এনে দিচ্ছি স্যার। টর্চ লাইটটা আপনার কাছে রাখেন।
তিনি টর্চ লাইট হাতে স্কুল ঘরে ঢুকলেন। বসলেন আমার পাশে। আমার মনে হল— এই পৃথিবীতে আমার চেয়ে সুখী কোন মেয়ে কোনদিন জন্মায় নি। কখনো জন্মাবেও না।
ঘুম আসছে না
ঘুম আসছে না।
আমি চোখ বন্ধ করে হাত পা এলিয়ে পড়ে আছি। আমার গায়ে মার বিখ্যাত ভালবাসা কম্বল। বাইরের পৃথিবী হিম হয়ে আছে। বৃষ্টি হচ্ছে না, তবে আকাশে গুডগুড শব্দ হচ্ছে–হয়ত শেষ রাতের দিকে আবারো বৃষ্টি নামবে। ঘুমুবার জন্যে সুন্দর একটা রাত। ঘুম আসছে না। মা এর মধ্যে দুবার কপালে হাত রেখে জ্বর দেখলেন। চুলে বিলি কাটার মত করলেন। অকারণে কিছুক্ষণ কাশলেন। তার আসল উদ্দেশ্য আমাকে ঘুম থেকে তুলে গল্প করা। শুটিং কেমন হল, ঝড়ের সময় কোথায় ছিলাম এইসব খুঁটিনাটি। মা শ্রোতা হিসেবে খুব মনোযোগী। তার স্মৃতিশক্তিও ভাল। আমি যা বলব তিনি খুব মন দিয়ে শুনবেন। কিছুই ভুলবেন না। বেশ অনেকদিন পর তার যখন ধারণা হবে আমি প্রথমবার কী বলেছিলাম তা এখন আর মনে নেই তখন আবারো জানতে চাইবেন। একই গল্প আমি আবারো বলব। দুটি গল্পে যদি কোন মিল পাওয়া না যায় তখন অমিলের জায়গাগুলিতে জেরা করতে বসবেন। সেই জেরা থেকে বের হয়ে যাবে আমি মিথ্যা কিছু বলেছিলাম কি-না। গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করলে মা খুব ভাল করতেন। অপরাধীর মুখ থেকে সত্যি কথা তিনি অতি দ্রুত বের করে ফেলতে পারতেন।
বকু। ও বকু।
আমি জবাব দিলাম না। ঘুমে তলিয়ে গেছি এমন ভঙ্গিতে গাঢ় নিঃশ্বাস ফেললাম।
তুইতো জেগে আছিস। কথা বলছিস না কেন?
আমি চোখ মেলে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বললাম, অসম্ভব টায়ার্ড লাগছে মা। চোখ মেলে রাখতে পারছি না।
তোদের শুটিং কেমন হল রে?
ভাল।
ঝড় কেমন দেখলি?
ভাল।
ঝড়ের সময় ভয় পেয়েছিলি?
হুঁ
ভয় পাওয়ারই কথা। আমারতো একেবারে আত্মা উড়ে গিয়েছিল।
মা আমাকে ঘুমুতে দাও। কথা বলো না। চুলে বিলি কাটবে না, সুড়সুড়ি লাগছে।
মা চুলে বিলি কাটা বন্ধ করলেন না, তবে কথা বন্ধ করলেন। এই কথা বন্ধও সাময়িক। তিনি আবারো শুরু করবেন। দম নিচ্ছেন।
বকু?
হুঁ।
তোরাতো চলে গেলি তার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিরাট এক পাজেরো জীপ এসে উপস্থিত। আমি ভাবলাম–পাপিয়া ফিরে এলো বুঝি। তাকিয়ে দেখি জীপের ভেতর একজন মহিলা বসে আছেন। তার কোলে পাঁচ ছ বছরের একটা মেয়ে ঘুমিয়ে আছে। মহিলা কে বলত? দেখি তোর অনুমান?
