একটা কাজ করুন কোন একটা গাছের নীচে দাড়িয়ে সিগারেট শেষ করুন। তারপর আমরা হাঁটব।
থাক বাদ দাও। বৃষ্টি মনে হয় আরো জোরে আসছে।
হুঁ।
আমার বেলা সবসময় কী হয় জান–যখন দেখি জোর বৃষ্টি হচ্ছে, বৃষ্টি দেখে ভিজতে ইচ্ছে হল, যেই নামলাম–ওমি বৃষ্টি শেষ।
আজকেরটা শেষ হবে না। আজ সারা রাত বৃষ্টি হবে।
তোমার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে নাতো?
না। মাটি পিছল হয়ে আছে সাবধানে হাঁট।
সাবধানেই হাঁটছি। কেমন অন্ধকার হয়ে আসছে দেখছেন। কিছুক্ষণ পর আর চোখে কিছু দেখতে পাবেন না।
তাইতো মনে হচ্ছে।
পথ চিনে যেতে পারবেন?
তা পারব। জোড়া তালগাছ দেখতে পাচ্ছ?
হুঁ।
প্রথম যেতে হবে জোড়া তালগাছ পর্যন্ত। সেখানে দুটা রাস্তা। আমরা সেই রাস্তা নেব যেটা গেছে গারোদের শ্মশানের দিকে। বৃষ্টিতে ভিজতে কেমন লাগছে?
ভাল লাগছে।
ঝড় আসছে এটা কি বুঝতে পারছ?
না।
ঝড় আসছে। ভাল ঝড় আসছে। আমাদের প্রধান কাজ এখন হবে কোন একটা পাকা দালানে আশ্রয় নেয়া।
পাকা দালান পাবেন কোথায়?
তাইতো দেখছি। শ্মশান পর্যন্ত যেতে পারলে হত। শাশানে মরা রাখার একটা ঘর আছে।
আমি মরে গেলেও শ্মশানের ঐ ঘরে যাব না।
দেখতে দেখতে ঝড় শুরু হয়ে গেল। শোঁ শোঁ শব্দ হতে লাগল। ঝড় আসছে উল্টো দিক থেকে। পিঠে বাতাসের ঝাপ্টা লাগছে। আমাকে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। স্যান্ডেল পায়ে রওনা দিয়েছিলাম, স্যান্ডেল অনেক আগেই খুলে ফেলেছি। হাঁটছি খালি পায়ে। বাঁ পায়ে কাঁটা ফুটেছে। কাঁটা ফোঁটায় যন্ত্রণাও সুখের মত লাগছে।
ভয় লাগছে?
উহুঁ। শুধু চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
ধর আমার হাত ধর।
আমি কোন রকম দ্বিধা ছাড়া তাঁর হাত ধরলাম আর সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হল এ জীবনে আমার আর কিছু পাওয়ার নেই, চাওয়ারও নেই। আমি এখন বাস করছি সব পেয়েছির ভুবনে। আমার চোখে পানি এসে গেল।
ঝড় বাড়ছে। বাড়ুক। পৃথিবীতে প্রলয় নেমে আসুক। কিচ্ছু যায় আসে না। আমি এখন ভাল মতই কাঁদতে শুরু করেছি। ভাগ্য ভাল আমার চোখের জল তিনি দেখবেন না। চোখের জলের কারণও কোনদিন জানবেন না।
বকুল!
জ্বি।
মনে হচ্ছে আমরা একটা বিপদে পড়েছি।
কেন?
তালগাছ দেখতে পাচ্ছি না।
মনে হয় ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে।
গাছ ভাঙ্গার মত জোরালো ঝড় হচ্ছে না।
আমার কথা শেষ হবার আগেই প্রচন্ড শব্দে কাছেই কোথাও বাজ পড়ল। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বড় একটা গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ল।
বকুল।
জ্বি।
গাছ চাপা পড়ে মারা যাব বলেতো মনে হচ্ছে। কী করা যায় বলতো?
চলুন ফাঁকা মাঠে চলে যাই।
ফাঁকা মাঠেতো মাথায় বাজ পড়ার সম্ভাবনা।
আমি হেসে ফেললাম। তিনি বিস্মিত গলায় বললেন, হাসছ কেন?
