জ্বি না।
কিন্তু তুমি তার সঙ্গে চলে এলে। কাজটা কি তুমি নিজের ইচ্ছেয় করলে?
জ্বি।
নীরা আবারো আগের ভঙ্গিতে হাসলেন। আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আমাকে উনি অতল জলের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। কাজটা করছেন খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। তার গলায় কোন রাগ নেই। তিনি ছোট ছোট পায়ে হাঁটছেন। একবার দাঁড়াচ্ছেনও না।
রুমালী।
জ্বি।
তোমার ধারণা তুমি নিজের ইচ্ছেয় বৃষ্টিতে ভেজার জন্যে তার সঙ্গে রওনা হয়েছ। এই ধারণা ঠিক না। তুমি নিজের ইচ্ছায় আস নি। সে তোমাকে আসতে বাধ্য করেছে। সে পরিস্থিতি এমন ভাবে তৈরি করেছে যে তোমার এ-ছাড়া দ্বিতীয় পথ ছিল না।
আমি নিজের ইচ্ছেতেই এসেছি। কাশবনের ওখানে আর কোন মেয়ে ছিল না। আমি একা ছিলাম। যারা ছিলেন তাদের কারো সঙ্গে আমার তেমন পরিচয় নেই। একা থাকতে আমার ভয় ভয় লাগছিল।
তুমি কাউন্টার আমেন্ট ভাল দাঁড় করিয়েছ। মঈনের সঙ্গে ঝড় এবং বৃষ্টিতে হাত ধরাধরি করে আসতে তোমার কি ভাল লাগছিল?
ভাল লাগছিল তবে আমরা হাত ধরাধরি করে আসি নি। আপনি কোথাও একটা ভুল করছেন। আমি উনাকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করি। এর বেশি কিছু না।
তুমি তার প্রেমে পড় নি?।
আপনি খুবই অদ্ভুত কথা বলছেন।
আমি মোটেই অদ্ভুত কথা বলছি না। তুমি অদ্ভুত কথা বলছ। তুমি খুব বুদ্ধিমতী একটা মেয়ে। বেশি বুদ্ধিমতী মেয়েদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে তারা অন্যের বুদ্ধি খাটো করে দেখে। তারা সব সময় ভাবে পুরো পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণে। সব সময় তা হয় না। খুব বুদ্ধিমানরাই বড় ধরনের বোকামি করে। তুমি একটা বড় ধরনের বোকামি করেছ।
কোন বোকামি?
এসো ঐ ছাতিম গাছটার নীচে বসি। বসে গল্প করি। হেঁটে টায়ার্ড হয়ে গেছি। মাথায় রোদও লাগছে। ছাতা নিয়ে আসা দরকার ছিল। আমার চায়ের পিপাসা হচ্ছে। তোমার কি হচ্ছে?
জ্বি।
খুব ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি খেয়ে তারপর চা খেতে পারলে ভাল হত। তাই না?
জ্বি। ঠাণ্ডা পানি এবং চা এখনই চলে আসবে।
আমি বিস্মিত হয়ে তাকালাম। নীরা হাসি মুখে বললেন, আমি কোন ভবিষ্যৎ বাণী করছি না। ভবিষ্যৎ বাণীর ক্ষমতা আমার নেই। তোমার সঙ্গে রওনা হবার আগে আমি সোহরাবকে বলে এসেছি যে ছাতিম গাছের নীচে আমি রুমালী মেয়েটিকে নিয়ে বসব তার সঙ্গে গল্প করব। তুমি ঠাণ্ডা পানি এবং চা পাঠাবে।
আমি চুপ করে আছি। ভদ্রমহিলা আমাকে ভালই চমকে দিয়েছেন। তিনি এগুচ্ছেন তাঁর পরিকল্পনা মত। কী করবেন, কী বলবেন সবই মনে হয় ঠিক করা। আমার সঙ্গে যখন বের হয়েছেন তখন বুঝতেই পারি নি তিনি পুরো ব্যাপারটা ছকে ফেলে রেখেছেন। আমরা গাছের নীচে বসে আছি এবং আমি দেখতে পাচ্ছি সোহরাব চাচা আসছেন। তার কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। সেই ব্যাগে নিশ্চয়ই ফ্লাস্কভর্তি বরফ শীতল পানি। এবং অন্য ফ্লাস্কে চা। সুন্দর চায়ের কাপ। চিনির পটে চিনি। কয়েকটা নোনতা বিসকিটও থাকতে পারে।
রুমালী।
জ্বি।
মঈনের চরিত্রের কোন দিকটি তোমাকে আকর্ষণ করেছে?
