আমি সহজ গলায় বললাম, তুমি কী অন্যায় করেছ?
বাবা প্রায় বিড়বিড় করে বললেন, আমি আমার অফিসের একজন কলিগকে বিয়ে করে ফেলেছি। তার নাম ইসমত আরা। ব্যাপারটা কীভাবে কীভাবে যেন ঘটে গেছে।
বিয়ে কবে করেছ?
প্রায় তিন মাসের মত হয়েছে। তোর মাকে এখনো কিছু বলি নি। কীভাবে বলব তাও বুঝতে পারছি না। তোকেই প্রথম বললাম।
আমি কি মাকে বলব?
না তোকে কিছু বলতে হবে না। যা বলার আমিই বলব। কীভাবে বলব সেটাই ভাবছি।
আমি খুব সহজ ও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কফির মগে চুমুক দিচ্ছি। বাবার হয়তো ধারণা হল— তিনি কী বলছেন তা আমি বুঝতেই পারি নি। বুঝতে না পারারই কথা, আমার বয়স তখন মাত্র এগারো, ক্লাস ফাইভে উঠেছি।
বাসায় ফেরার পথে বাবা কী মনে করে জানি দশটাকা দিয়ে একগাদা কদম ফুল কিনলেন। কদম ফুলতো আর গোলাপ বা রজনীগন্ধার মত দামী ফুল না। সস্তা ধরনের ফুল। টোকাইরা নিজেদের খেলার জন্যে গাছ থেকে পেড়ে আনে। কেউ সেই ফুল কিনতে চাইলে তারা যেমন বিস্মিত হয়, তেমনি আনন্দিতও হয়। দুটা ফুল চাইলে দশটা দিয়ে দেয়।
মা কদমফুল দেখে খুবই আনন্দিত হলেন তবে চোখে মুখে বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে বললেন, কী যে তোমার কাণ্ড। গন্ধ নেই, কিছু নেই এক গাদা ফুল নিয়ে এলে। জঞ্জাল দিয়ে ঘর ভরতি। কোন মানে হয়? তাও যদি ঘরে কোন ফুলদানী থাকত। এই ফুল আমি রাখব কোথায়, বালতিতে?
মা সেই জঞ্জাল গভীর আনন্দের সঙ্গে সাজিয়ে রাখলেন। এক ফাঁকে নিচু গলায় আমাকে বললেন, তোর বাবার এই এক বিশ্রী স্বভাব। ভাল ফুলটুল কিছু দেখলেই আমার জন্যে নিয়ে আসবে। আমি কি দেবী না-কি যে আমাকে ফুল দিয়ে অর্চনা করতে হবে?
ভালবেসে করে। আমি কখনো প্রশ্রয় দেই না। ভাব দেখাই যে রাগ করেছি। মা আনন্দের হাসি হাসছেন। তিনি জানতেও পারছেন না যে তার জীবনে ভয়াবহ ধ্বস নেমে গেছে বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল তার জন্যে কেউ আর কোন দিন আনবে না।
মা ব্যাপারটা জানতে পারেন আমার জানার দুমাস পর। এই দুমাসে আমি মাকে কিছুই বলি নি। বাবাকেও না। আমি আমার নিজের মনে ক্লাস করেছি, গল্পের বই পড়েছি, ডাইরি লিখেছি। কে জানে আমি হয়ত খুব অদ্ভুত একটা মেয়ে।
সুন্দর ঝকঝকে সকাল
কী সুন্দর ঝকঝকে সকাল!
