জ্বি আচ্ছা।
তুমি তাকে আপনি করে বল, না তুমি করে বল?
আপনি করে বলি।
সেকী এখনো তুমির লেভেলে নামতে পার নি। তোমার মত অবস্থা যাদের তাদের সবাইতো তাকে তুমি করে বলে। সেটাইতো শোভন। আপনি আপনি করেতো আর প্রেম করা যায় না। প্রেমের জন্যে একই সমতলে নেমে আসতে হয়। তাই না?
আমি দাঁড়িয়ে আছি, নীরা জাহেদার বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। কত সহজ ভঙ্গিতেই না যাচ্ছেন, যেন কিছুই হয় নি। নিশ্চয়ই তিনি জাহেদার সঙ্গে অনেক মজার মজার গল্প করবেন। আমার ক্যাম্পে ফিরতে ইচ্ছা করছে না। সোমেশ্বরী নদীটাকে কি একবার দেখে আসব? ভয়ংকর স্রোত কি একটু কমেছে, না বেড়েছে? এই নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যাবার কথাতো না। স্রোত নিশ্চয়ই অনেক দূর পর্যন্ত ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। নদীর পানিতে চিৎ হয়ে শুয়ে থেকে আকাশ দেখতে দেখতে সমুদ্রের দিকে যাত্রা। কেন জানি খুব ঘুম পাচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি অনেক দিনের অঘুমো। শান্তিময় ঘুমের তৃষ্ণায় শরীর কাতর হয়ে আছে। ক্যাম্পে গিয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়লেই আমি গাঢ় ঘুমে তলিয়ে যাব। কে জানে সেই ঘুম হয়তো কোনদিনও ভাঙ্গবে না।
ডাকবাংলোর সামনে পাপিয়া ম্যাডামের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তিনি তাহলে চলে এসেছেন। জালালের মাকে দেখতে পাচ্ছি। সেও এসেছে। সোহরাব চাচাকে দেখছি। তিনি বক্তৃতার ভঙ্গিতে কী যেন বলছেন। তাকে ঘিরে কয়েকজন দাড়িয়ে আছে। মন দিয়ে বক্তৃতা শুনছে। তাদের মধ্যে একজন বুড়োমত ভদ্রলোক। তাঁকে আগে দেখি নি। তিনিও বোধহয় আজই এলেন। শুটিং এর দ্বিতীয় পর্যায় তাহলে শুরু হতে যাচ্ছে। শুরু হোক— প্রবল কাজের মধ্যে ডুবে যাওয়াই ভাল। ইউনিটের লোকজন ঝিমিয়ে পড়েছিল। পাপিয়া ম্যাডামকে দেখে ঝিম ভাব কাটবে।
আমি সবার চোখ এড়িয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়লাম। বিছানায় শোয়ামাত্রই ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল। ঘুমিয়ে পড়ছি না অন্য কিছু। খুব শীত লাগছে, গা কাঁপছে। আমার ঘরের পাশেই কারা যেন হাসাহাসি করছে। কারা হাসছে? জালালের মা?
ঘুমের মধ্যেই শুনলাম ঘুঘু ডাকছে। এখন সকাল না, দুপুর? সব এলোমেলো লাগছে। কিছুই বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে সকাল। কেমন নরম আলো। আচ্ছা সকাল বেলা ঘুঘু ডাকছে কেন? ঘুঘু ডাকবে দুপুরে। উল্টা পাল্টা ডাকছে কেন? আমার গানের সার মোসাদ্দেক সাহেব বলতেন— পাখিদের গলায় রাগ রাগিনী আছে। কোন কোন পাখির গলায় আছে ভৈরবী তারা ডাকে সকালে, আবার কারো গলায় দরবারী কানাড়া–এরা ডাকবে দুপুরে যেমন ঘুঘু। যাদের গলায় বেহাগ তারা ডাকবে নিশি রাত্রে যেমন শুশান-কোকিল। মোসাদ্দেক স্যার খুব সুন্দর করে কথা বলতেন। গান শেখাতেনও চমৎকার। আমি প্রথম দিন স্যারকে বললাম, স্যার আমার কি গান হবে? তিনি আমার দিকে একটু ঝুঁকে এসে বললেন, মাগো তোমার গলা দিয়ে কি শব্দ বের হয়?