আমি সেই ভাবে কখনো বিচার করতে চেষ্টা করি নি।
যাকে তুমি এত পছন্দ কর তাকে তুমি নানান ভাবে বোঝার চেষ্টা করবে না? পছন্দের পেছনের কারণগুলি দেখবে না?
আমি কিছু বললাম না, চুপ করে রইলাম। নীরা হালকা গলায় বললেন, ওর সবচে ভাল দিক হচ্ছে ওর ছেলেমানুষী। একটা বাচ্চা ছেলে ওর ভেতর বাস করে। বাচ্চারা কী করে জান? ওদের কিছু খেলনা থাকে। প্রিয়জনদের দেখা পেলেই সে তার খেলনাগুলি বের করে দেখায়। নিজের খেলনায় সে মুগ্ধ হয়ে থাকে এবং চেষ্টা করে অন্যদের মুগ্ধ করতে। তোমাকে করে নি?
কী খেলনার কথা বলছেন?
তার খেলনার বেশির ভাগই হচ্ছে গল্প। যেমন ধর তিনটা পিঁপড়ার গল্প। একজনের পেছনে একজন যাচ্ছে। এই গল্পটি তোমাকে বলে নি?
বলেছেন।
একটা পিঁপড়া এবং হাতির গল্প— এই গল্পটি করেছে?
জ্বি।
যখের গল্প করেছে? যখ নিয়ে সে ছবি বানাতে চায় এই গল্প?
জ্বি করেছেন।
এইসব হচ্ছে তার খেলনা। আশে পাশের মানুষদের মুগ্ধ করার জন্যে এই খেলনা সে ঝুমঝমির মত বাজায় এবং সবাই মুগ্ধ হয়। এক সময় আমিও হয়েছিলাম।
আপনার মুগ্ধতা কি কেটে গেছে?
মুগ্ধতা কেটে গেছে। মুগ্ধতার জায়গায় এখন যা আছে তার নাম করুণা। আমি তার প্রতি প্রবল করুণা বোধ করি। ও সেটা জানে। অন্যের ভালবাসা। যেমন টের পাওয়া যায়, করুণাও টের পাওয়া যায়। অবশ্যি মঈন তেমন বুদ্ধিমান নয়। বুদ্ধিমান নয় বলেই কী পরিমাণ করুণা তাকে করি তা সে বুঝতে পারে না। ওর যে বুদ্ধি কম তা কি তুমি বুঝতে পেরেছ?
যারা নিজের কাজে ডুবে থাকে বাইরে থেকে তাদের বোকা মনে হয়।
মনে হচ্ছে তুমি তাকে বোকা বলতে রাজি নও।
সোহরাব চাচা পানি এবং চা নিয়ে এসেছেন। দৌড়ে এসেছেন বলে তিনি হাঁপাচ্ছেন। নীরা বললেন, তোমার স্যারের ঘুম ভেঙ্গেছে?
জ্বি।
কী করছে?
কিছু করছেন না, শুয়ে আছেন। স্যারের জ্বর মনে হয় বেড়েছে। একজন ডাক্তার আনতে যাব।
যাও ডাক্তার নিয়ে এসো। চা ঢালতে হবে না আমরা ঢেলে নেব।
সোহরাব চাচা চলে গেলেন। নীরা চায়ের কাপে চা ঢালতে ঢালতে বললেন, তুমি আমাকে ভয় পেও না। আমার সঙ্গে সহজ ভাবে কথা বল। আমি ভয়ঙ্কর কেউ না। আমি ভাল মেয়ে। কী পরিমাণ ভাল মেয়ে তা তুমি জান না।
আমি বললাম, আমি সহজ হতে পারছি না। আমার নিজেকে একজন আসামীর মত মনে হচ্ছে। যেন আমি কোন ভয়ঙ্কর অপরাধ করেছি। আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। আর আপনি আমাকে প্রশ্ন করছেন।
