ভাল।
তোমার কাছে কি গল্পটা সিনেমেটিক মনে হয় নি?
জ্বি না।
নীরা হাসতে হাসতে বললেন, সিনেমেটিকতো বটেই। একদিকে সহায় সম্বলহীন যুবক। অন্যদিকে বড়লোকের আদরের দুলালী। হিন্দী সিনেমার সঙ্গে খুব মিল। তবে একটা অমিল ছিল— হিন্দী সিনেমায় এইসব ক্ষেত্রে মেয়ের বাবা মা বেঁকে বসেন। বাবা রেগে আগুন হয়ে নিজ খান্দান নিয়ে অনেক কথা বলেন। মেয়ে চোখের জল ফেলতে ফেলতে করুণ গান শুরু করে। আমার বেলায় সে সব কিছু হয় নি। বাবা কয়েকদিন খুব গম্ভীর হয়ে রইলেন। মঈনের বাড়ি ঘরের খোঁজ নিলেন, তারপর যথাসময়ে বিয়ে হয়ে গেল। নো ক্লাইমেক্স, নো এন্টি ক্লাইমেক্স। মঈন তার মেস ছেড়ে আমাদের বাড়িতে থাকতে এল। এবং প্রবল উৎসাহে ছবি বানাতে শুরু করল। যখের ছবি না, অন্য ছবি।
ছবি বানাবার টাকা কে দিলেন— আপনার বাবা?
না আমি দিলাম। তার সমস্ত ছবির আমিই প্রযোজক। এখন যে ছবি বানাচ্ছে তার টাকাও আমার দেয়া টাকা দেয়া বন্ধ করলেই ছবি বন্ধ।
নীরা খুব হাসছেন। কেন হাসছেন? একজন মানুষকে টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছেন সেই আনন্দে হাসছেন? নীরা হাসি থামিয়ে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললেন।
আমি কি খুব বেশি হাসছি?
জ্বি না!
আমারতো মনে হয় বেশি হাসছি। মেয়েরা বেশি হাসলে খুব অস্বাভাবিক লাগে। কাঁদলে স্বাভাবিক লাগে। আমার সমস্যা হচ্ছে আমি কাঁদতে পারি না। তুমি কাঁদ কেন?
আমিও কম কাঁদি।
দ্যাটস গুড। কম কাঁদাই ভাল। চল ওঠা যাক।
নীরা উঠে দাঁড়ালেন। আমি বললাম, ক্যাম্পে যাবেন? নীরা বললেন, না। ক্যাম্পে যাব না। তুমি চলে যাও— আমি একা একা খানিকক্ষণ হাঁটব।
জ্বি আচ্ছা।
রুমালী দাঁড়াও তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি। মঈন কী তোমাকে তার শৈশবের গল্প করেছে? কী ভাবে সে এতিমখানায় মানুষ হয়েছে। এইসব?
জ্বি না।
ও— তুমি তাহলে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছ। তার পছন্দের বিশেষ বিশেষ মেয়েদের সে তার ভয়াবহ শৈশবের গল্প করে। সহানুভূতি পাওয়ার জন্যে এটা করে। তোমার সঙ্গেও করবে। এমন ভাবে করবে যে শুনতে শুনতে তোমার চোখে পানি এসে যাবে। বাসর রাতে সে তার ভয়াবহ শৈশবের গল্প আমার সঙ্গে করেছে। আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল।
নীরা আবারো হাসছেন। আমি অবাক হয়ে তার হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।
হঠাৎ হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে বললেন, মঈন তোমাদের সঙ্গে এক ধরনের খেলা খেলছে। অসুস্থ মানুষের অসুস্থ খেলা। সে যে অসুস্থ তা কি তুমি টের পেয়েছ?
জ্বি না।
আমিও বুঝতে পারি নি। যখন বুঝতে পারলাম করুণায় মন ভরে গেল। করুণাও এক ধরনের ভালবাসা। তবে ক্ষতিকারক ভালবাসা। এই ভালবাসা মানুষকে অসুস্থ করে দেয়। আমাকে যেমন করে দিয়েছে। অসুস্থ মানুষের মত তোমার সঙ্গে গল্প করছি। অকারণে হাসছি। এর কোন প্রয়োজন ছিল না। তুমি তার প্রেমে পড়েছ, পড়তেই পার। আমিওতো প্রেমে পড়েছিলাম। জানি না শুনি
একজনকে বিয়ে করার জন্যে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। তুমি যদি হও তাতে দোষ কী? ভাল কথা–তুমি কী তাকে বিয়ে করতে চাও?
