তুমি কোন অপরাধ কর নি?
জ্বি না।
আমার নিজের ধারণা তুমি ভয়ংকর একটা অপরাধ করেছ। ঝড় বৃষ্টিতে তোমরা দৌড়ে একটা স্কুল ঘরে আশ্রয় নিলে। তাই না?
জ্বি।
কতক্ষণ ছিলে সেখানে?
খুব অল্প সময় ছিলাম। মওলানা সাহেব প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের খুঁজে পেলেন।
নীরা হাসি মুখে বললেন, আচ্ছা মওলানা সাহেব যদি আরেকটু দেরি করে আসতেন তাহলে কী হত?
আমি চুপ করে আছি। তাকিয়ে আছি তার দিকে। তিনি চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। দূর থেকে দেখে যে কেউ বলবে আমরা দুজন চা খেতে খেতে মজা করে গল্প করছি।
তুমি কি তার হাত ধরতে? কিংবা আরো কিছু? চুপ করে আছ কেন? চা খাও। চা ঠাণ্ডা হচ্ছে। চা-টা ভাল হয়েছে। তাই না?
জ্বি।
সিলেটে আমার চাচার একটা চায়ের বাগান আছে। সেই বাগানের চা। কী সুন্দর ফ্লেভার। রুমালী?
জ্বি।
শুনেছি তুমি খুব ভাল গান জান।
গান গাইতে পারি। ভাল কি-না জানি না।
শুনাও, একটা গান শুনাও।
আলোচনা কি অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে? মোড় নিলেও লাভ হবে না, তিনি আবারো মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসবেন। এটা সাময়িক বিরতি। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, কী ধরনের গান শুনতে চান?
এরকম ভাবে বলছ যেন সব ধরনের গানই তুমি জান। মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না। এটা জান?
জ্বি না।
তাহলে তোমার ইচ্ছামত একটা গান কর।
আমি দেরি করলাম না, সঙ্গে সঙ্গে শুরু করলাম—
Down the way
Where the nights are gay
I took a trip
On a sailing ship
And when I reached Jamica I made a stop.
আমি গান করছি, নীরা তীক্ষ্ণচোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তার ঠোঁটে বিচিত্র হাসি। এখন তিনি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছেন। তিনি তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে। চারদিক কী অপূর্ব সুন্দর। আকাশ ঘন নীল। আমার গান গাইতে ভাল লাগছে।
এই গানের যদি অনেকগুলি অন্তরা থাকত খুব ভাল হত। আমি গেয়ে যেতাম গান ফুরতো না। আমি আপন মনে গাইছি। একবারও নীরার দিকে তাকাচ্ছি না। না তাকিয়েও বুঝতে পারছি–তিনিও আমার দিকে তাকাচ্ছেন না। না দেখেও আমি বলতে পারি কেউ আমার দিকে তাকাচ্ছে কি তাকাচ্ছে না।
এক সময় গান শেষ হল, আমি নীরার দিকে তকিয়ে হাসলাম। উনি এখন কী করবেন? আমাকে কি বলবেন, চল ক্যাম্পে ফিরে যাওয়া যাক। না-কি পুরানো প্রসঙ্গ আবার শুরু করবেন। মহামান্য আদালত একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকবেন। নানান দিক থেকে আক্রমণ করে দুর্গে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করবেন। নীরা যত বুদ্ধিমতীই হোন না কেন আমার দুর্গে ফাটল ধরাতে পারবেন না। ইট-কাঠ-লোহার দুর্গে ফাটল ধরানো যায় ভালবাসার দুর্গে ফাটল ধরানো যায় না।
রুমালী?
জ্বি।
তোমার গানের গলা ভাল।
থ্যাংক য়্যু।
শুধু ভাল বলে ভুল করেছি—খুবই ভাল। তুমি কি মঈনকে তোমার গান শুনিয়েছ?
