মা কথা বললেন না, বিছানা ছেড়ে উঠে চলে গেলেন। আমি তাঁর খুব দুর্বল একটা জায়গায় ঘা দিয়েছি। আঘাত সামলাতে তাঁর সময় লাগবে। তিনি আজ আলাদা বিছানায় ঘুমুবেন। এবং আমি নিশ্চিত বাকি রাতটা আমাকে বিরক্ত করবেন না।
মার গায়ে রসুনের গন্ধ এই কথাটা বাবা শেষের দিকে বলতে শুরু করেছিলেন। মার ঘর এবং আমার ঘর ছিল পাশাপাশি। ঐ ঘরে একটু চড়া গলায় কোন কথা হলেই আমি শুনতে পেতাম। বাবা কখনোই চড়া গলায় কোন কথা বলতেন না, তবে অল্পতেই মার গলা চড়ে যেত। মা কী বলছেন সেখান থেকেই বাবার জবাব কী হচ্ছে বোঝা যেত। এক রাতে শুনি মা চড়া গলায়, এবং একই সঙ্গে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলছেন— কী বললে, আমার গায়ে রসুনের গন্ধ? বাবা কী একটা জবাব দিলেন। সেই জবাব শোনা গেল না। মার . পরবর্তী কথা শোনা গেল–আমার গায়ে রসুনের গন্ধ বলে আমি তোমার সঙ্গে ঘুমুতে পারব না? আমার স্বামী থাকবে এক ঘরে, আমি থাকব আরেক ঘরে? আর রসুনের গন্ধটা তুমি পাচ্ছ কীভাবে? আমি কী ক্ষেতে রসুন বুনে এসেছি? মার ফুপিয়ে কান্নার শব্দ শোনা গেল। তার কিছুক্ষণ পর মা আমার ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করলেন। আমি সদ্য ঘুম ভেঙ্গে উঠে এসেছি এমন ভাব করে দরজা খুলে বিরক্ত গলায় বললাম, রাত দুপুরে কী এমন দরজা ধাক্কাধাক্কি শুরু করেছ। মা ধরা গলায় বললেন–বকু ভাল মত শুকে দেখতো–আমার গায়ে কি কোন গন্ধ পাস? কোন বাজে টাইপ গন্ধ?
আমি অনেক শুকে টুকে বললাম, হুঁ পাচ্ছি। বেশ বাজে ধরনের একটা গন্ধ পাচ্ছি মা।
বাজে ধরনের গন্ধ মানে কী?
রসুন রসুন টাইপ।
সত্যি পাচ্ছিস?
হুঁ।
মা তখনই সাবান নিয়ে গোসলখানায় ঢুকলেন। গোসল করে গায়ে একগাদা সেন্ট মেখে ঘুমুতে এলেন। আমাকে বললেন, বকু এখনো গন্ধ পাচ্ছিস? আমি বললাম, এখন সেন্টের পচা গন্ধ পাচ্ছি। এরচে রসুনের গন্ধ ভাল ছিল। মাথা ধরে গেছে। তুমি আরেকবার গোসল করে আস। তুমি পাশে শুলে আমি ঘুমুতে পারব না। মা রাগ করে চাদর পেতে মেঝেতে ঘুমুতে গেলেন।
আমি কী মার চেয়ে বাবাকে বেশি পছন্দ করি? এই প্রশ্নটা নিয়ে আমি প্রায়ই ভাবি। এবং এক সময় এই সিদ্ধান্তে পৌছাই যে বাবার প্রতি তীব্র ঘৃণা ছাড়া আমার মনে কিছুই নেই। এটাও খুব আশ্চর্য ব্যাপার। একটা বড় ধরনের ভুলের জন্যে মানুষের সারা জীবনের সঞ্চিত শুদ্ধ কাজগুলিও ভুল হয়ে যায়।
আজ আমি যে ভুল করেছি তার জন্যে আমারও সারাজীবনের শুদ্ধ কাজগুলি কি ভুল হয়ে গেছে? না নিজের কথা আমি এখন ভাবব না। এখন নিজেকে নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করছে না। বরং বাবাকে নিয়ে ভাবি। আমার বাবা, সৈয়দ আনোয়ারের অনেক গুণ ছিল, এখনো নিশ্চয়ই আছে। তিনি শান্ত, ভদ্র, বিনয়ী, হাসি খুশি মানুষ। চোখে পড়ার মত বিশেষ কোন গুণ নেই। যাদের বিশেষ কোন গুণ থাকে না, তাদের বিশেষ কোন দোষও থাকে না। তার কোন দোষ ছিল না। তিনি গল্প বলতে পারতেন না, তবে গল্প শুনতে পছন্দ করতেন। আমি আমার স্কুলের সব গল্প বাবাকে বলতাম। অতি সাধারণ গল্প শুনেও তিনি মুগ্ধ ও বিস্মিত হতেন। তাঁর মুগ্ধতা ও বিস্ময় বোধে কোন খাদ ছিল না। অবাক হয়ে তিনি আমার গল্প শুনছেন, এই দৃশ্য এখনো আমার চোখে লেগে আছে।
বাবা শোন আজ কী হয়েছে আমাদের ক্লাসের একটা মেয়ে নাম দিলরুবা, সে পা পিছলে ধপাস করে পড়ে গিয়েছে।
বলিস কী?
মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত পড়ছিল।
তারপর?
মিস দৌড়ে এসেছেন। দিলরুবার বাবা মাকে খবর দিয়েছেন। তার মা কাঁদতে কাঁদতে এসেছে। এসেই মিসের সাথে কী চিৎকার কী চেঁচামেচি।
মিসের দোষ কী? তিনিতো আর ধাক্কা দিয়ে ফেলেন নি।
তবু উনি ভেবেছেন মিসের দোষ। মিসকে অনেক বকাঝকা করে দিলরুবাকে নিয়ে চলে গেছেন। উনি বলেছেন দিলরুবাকে আর এই স্কুলে রাখবেন না।
আমার মনে হয় এই স্কুলেই রাখবে।
আমারো তাই মনে হয়।
স্কুলের এই তুচ্ছ গল্প আমি মাকেও বললাম। মা গল্প শুনে বলেছেন— মিসেরইতো দোষ। সে দেখবে না মেয়েগুলি কী করছে না করছে? মিস গুলি কী করে আমিতো জানি। ক্লাসে এসে ঘুমায়। মাসের শেষে বেতন নিয়ে হাসি মুখে বাসায় যায়।
দিলরুবার প্রসঙ্গে পরবর্তীতে মা আর কিছুই জিজ্ঞাস করেন নি। কিন্তু বাবা ঠিকই পরের দিন জিজ্ঞেস করলেন, রুমালী দিলরুবা কি ক্লাসে এসেছিল? আমি বললাম, না বাবা। বাবা চিন্তিত গলায় বললেন, তাহলেতো সমস্যা। সত্যি সত্যি কি স্কুল বদলে দেবে?
বোধ হয়।
আরো দুএকটা দিন দেখা যাক।
তিন দিনের দিন কপালে ব্যান্ডেজ নিয়ে দিলরুবা ক্লাসে এল। আমি বাবাকে খবর দিতেই তিনি খুবই নিশ্চিন্ত হলেন বলে মনে হল। মনে হল তার বুক থেকে পাষাণ নেমে গেছে।
আমাকে স্কুল থেকে আনা নেয়ার কাজ মা-ই সব সময় করতেন। হঠাৎ হঠাৎ বাবা এসে উপস্থিত হতেন। সেদিন আমার আনন্দের কোন সীমা থাকত না। বাবার সঙ্গে স্কুল থেকে ফেরা, আমার জীবনের আনন্দময় ঘটনাগুলোর একটি। রিকশা করে ফিরছি হঠাৎ দেখা গেল এক জায়গায় কিছু লোক জটলা পাকিয়ে আছে। আমি বললাম—এখানে কী হচ্ছে বাবা?
বাবা সঙ্গে সঙ্গে রিকশা থামিয়ে আমাকে নিয়ে যাবেন জটলার কাছে। দুহাতে উঁচু করে তুলে ধরবেন যাতে কী হচ্ছে আমি দেখতে পাই।
হয়ত রিকশার পাশ দিয়ে আইসক্রীমের গাড়ি যাচ্ছে, বাবা বলবেন, আমার কেন জানি আইসক্রীম খেতে ইচ্ছা করছে। কী করা যায় মা?
আইসক্রীম খাও।
