রুমালী।
জ্বি।
তারপর শোন–মঈনের অর্থনৈতিক অবস্থা তাকে দেখে বোঝার কোন উপায় কিন্তু ছিল না। কাপড় চোপড়ে সে সব সময় খুব ফিটফাট। নিজেকে মানুষের সামনে সুন্দর করে উপস্থিত করার একটা ব্যাপার তার মধ্যে সব সময় ছিল। এখনো আছে। কী আছে না?
জ্বি আছে।
এক দিন সকালের কথা। ছুটির দিন বাবা বাসায় আছেন। খুবই আশ্চর্যজনক ভাবে তাঁর মেজাজ ভাল। বাসায় যখন থাকেন তাঁর মেজাজ ভাল থাকে না। অকারণে হৈ চৈ করেন। সেই দিন তিনি হাসিমুখে আমার সঙ্গে গল্প করছেন। গল্পের বিষয়বস্তু হল জনৈক পীর সাহেবের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা। সেই পীর মানুষকে দেখা মাত্র তার ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান সব হড় হড় করে বলে দিতে পারে। সে বাবার অফিসে এসেছিল। বাবা তার ক্ষমতায় মুগ্ধ ও বিস্মিত। আমার কোথায় বিয়ে হবে, কবে হবে এইসব সে বাবাকে বলেছে। বাবা খুব আগ্রহ করে পীর সাহেবের কথা বলছেন— আমি খুব মুগ্ধ হয়ে শোনার অভিনয় করে যাচ্ছি এমন সময় দারোয়ান এসে বলল–একটা ছেলে দেখা করতে চায়। পাঁচ মিনিট কথা বলবে। নাম মঈন।
এইসব ক্ষেত্রে বাবার জবাব হচ্ছে–না। বাড়িতে তিনি কারো সঙ্গে দেখা করেন না। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হলে–অফিসে দেখা করতে হবে। সেই দেখা হবার ব্যাপারটাও খুব সহজ না। বাবার পি,এ, প্রথম কথা টথা বলে দেখবে ঘটনা কী। সে যদি মনে করে এপয়েন্টমেন্ট দেয়া যায় তাহলে হবে। সেটাও বেশ জটিল পদ্ধতি। ঐযে তোমাকে বললাম, বাবার মেজাজটা হিল ভাল, ভাল মেজাজের কারণে তিনি বলে ফেললেন আসতে বল।
মঈন এসে ঢুকল। ঝকঝকে চেহারার যুবক। হাসি খুশি ভঙ্গি। জড়তা তেমন নেই। অপরিচিত একটা বাড়ির বিশাল ড্রয়িং রুমে সে ঢুকেছে তা নিয়ে তার সামান্যতম সংকোচও নেই। অপরিচিতা রূপবতী তরুণীর সামনে স্বাভাবিক কারণেই ছেলেদের কিছু সংকোচ থাকার কথা— তাও নেই। সে ঘরে ঢুকেই আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছে। সেই হাসির মানে হচ্ছে–কী ভাল আছেন?
বাবা গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন, কী ব্যাপার?
মঈন বলল, স্যার আমি আপনার দশ মিনিট সময় নেব। ঘড়ি দেখে দশ মিনিট। এর বেশি এক সেকেন্ডও না।
বাবা বললেন, তুমি দারোয়ানকে বলেছ পাঁচ মিনিট। এখন দশ মিনিট বলছ কেন?
স্যার–আমি আপনাকে একটা গল্প বলব। গল্পটা বলতে সাত মিনিট লাগবে। গল্পের শেষে তিন মিনিটে আমার বক্তব্য বলব। আমি আপনার কাছে কোন চাকরির জন্যে আসি নি। বা ভিক্ষা করতেও আসি নি। দয়া করে দশটা মিনিট সময় দিন।
বাবা বললেন, বোস। দশ মিনিট অনেক দীর্ঘ সময়। তোমার যা বলার পাঁচ মিনিটে বলে শেষ কর। আমি জরুরি কিছু কাজ করছি।
মঈন তার গল্প শুরু করল। কোন গল্প জান? তার বিখ্যাত যখের গল্প। বাবা ভুরু কুঁচকে গল্প শুনছেন। বাবা পীর ফকির ছাড়া কোন কিছুতেই বিস্মিত হন না। গল্প শুনে বিস্মিত হচ্ছেন না। এমন উদ্ভট গল্প ছেলেটি কেন বলছে তা বের করার চেষ্টা করছেন। আমি অবাক হয়েই গল্প শুনছি। গল্প শেষ হল। বাবা ঘড়ি দেখলেন। তারপর বললেন, তুমি এই গল্প আমাকে কেন বলছ?
