আমি একা একা খাব তুই বসে বসে দেখবি এটা কেমন কথা!
কিচ্ছু হবে না বাবা––তুমি খাও।
একটা কাজ করলে কেমন হয়–আমার আইসক্রীম থেকে তুই দুএক কামড় দে।
আচ্ছা।
বাড়িতে আইসক্রীম খাওয়া আমার জন্যে পুরোপুরি নিষিদ্ধ। আমার ঠান্ডার দোষ আছে। আইসক্রীম খেলেই আমার টনসিল ফুলে যায়।
আইসক্রীম কেনা হয়। বাবা একটা কামড় দিয়েই বলেন, একী খেতে এমন বিশ্রী কেন? টাকাটা মনে হচ্ছে জলে গেল। রুমালী তুই খেয়ে দেখতো তোর কাছে কেমন লাগছে। আমি খেয়ে বলি, বাবা আমার কাছেতো খুব ভাল লাগছে।
তাহলে বরং তুই খেয়ে ফেল। নষ্ট করে লাভ কী? মাকে না বললেই হল।
আমি মহানন্দে আইসক্রীম খাই। আমাকে আইসক্রীম খাওয়ানোর বাবার এই ছেলেমানুষী কৌশল আমি চট করে ধরে ফেলি। আমার এত ভাল লাগে। এক একদিন আনন্দে চোখে পানি এসে যায়।
এখন আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। কেন পড়ছে আমি জানি না। আমার চোখ দিয়ে পানি পড়া রোগ হয়েছে। একা একা কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলেই আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ে।
আবার কি বৃষ্টি শুরু হল? শহরের বৃষ্টি এবং গ্রামের বৃষ্টিতে এক না। শহুরে বৃষ্টির ভেতর শহুরে ভাব আছে। যেন হিসেব কষা বৃষ্টি। গ্রামের বৃষ্টি লাগামছাড়া।
শহরের দালানকোঠা বৃষ্টির সঙ্গে নাচে না। গ্রামের গাছপালা, ঝোপঝাড় বৃষ্টিতে নাচতে থাকে।
আমার জীবনের বড় বড় সব ঘটনার সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক আছে। যে দিন আমি মারা যাব সেদিনও নিশ্চয়ই খুব ঝড় বৃষ্টি হবে। আমার ডেডবডি নিয়ে মা পড়বেন বিরাট সমস্যায়। লোকজনকে কীভাবে খবর দেবেন? কে আসবে? কোন কবরখানায় কবর হবে? গোরখোদকদেরও হয়তো খবর দিয়ে পাওয়া যাবে না। তবে মা সব ম্যানেজ করে ফেলবেন। দেখা যাবে ঝড় বৃষ্টির কারণেও কিছু আটকাচ্ছে না।
আমার জীবনের সঙ্গে ঝড় বৃষ্টির সম্পর্কের একটা গল্প বলি। স্কুল ছুটি হয়েছে। আমরা ক্লাস থেকে বের হয়ে দেখি খুব বৃষ্টি। রাস্তায় পানি জমে গেছে। আমাদের খুব মজা হচ্ছে। আমরা ইচ্ছা করে বৃষ্টিতে ভিজছি। একজন মিস বকা দিতে এসে নিজেও খানিকক্ষণ ভিজলেন। আমি তেমন করে ভেজার সাহস পাচ্ছি না, কারণ মা আমাকে নিতে আসবেন। তিনি যদি দেখেন আমার গা ভেজা তাহলে সব মেয়েদের সামনেই চড় থাপ্পড় মারা শুরু করবেন। হঠাৎ অবাক হয়ে দেখি মা না, বাবা আমাকে নিতে এসেছেন। আমার আনন্দের কোন সীমা রইল না। বাবা বললেন, তোর মার শরীর খারাপ। সে আসতে পারল না।
আমি বললাম, ভালই হয়েছে আসতে পারে নি। বাবা আজ আমি সরাসরি বাসায় যাব না, তোমার সঙ্গে রিকশা করে বৃষ্টিতে ঘুরব। বাবা বললেন, আচ্ছা। তাঁর গলা কেমন যেন শুকনো অন্যমনস্ক শুনাল। যেন তিনি কী বলছেন নিজেই জানেন না এবং তাঁর মন ভাল নেই। আমি বললাম, বাবা তোমার কি শরীর খারাপ? বাবা বললেন, হুঁ।
কী হয়েছে, জ্বর?