জ্বি না।
শোনাও নি কেন? সে যেমন তোমাকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করছে, তুমিও করবে। সেটাই নিয়ম।
উনি শুনতে চান নি।
কেউ শুনতে না চাইলে তুমি গান শোনাও না?
জি না। কথা নেই, বার্তা নেই আমি হুট করে গান শুরু করব কেন? এইসবতো শুধু সিনেমাতেই হয়।
তুমিতো সিনেমা করতেই এসেছ!
নীরা হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। কথার পিঠে কথা জুড়ে তিনি এগুচ্ছেন। আমার ক্লান্তি লাগছে। আমি কি তাঁকে বলব— কথা কথা খেলা খেলতে ইচ্ছে করছে না। অন্য কোন খেলা খেলতে চাইলে বলুন। পশু-পাখি-ফুল-ফল খেলা খেলবেন? আসুন আমরা পশু-পাখি-ফুল-ফল খেলা খেলি।
রুমালী!
জ্বি।
মঈনের সঙ্গে আমার বিয়ে কী ভাবে হল এই গল্প কি শুনবে? খুব ইন্টারেস্টিং গল্প। শুনলে তোমার ভাল লাগবে।
বলুন শুনব।
নীরা ফ্লাস্ক থেকে আবারো চা নিলেন। তার চা খাবার ব্যাপারটা মজার। ফ্লাস্ক থেকে অল্প অল্প চা কাপে ঢালেন। কাপ শেষ হয় আবারো নেন। তিনি হালকা গলায় বললেন, আমাদের বিয়ে কিন্তু প্রেমের বিয়ে নয়। আমাদের হচ্ছে এরেন্ড ম্যারেজ। তবে এই এরেজুমেন্টের ব্যাপারটি আমার করা। এরেন্ড ম্যারেজে সাধারণত বর কনের কোন ভুমিকা থাকে না। তাদের আত্মীয় স্বজনরাই সব ব্যবস্থা করেন। আমার বিয়ের বেলায় সব ব্যবস্থা আমিই করেছি। আমি বাবাকে গিয়ে বলেছি, বাবা মঈন নামের এই ছেলেটিকে আমি বিয়ে করতে চাই। বাবা তখন কফি খাচ্ছিলেন। আমার কথা শুনে তিনি এতই চমকালেন যে তার হাত থেকে কফির পেয়ালা পড়ে গেল। কার্পেটে কফির দাগ লেগে গেল। সেই দাগ এখনো আছে। তুমি যদি কখনো আমাদের বাড়িতে যাও তোমাকে দেখাব। গল্পের ভূমিকাটা কেমন?
জ্বি ভাল।
আমি যখন আমাদের ধানমণ্ডির বাড়িতে বেড়াতে যাই–তখন একবার হলেও বসার ঘরে যাই। কফির দাগ ভরা কার্পেটটার দিকে তাকিয়ে থাকি আমার খুব মজা লাগে। আচ্ছা এখন গল্পটা শোন।
জ্বি শুনছি।
মঈন তখন সবে মাত্র ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করেছে। চাকরি বাকরির চেষ্টা করছে— পাচ্ছে না। খুবই দুরবস্থা। সব সময় দুবেলা ভাত খাবার মত টাকাও থাকে না। কোনো কাজে যখন কারো বাসায় যায়—দুপুর বেলায় ভাত খাবার সময়ে যায়। তারা যদি ভদ্রতা করেও একবার বলে— ভাত খেয়ে যাও, সে দেরি করে না, সঙ্গে সঙ্গে বলে–জ্বি আচ্ছা। কোথায় হাত পোব? এই হল তার অবস্থা।
নীরা খিলখিল করে হাসছেন। সহজ সরল হাসি। গল্পটা বলতে পেয়ে তার খুব ভাল লাগছে তা বুঝতে পারছি। তিনি যে তার বিয়ের গল্প করবেন, এটিও কি তার পরিকল্পনায় ছিল? গল্পটা হবে ঈশপের গল্পের মত। গল্পের শেষে আমার জন্যে ছোট্ট উপদেশ থাকবে।
