকে দেখলেই সাপ খাবার দৃশ্যটা মনে পড়বে তখন আমার নিজেরই বমি আসবে। পরে দেখা যাবে আমাকেও হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে।
তাহলে না যাওয়াই ভাল।
এই পর্যন্ত লিখে ডাইরি বন্ধ করলাম। এন্টেনা এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সে বোধ হয় অপেক্ষা করছে আমার দ্বিতীয়বার ভেংচি কাটার দৃশ্য দেখার জন্যে। ভেংচি কাটতে ইচ্ছে করছে না, ঘুম পাচ্ছে।
মা ফিরলেন বিকেলে। আমি ঘুমুচ্ছিলাম। আমাকে ডেকে তুললেন। তার মুখ থমথম করছে। তিনি সহজ ভাবে কথাও বলতে পারছেন না। আমি ঘুম জড়ান গলায় বললাম, কী হয়েছে? মা কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, তোর নামে এইসব কী শুনছি?
কী শুনছ?
ঝড়ের সময় তুই আর মঈন ভাই না-কি একটা ঘরে একা ছিলি?
একা কোথায়? আমি আর উনি— আমরা দুজন।
তোরা কী করছিলি?
আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, আমরা কি করছিলাম বলে তোমার ধারণা?
আমার ধারণা খুবই ভয়ঙ্কর।
তোমার ধারণা ঠিকই আছে মা। এর বেশি আর কিছু জানতে চেয়ো না। কষ্ট পাবে।
তার মানে কী? তুই কী বলতে চাচ্ছিস?
আমি জবাব দিলাম না। মার সঙ্গে আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। মা ধরা গলায় বললেন, জালালের মা যা বলেছে তাহলে সেটা ঠিক। আমি এই কথায়ও জবাব দিলাম না। মা ছুটে বাথরুমে ঢুকে গেলেন। তিনি বাথরুমের দরজা বন্ধ করে কাঁদছেন। ছোট বাচ্চাদের মত হাউ মাউ করে কান্না। তার সেই কান্না আমাকে স্পর্শ করছে না।
আমি এবং মা পাশাপাশি শুয়ে আছি। রাত কত জানি না। ইচ্ছা করলে জানা যায়। টেবিলে আমার হাত ঘড়ি পড়ে আছে। হাত বাড়ালেই ঘড়ি। হাত বাড়াতে ইচ্ছা করছে না। বাথরুমের দরজা খোলা। সেখানে বাতি জ্বলছে। খানিকটা আলো তেড়ছা ভাবে আমার পায়ে পড়েছে। সন্ধ্যাবেলায় আলোর তেজ থাকে না, রাত যত বাড়তে থাকে আলোর তেজও বাড়তে থাকে। আলোর তেজ দেখে মনে হচ্ছে অনেক রাত। অঘুমো অবস্থায় চুপচাপ শুয়ে থাকা যায় না। কিছু। না কিছু করতে ইচ্ছে করে—পাশ ফেরা, মাথার নীচের বালিশটা উল্টে দেয়া, একবার গুটিসুটি মেরে শোয়া, একবার লম্বা হয়ে যাওয়া। আমি তার কিছুই করছি না, পাথরের মূর্তির মত পড়ে আছি। মা খুব নড়া-চাড়া করছেন। মাঝে মাঝে খুব অস্পষ্টভাবে বিড়বিড় করছেন। বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছেন। মা একসময় বিছানায় উঠে বসে বললেন, চাপা গলায় বললেন, বকু ঘুমাচ্ছিস? আমি বললাম, না। মা আবারো শুয়ে পড়লেন। আমি ভেবেছিলাম তিনি কিছু বলবেন। কিছু বললেন না। হয়ত বুঝতে পারছেন না, কী বলবেন। তাঁর মাথা এলোমেলো হয়ে আছে। কোন বড় সমস্যায় মানুষের মাথা যখন এলোমেলো হয়ে যায় তখন সে আর সমস্যা নিয়ে ভাবতে পারে না। সমস্যার বাইরের তুচ্ছ বিষয় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতে থাকে। তার খুব কথা বলতে ইচ্ছে করে কিন্তু সে কথা খুঁজে পায় না।