এই বলে আমি তার হাতে হাত রাখলাম। না জ্বর না, শরীর ঠাণ্ডা।
তোমার ভাল না লাগলে চল বাসায় চলে যাই।
বৃষ্টিতে ঘুরতে মন্দ লাগছে না— চল খানিকক্ষণ ঘুরি। তবে শহরের বৃষ্টি হল ভুয়া বৃষ্টি। আসল বৃষ্টি দেখতে হলে গ্রামে যেতে হয়। আইসক্রীম খাবি?
না। বৃষ্টির মধ্যে আইসক্রীম খেলে লোকজন হাসবে।
তাহলে চল কোথাও বসে কফি খাই। এক্সপ্রেসো কফি। খাবি?
চল যাই।
বাবা আমাকে একটা কফি শপে নিয়ে গেলেন। কফি শপটা মনে হয় বাবার চেনা। ম্যানেজার হাসি মুখে বলল, ভাল আছেন? বাবা শুকনো গলায় বললেন, হুঁ।
এ কে?
বাবা বিব্রত ভঙ্গিতে বললেন, আমার মেয়ে। এটা বলতে গিয়ে তিনি কেন বিব্রত বোধ করছেন তাও বুঝলাম না। কফি শপটা প্রায় ফাঁকা। বাবা কোণার দিকের একটা চেয়ারে আমাকে নিয়ে বসালেন। এখান থেকে রাস্তা দেখা যায়।
মা আর কিছু খাবি?
না।
এরা খুব ভাল বার্গার বানায়। একটা খেয়ে দেখ।
বাবা আমাকে বসিয়ে রেখে ম্যানেজারের কাছে চলে গেলেন। সেখান থেকে কোথায় জানি টেলিফোন করলেন। আমাকে বার্গার দিয়ে গেছে, সস দিয়ে গেছে। আমি বার্গার খেতে খেতে বাবাকে লক্ষ্য করছি। তার টেলিফোন শেষই হচ্ছে না। মগ ভর্তি কফি দিয়ে গেছে, এখন নিশ্চয়ই ঠাণ্ডা হচ্ছে।
এক সময় টেলিফোন শেষ হল। বাবা কফি শপের ঐ লোকটার কাছ থেকে চেয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে আমার সামনের চেয়ারে বসেই বললেন
রুমালী কী বলছি মন দিয়ে শোন।
বাবার সব কথাই আমি খুব মন দিয়ে শুনি। তারপরেও তিনি আমাকে মন দিয়ে কথা শুনতে বলছেন কেন? ভয়ংকর কিছু কি ঘটেছে? মা বেবীটেক্সী এক্সিডেন্ট করে এখন হাসপাতালে আছেন? ভয়ংকর অবস্থা? তাঁকে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে। রক্ত দেয়া হচ্ছে। বাবা এই খবরটা আমাকে দিতে পারছেন না বলে কফি খাওয়াতে নিয়ে এসেছেন? এতক্ষণ যে টেলিফোনে কথা হল তা নিশ্চয়ই হাসপাতালের কারোর সঙ্গে। তারাও ভাল কোন খবর দিতে পারে নি। হয়ত আরো খারাপ খবর দিয়েছে। নয়তো বাবার মুখ এমন শুকনো হয়ে যাবে কেন?
রুমালী!
হুঁ।
কফিটা কেমন, খেতে ভাল না?
হুঁ।
তবে চিনি খুব বেশি। এক্সপ্রেসো কফির এই নিয়ম। চিনি বেশি দিতে হয়।
হুঁ।
বাবা কফির মগে চুমুক দিতে দিতে অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন–রুমালী মা শোন, আমি একটা ভয়ংকর অন্যায় করে ফেলেছি। মানুষ যখন বড় ধরনের কোন অন্যায় করে তখন সে বুঝতে পারে না যে সে অন্যায় করছে। বুঝতে পারলে অন্যায়টা সে করতে পারত না। তখন তার কাছে অন্যায়টাকে ন্যায় মনে হয়। যখন সে অন্যায়টাকে অন্যায় বলে মনে করে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