আমি গম্ভীর গলায় বললাম, ভয়ে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে এই জন্যে হাসছি।
আমিতো চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
আমিও দেখতে পাচ্ছি না।
তিনি চিন্তিত গলায় বললেন, হেল্প হেল্প বলে চিৎকার করলে কেমন হয়?
খুব ভাল হয়।
চিৎকার করলেই বা কে দেখবে। কোন মানুষজনওতো দেখছি না।
চলুন আমরা হাঁটতে থাকি। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় না একসময় কাউকে পাব। কিংবা বাড়ি ঘর পাব।
মার্টির দেয়ালের লম্বাটে ধরনের একটা ঘর শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল। বিরান মাঠের মাঝে ঘর। প্রাইমারী স্কুল বা মক্তব জাতীয় কিছু হবে। ঘরের দরজা জানালা সবই খোলা। ভেতরে কিছু বেঞ্চ আছে। চাটাই আছে। ঘরটার টিনের চালের একটা অংশ ঝড় উড়িয়ে নিয়ে গেছে। অন্য অংশটিও হয়ত কিছুক্ষণের মধ্যেই উড়িয়ে নিয়ে যাবে। আমরা দুজন রাত কাটাব এমন একটা জায়গায় যে জায়গাটা কেউ কোনদিন খুঁজে পাবে না। এমন অসাধারণ রাত আমি আর কখনোই ফিরে পাব না। কখনো না, কোনদিনও না।
তিনি ভেজা দেয়াশলাই জ্বালাবার চেষ্টা করছেন। যে ভাবে সব ভিজেছে দেয়াশলাই জ্বালার কোন কারণ নেই। তবু তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আহা বেচারার বোধ হয় খুব সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে। আচ্ছা এখন একটা ভয়ংকর কাজ করলে কেমন হয়? তাকে তুমি তুমি করে বললে কেমন হয়? আমি যদি বলি, মঈন শোন, তুমি সিগারেট ধরাবে কীভাবে? ভিজে গেছে না? পাপিয়া ম্যাডাম যদি মাঝে-মধ্যে তুমি বলতে পারেন–আমি বললে অসুবিধা কী? না কোন অসুবিধা নেই। এই সুযোগ আমার জীবনে আর আসবে না। তিনি খুব চমকে উঠবেন। কিংবা কে জানে হয়ত চমকাবেন না। মানুষ একেক পরিবেশে একেক রকম আচরণ করে।
আমি তার কাছে এগিয়ে গেলাম। তিনি বললেন, কী ব্যাপার? আমি বললাম, আমার কেন জানি খুব ভয় ভয় লাগছে।
কিসের ভয়?
জানি না কিসের ভয়। আমি আপনার হাত ধরে বসে থাকব।
বেশতো বসে থাক। ঝড় কিন্তু কমে গেছে।
না কমে নি।
তুমি কাঁদছ কেন?
জানি না কেন যেন আমার খুব কান্না পাচ্ছে। আপনি কি আমাকে একটু আদর করে দেবেন? প্লীজ প্লীজ প্লীজ।
আর ঠিক তখনই মওলানা সাহেবের গলা শোনা গেল। চিন্তিত গলায় মওলানা ডাকছেন, স্যার কি আছেন? স্যার?
টর্চ লাইটের আলো পড়ছে স্কুলের বারান্দায়।
স্যার! স্যার।
তিনি বের হয়ে গেলেন। সহজ স্বাভাবিক গলায় বললেন, কে মওলানা সাহেব?
জ্বি স্যার। গজব হয়ে গেছে। গাছপালা ভেঙ্গেছে বাড়িঘর কত যে গেছে কে জানে। আমি আপনার চিন্তায় অস্থির হয়েছি। আপনার খোজে নানান দিকে লোক গেছে।
আমি ভাল আছি।
বকুল আম্মা। উনি কোথায়?
সেও ভাল আছে। তার পায়ে কাঁটা ফুটেছে। হাঁটতে পারছে না। মওলানা সাহেব!
জ্বি।
কোনখান থেকে একটি সিগারেট এনে দিতে পারবেন। মনে হচ্ছে সিগারেট খেলে মরে যাব।