মঈন বলল, গল্পটি নিয়ে আমি একটা ছবি বানাতে চাই। থার্টি ফাইভ মিলিমিটারে ফুল লেংথ ফিচার ফিল্ম। আপনি কি আমাকে সাহায্য করবেন?
বাবা দীর্ঘ সময় মঈনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। জীবনে এমন অদ্ভুত প্রস্তাবের মুখোমুখি তিনি সম্ভবত হন নি। মঈন বলল, আপনারতো নানান ধরনের ব্যবসা আছে। ব্যবসায় টাকা খাটাচ্ছেন— ছবির ব্যবসা করে দেখুন। আপনি চাইলে আমি চিত্রনাট্য দিয়ে যাব। আপনি পড়লেই বুঝতে পারবেন খুব সুন্দর গল্প। ভাল মত বানাতে পারলে অপূর্ব হবে। এবং আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন আমি ছবিটা খুব ভাল বানাব। ছবির ব্যবসায় আপনার হয়ত লাভ হবে না। ক্ষতিই হবে তবে দেশ একটা ভাল জিনিস পাবে। সামান্য আর্থিক ক্ষতি আপনার গায়ে লাগবে না।
বাবা বললেন–এই অদ্ভুত প্রস্তাব নিয়ে তুমি কি শুধুই আমার কাছে এসেছ আরো অনেকের কাছে গিয়েছ?
অনেকের কাছে যাই নি। কয়েকজনের কাছে গিয়েছি। বিত্তবানদের বাড়িতে চট করে ঢোকা যায় না। আর যদিও বা ঢোকা যায় তারা কিছু শুনতে চান না।
বাবা বললেন, আমি শুনলাম। তুমি দশ মিনিট সময় চেয়েছিলে— আমি এগারো মিনিট দিলাম। এখন তুমি যেতে পার।
চলে যাব?
অবশ্যই চলে যাবে।
জ্বি আচ্ছা।
তোমার প্রফেশন কি ছবি বানানো?
জ্বি না–এখন পর্যন্ত কোন ছবি বানাই নি। তবে ছবি বানানোর খুব শখ।
পড়াশোনা কী?
আমি দুবছর আগে ফিলসফিতে এম. এ. পাশ করেছি।
চাকরি-বাকরি করছ?
জ্বি না। কোথাও কিছু পাচ্ছি না।
জ্বি না।
আমার একটা উপদেশ শোন। ছবির চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল। চাকরি জোগাড়ের চেষ্টা কর। রেফারেন্সের প্রয়োজন হলে আমি রেফারেন্স দিতে পারি। এখন তুমি যেতে পার।
মঈন উঠে দাঁড়াল।
আমি বললাম, চা খেয়ে যান।
মঈন সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ল। যেন এই কথাটার জন্যেই সে অপেক্ষা করছিল। আমি চা এনে দিলাম। উটকো গেস্টদের জন্যে চায়ের সঙ্গে বাসি চানাচুর দেয়া হয়। তাই দেয়া হল।
বেচারা খুব আগ্রহ করে পিরিচের সব চানাচুর খেয়ে ফেলল। তার খাওয়া দেখে মনে হল সে খুবই ক্ষুধার্ত। আমার এত মায়া লাগল যে বলার না। আমি বললাম, আপনি কি আর কিছু খাবেন? কেক আছে? কেক দেব? মঈন বলল, জ্বি আচ্ছা দিন।
আমি কেক এনে দিলাম। এবং সেদিন বিকেলেই বাবাকে বললাম—বাবা তুমিতো আমাকে কোথায় বিয়ে দেবে এই নিয়ে খুব চিন্তা ভাবনা করছ। এমন কী পীর ফকির পর্যন্ত ধরছ। তোমাকে একটা কথা বলি— মঈন নামের এই মানুষটাকে আমার পছন্দ হয়েছে। বাবার হাত থেকে কফির কাপ পড়ে গেল। এই হল গল্প। গল্প কেমন লাগল?