আপনি এসব কী বলছেন?
আকাশ থেকে পড়ার অভিনয় করবে না রুমালী। অভিনয় ভাল হচ্ছে না। আমি তোমার চেয়ে অনেক বড় অভিনেত্রী। তুমি মাঝে মধ্যে অভিনয় করছ আমি সারাক্ষণই করছি। এখন এমন হয়েছে যে আমি কখন অভিনয় করছি কখন করছি না, তা নিজেই জানি না। আমার কথা বুঝতে পারছ?
জ্বি না।
মঈনের মধ্যে প্রায় প্রায়ই স্যুইসাইডের টেনডেনসি দেখা যায়। সে একা একা ছাদে উঠে যায়। ছাদ থেকে নীচে লাফিয়ে পড়বে। এই রকম একটা পরিকল্পনা থাকে। আমি তাকে কী বলি জান? আমি বলি–প্লীজ ডু দ্যাট। একটু সাহস করে লাফ দিয়ে পড়। এটা তোমার জন্যে পরম শান্তির ব্যাপার হবে। আমি ধাক্কা দিয়ে তোমাকে ফেলে দিতে পারলে ভাল হত। আমি তা করব না। এই ব্যাপারটা তোমাকেই করতে হবে।
নীরা নিঃশ্বাস নেবার জন্যে থামলেন। আমি বললাম, এখন যাই?
আচ্ছা যাও। ও, জাস্ট এ মিনিট, তোমাদের এখানে নাকি একজন মহিলা পীর আছেন। মানুষের ভবিষ্যৎ বলে দেন। তিনি নাকি বলেছেন চণ্ডিগড়ে কোন ছবি হবে না। একজন মানুষ মারা যাবে। আমি তার সঙ্গে একটু দেখা করব। যে মানুষটা মারা যাবে সে মঈন কি-না জিজ্ঞেস করব। তুমি কি তার বাড়ি চেন?
জি চিনি।
আমাকে তুমি তার বাড়ি দেখিয়ে দিয়ে যাও।
চলুন।
তুমি মহিলা পীরের কাছে গিয়েছিলে?
জি।
তোমাকে কী বলেছিল?
আমাকে কিছু বলেন নি।
সেকী, তুমি তোমার ভবিষ্যৎ জানতে চাও নি?
জ্বি না।
ভবিষ্যৎ জেনে নেবার এমন সুযোগ হাতছাড়া করলে, এটা ঠিক না। নেক্সট টাইম তাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিও ডিরেক্টর মঈন সাহেব তোমাকে বিয়ে করবেন কি করবেন না।
আমি নিঃশব্দে হাঁটছি। নীরা আমার পেছনে পেছনে আসছেন। আমি তার দিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারছি— তার মুখ হাসি হাসি। তিনি খুব মজা পাচ্ছেন।
রুমালী।
জ্বি।
আমার উপর খুব রাগ লাগছে?
জি না।
আমার ধারণা খুব রাগ লাগছে। তুমি শুধু শুধু রাগ করছ। আমি যা বললাম তোমার ভালর জন্যে বলাম। মন্দের জন্যে যে সব কথা বলা হয় সে সব শুনতে খুব ভাল লাগে। ভালর জন্যে বলা কথা শুনতে অসহ্য বোধ হয়।
আমার অসহ্য বোধ হচ্ছে না। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে আপনার কথা শুনছি।
আমি থমকে দাঁড়ালাম। হাত উঁচিয়ে মহিলা পীরের বাড়ি দেখিয়ে দিলাম। নীরা বললেন, থ্যাংক ঝু— এখন তুমি চলে যাও। তোমাদের ডিরেক্টর সাহেবকে বলবে যে আমার ফিরতে সামান্য দেরি হতে পারে। সে যেন অস্থির না হয়। আমি যখন তার আশে পাশে থাকি তখন সে আমার সামান্য অদর্শনে অস্থির হয়ে পড়ে। ডিরেক্টর সাহেবকে আমার খবরটা দিও?