অঞ্চলটাকে যেন আগের রাতে সাবান দিয়ে মাজা হয়েছে। চকচক করছে চারদিক। চারদিক থেকে সবুজ আভা বের হচ্ছে। কেউ যেন প্রতিটি গাছের পাতার আড়ালে সবুজ বাতি জ্বেলে দিয়েছে। আমি একতলায় নেমে দেখিকেমন উৎসব উৎসব ভাব। সবাই এক সঙ্গে কথা বলছে। কেউ কারো কথা শুনছে বলে মনে হল না। সেলিম ভাই শুধু এক কোণায় একা একা বসে আছেন। মনে হচ্ছে তার মন খুব খারাপ। তিনি আমাকে দেখেই চোখ নামিয়ে নিয়ে কেমন শক্ত হয়ে গেলেন। ডিরেক্টর সাহেব বা তাঁর স্ত্রী কাউকেই দেখলাম না। তাঁরা বোধ হয় ঘুম থেকে ওঠেন নি। উনার স্ত্রীকে দেখার শখ ছিল।
মা খুব উৎসাহের সঙ্গে মওলানা সাহেবের সঙ্গে গল্প করছেন। মার মুখ হাসি হাসি। হাদিস কোরানের গল্প শুনে মার মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হবার কথা না। নিশ্চয়ই অন্য কোন গল্প। মওলানা সাহেবের কান্ড কারখানাও অদ্ভুত–দিব্যি সিনেমার দলের সঙ্গে মিশে গেছেন। সকালবেলাতেই উপস্থিত। মা আমাকে দেখে এগিয়ে এলেন।
বকুল তোর ঘুম ভেঙ্গেছে?
না ভাঙ্গে নি। এখনো ঘুমুচ্ছি। ঘুমুতে ঘুমুতে নীচে নেমে এসে, এখন তোমার সঙ্গে কথা বলছি।
সব সময় বাঁকা কথা বলিস কেন? মাঝে মাঝে সোজা কথা বললে কী হয়?
ভাল হয়।
এখন কটা বাজে জানিস? দশটা।
তাই না-কি!
আজ নাশতা ছিল তেহারী। এক একজন দুই প্লেট তিন প্লেট করে খেয়ে নাশতা সর্ট ফেলে দিয়েছে। তোরটা আমি আলাদা করে রেখেছি। দাঁড়া গরম করে দিতে বলি।
তোমাকে এমন খুশি খুশি লাগছে কেন মা?
খুশির তুই কী দেখলি?
মা রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেলেন। তার আদরের কন্যার নাশতা যেন মিস। হয়। মওলানা সাহেব আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। আচ্ছা মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারেই কি তার আগ্রহ? আমি তাকে খুব কম সময়ই ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি। সব সময় লক্ষ্য করেছি তিনি মেয়েদের আশেপাশেই আছেন এবং গুট গুট করে মেয়েদের সঙ্গেই কথা বলছেন।
আম্মা কেমন আছেন?
জ্বি ভাল আছি। আপনি ভাল?
আল্লাহপাকের অসীম রহমতে ভাল আছি।
আপনি দেখি একেবারে সিনেমার লোক হয়ে গেছেন। সবই আম্মা আল্লাহপাকের হুকুম। স্যার আমাকে চাকরি দিয়েছেন। মাসিক বেতন দুই হাজার টাকা। আমার জন্য যথেষ্ট। চণ্ডিগড় স্কুলে বেতন ছিল বার শ। হাতে পেতাম ছয় শ। তাও সব মাসে না।
আপনার জন্যেতো ভালই হল। তবে মওলানা মানুষ হয়ে সিনেমার লাইনে চাকরি এইটাই যা কথা।
যে কোন কাজই আম্মা সৎ ভাবে সৎ নিয়তে করা যায়। আল্লাহপাক নিয়তটা দেখেন। আর কিছু দেখেন না।
তা যায়। আপনার কাজটা কী?
স্যার এখনো কিছু বলেন নাই। স্যারের সঙ্গে এইটা নিয়েই কথা বলতে এসেছি। শুনলাম স্যারের শরীর ভাল না। জ্বর এসেছে। জ্বর আসারই কথা কাল যে ভিজা ভিজেছেন। আম্মা আপনার জ্বর আসে নিতো?
জ্বি না।
আলহামদুলিল্লাহ্।
মা প্লেটে করে তেহারী এবং চামচ নিয়ে এসেছেন। ভাব ভঙ্গি দেখে মনে হয় মুখে তুলে খাইয়ে দেবেন। লোকজনের সামনে মা খানিকটা আহ্লাদী হয়ে যান। মেয়েকে মুখে তুলে খাইয়ে দিয়ে তিনি প্রমান করার চেষ্টা করবেন যে তাঁর মেয়ে অন্তপ্রাণ। আমি মার হাত থেকে প্লেট নিয়ে নিলাম।