আমি জবাব দিলাম না। মার সঙ্গে এই মুহূর্তে অনুমান অনুমান খেলা খেলতে ইচ্ছা করছে না। আমি কিছু সময় একা থাকতে চাই। নিজের জীবনটার উপর চোখ বুলিয়ে নিতে চাই। খুব সহজ সাদামাটা জীবন আমার না। নানান ধরনের জটিলতার জীবন। জীবনটা যদি লম্বা দড়ির মত হয় তাহলে আমার সেই দড়ির নানান জায়গায় গিঁট লেগে গেছে। কিছু গিট আপনাতেই লৈগে আছে, কিছু গিট আমি লাগাচ্ছি।
মা চাপা গলায় বললেন, মহিলার নাম নীরা। আমাদের মঈন ভাইয়ের স্ত্রী। আর মেয়েটার নাম কী জানিস? খুবই অদ্ভুত নাম— এন্টেনা। টিভির এন্টেনা থাকে। মানুষের নামও যে এন্টেনা হয় এই প্রথম শুনলাম। মঈন ভাইয়ের স্ত্রীকে দেখে আমি খুবই আপসেট হয়েছি। সাদা তেলাপোকার মত ফর্সা গা–আর খুব অহংকারী চেহারা। কপাল না কুঁচকে তাকাতে পারে না। ভুরু কুঁচকে থাকতে থাকতে কপালে দাগ পড়ে গেছে। উনার মেয়েটার চেহারা অবশ্যি সুইট আছে। বড় হলে থাকবে কি-না কে জানে। ছোটবেলায় যাদের চেহারা সুইট থাকে–বড় হলে তারা ঘোড়ামুখী হয়ে যায়।
আমি মার কথায় মনে মনে হাসলাম।
বোঝাই যাচ্ছে নীরা নামের মহিলা অসম্ভব রূপবতী। রূপবতী মহিলাদের প্রসঙ্গে মা বলবেন–চেহারা অহংকারী। দেমাগ ঝরে ঝরে পড়ছে, চোখের রঙ কটা। ভুরু কুঁচকানো।
বকু!
হুঁ।
মহিলার সঙ্গে আমিই আগ বাড়িয়ে কথা বললাম। এলেবেলে টাইপ কথা। শুটিং কী হচ্ছে না হচ্ছে এইসব।
ভাল করেছ। ক্ষমতাবান মানুষের স্ত্রীর সঙ্গে খাতির রাখা ভাল।
খাতির করার জন্যে বলি নি! কথা বলে উনাকে একটু বাজিয়ে নিলাম। কী বুঝলাম জানিস! কথা বলে বুঝলাম ভদ্রমহিলা খুব পাকা অভিনেত্রী। হাসি খুশি একটা ভাব মুখে ধরে রেখেছে। যেই আসছে তার সঙ্গেই হাসি মুখে কথা বলছে। বুড়ি বয়সে খুকি সাজার চেষ্টা।
যত অভিনয়ই করুক তোমার কাছেতো ধরা পড়ে গেছে।
তুই বাঁকা ধরনের কথা বলছিস কেন?
প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছেতো মা, এই জন্যেই আমার সোজা কথাগুলি বাঁকা হয়ে বের হচ্ছে। তুমি কি তোমার একটা পা আমার দিকে এগিয়ে দেবে?
কেন?
তোমার পা ধরব।
পা ধরবি কেন?
পা ধরে বলব আজকের রাতটার মত আমাকে ক্ষমা কর। ঘুমুতে দাও।
ভাত খাবি না?
না।
তুই শুয়ে থাক, আমি মুখে তুলে খাইয়ে দি।
তোমাকে মুখে তুলে খাওয়াতে হবে না মা। আমার বমি বমি লাগছে। সরে বোস, নয়তো তোমার গায়ে বমি করে দেব।
এক গ্লাস দুধ এনে দি। দুধ খা আর একটা কলা খা।
আমিতো কালসাপ না যে আমাকে দুধ কলা দিয়ে পুষতে হবে। তুমি যথেষ্ট বিরক্ত করেছে দয়া করে আর বিরক্ত করো না।
আচ্ছা ঘুমো। মাঝখানে শুয়ে আছিস কেন? সাইড করে ঘুমো— আমার জন্যে জায়গা রাখ।
তুমি অন্য বিছানায় ঘুমাও মা। আজ আমি একা শোব। তোমার সঙ্গে ঘুমুতে ইচ্ছা করছে না।
আমার সঙ্গে ঘুমুতে অসুবিধা কী?
তুমি ঘুমের মধ্যে খুব নড়াচড়া কর। বিড় বিড় করে কথা বল। আমার অসুবিধা হয়। তাছাড়া তোমার গায়ে রসুনের গন্ধ।