আমি বললাম, হ্যাঁ।
তিনি মুখ ভর্তি পান নিয়ে বললেন, শব্দ বের হলে গান হবে। গাধা যে প্রাণী সেও গান গায় আর মানুষ গাইবে না সে কেমন কথা?
স্যার, গাধা কি গান গায়?
অবশ্যই গায়। গাধার নিজস্ব রাগিনীও আছে— গর্ধভ রাগিনী। হা হা হা।
মোসাদ্দেক স্যার শিক্ষক হিসেবে চমৎকার ছিলেন, মানুষ হিসেবেও চমত্তার ছিলেন। ছাত্র ছাত্রীদের প্রতি তাঁর মমতার সীমা ছিল না। তিনি প্রায়ই বলতেন, গানের শিক্ষকরা কী করে জানিস? তারা জায়গায় জায়গায় গানের চারাগাছ পুতে। বেশির ভাগ চারাই গরু-ছাগলে খেয়ে ফেলে। কোনটায় অল্প বয়সে পোকা ধরে। আবার কিছু চারাগাছ মহীরুহ হয়ে যায়। ডালপালা ছড়িয়ে দিয়ে হুলুস্থুল কাণ্ড। সে এক দেখার মত দৃশ্য।
এই মোসাদ্দেক স্যার আমার চোখের সামনে তাঁর এক ছাত্রীর প্রেমে পড়ে গেলেন। মেয়েটার নাম আভা। তের চৌদ্দ বছরের বেশি বয়স হবে না। খুবই সাধারণ টাইপ মেয়ে। এই সাধারণের ভেতর স্যার অসাধারণ কী দেখলেন কে জানে। তিনি সবার চোখের সামনে বদলে যেতে শুরু করলেন। নিজের ঘর সংসার ছেলে মেয়ে সব তুচ্ছ হয়ে গেল। কী ভয়ংকর অবস্থা। আভা গান শেখা ছেড়ে দিল। স্যার আভাদের বাসার সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা শুরু করলেন। পাড়ার ছেলেরা তাকে একবার খুব মারল। তাতেও লাভ হল না। তার মধ্যে মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করল। সারাক্ষণ বিড় বিড় করতেন। গান সেখানো বন্ধ করে দিলেন। সংসারে চরম অভাব নেমে এল। স্যারের স্ত্রী, পুরানো ছাত্র ছাত্রীদের বাসায় বাসায় গিয়ে ভিক্ষা করা শুরু করলেন।
তারপর একদিন খবর পেলাম সিলিং ফ্যানের সঙ্গে শাড়ি পেঁচিয়ে স্যার ঝুলে পড়েছেন। মানুষ হয়ে জন্মানোর দুঃখ কষ্ট থেকে চিরমুক্তি। কী আশ্চর্য মোসাদ্দেক স্যারের কথা হঠাৎ মনে আসছে কেন? আমি কিছু মনে করতে চাই না। আমি দীর্ঘ সময় শান্তিতে ঘুমুতে চাই। প্লীজ, প্লীজ, প্লীজ।
মোসাদ্দেক স্যারকে কাল রাতে হঠাৎ স্বপ্নে দেখেছি। না না কাল না, পরশু রাতে। বেশ হাসি খুশি চেহারা। মুখ ভর্তি পান। পানের রস গড়িয়ে পাঞ্জাবিতে পড়েছে। স্যারের কোন খেয়াল নেই। আমি বললাম, কেমন আছেন স্যার? স্যার হাসতে হাসতে বললেন, খুব ভাল আছি। তুই কেমন আছিস?
আমি ভাল আছি।
আমি পানি নিয়ে এসে দেখি স্যার নেই। ঘর ফাকা। আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। জেগে দেখি মাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছি। ঘর ভর্তি সিগারেটের গন্ধ। পানের জর্দার গন্ধ। মোসাদ্দেক স্যার সিগারেট খেতেন, জর্দা দিয়ে পান খেতেন। তিনি চলে গেছেন— সিগারেট এবং জর্দার গন্ধ ফেলে রেখে গেছেন। ভয়ে আমার শরীর কেমন করতে লাগল। আমি গুটিশুটি মেরে মার বুকের কাছে চলে গেলাম–তবু আমার ভয় কাটল না। আমি ফিস ফিস করে ডাকলাম, বাবা। বাবা।
