আমার কাজ হল নদীর পানির দিকে বিস্ময়, ভয় এবং আনন্দ নিয়ে তাকিয়ে থাকা। আমি হাসিমুখে ডিরেক্টর সাহেবকে বললাম, বিস্ময় ভয় এবং আনন্দ এই তিন জিনিস একসঙ্গে কী ভাবে দেখাব? তিনি বললেন, খুব সহজ। ঐ জায়গাটায় যখন তুমি দাঁড়াবে তখনই একসঙ্গে বিস্ময় এবং ভয় চলে আসবে। আর তখন আনন্দময় কিছু ভাববে তাহলেই আনন্দও চোখে ছায়া ফেলবে।
এত সহজ?
হ্যাঁ এত সহজ।
আমি দাঁড়ালাম। শট নেয়া হল। ক্যামেরা পজিশন এমন যে একসঙ্গে আমাকে দেখা যাচ্ছে, নদীর জলের ঘূর্নি দেখা যাচ্ছে। ডিরেক্টর সাহেব বললেন, আরেকটা শট নেয়া হবে। তুমি কাশফুল হাতে নিয়ে দাঁড়াও। এক পর্যায়ে কাশফুল নদীতে ছুঁড়ে মারবে। তারপর ক্যামেরা চলে যাবে তোমার মুখ থেকে কাশফুলে। তারপর দেখা যাক কী হয়। আমি তাই করলাম এবং অদ্ভুত একটা ব্যাপার হল, ফুলটা পড়ল ঠিক জলের ঘূর্নির মাঝখানে। জলের ঘূর্নির সঙ্গে ঘুরছে ডুবে যাচ্ছে, আবার ভেসে উঠে আবার ডুবে যাচ্ছে। ক্লোজ শটে ক্যামেরা ফুলকে ধরে আছে। ফুল নানান কান্ডকারখানা করছে আমরা সবাই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছি। মওলানা বললেন, মাশাল্লাহ বড়ই আচানক দৃশ্য।
এই দৃশ্য নিয়ে আমরা এতই অভিভূত, বৃষ্টি যে শুরু হয়েছে তাও বুঝতে পারি নি। যখন বোঝা গেল তখন প্রচন্ড ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। ক্যামেরা ভেজানো যাবে না। চল্লিশ লক্ষ টাকা দামের এরিফ্লেক্স ক্যামেরা। এক ফোঁটা পানিও পড়তে দেয়া যাবে না। বড় বড় ছাতা ক্যামেরার উপর ধরে দৌড়ে কোন একটা বাড়িতে আশ্রয় নিতে হবে। আমরা সবাই ছুটছি। আশে পাশে কোন বাড়িঘর নেই তবু ছুটছি।
শেষ পর্যন্ত বাড়ি একটা পাওয়া গেল। মাটির বাড়ি উপরে খড়ের ছাউনি। ক্যামেরাম্যান হাঁফ ছেড়ে বললেন, আল্লা বাঁচিয়েছেন। মওলানা সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বললেন, মানুষের বিপদে আল্লাহ পাক সব সময় সঙ্গে সঙ্গে আছেন। আমি বললাম, তাই নাকি?
মওলানা সাহেব বললেন, জ্বি আম্মা। আল্লাহ পাক মানুষের বিপদের সময় পাশে থাকেন, মানুষের আনন্দের সময়ও পাশে থাকেন।
কখন তিনি পাশে থাকেন না? তাতো আম্মা বলতে পারি না। আমার জ্ঞান বুদ্ধি অল্প।
বৃষ্টি জোরেশোরে শুরু হয়েছে। দমকা বাতাসও দিচ্ছে। সন্ধ্যা এখনো হয় নি কিন্তু কেঁপে অন্ধকার নামছে। বৃষ্টি সহজে থামবে এ রকম মনে হচ্ছে না।
ডিরেক্টর সাহেব বললেন, ঝাল মুড়ি দিয়ে চা খেতে ইচ্ছা হচ্ছে। তেলে ভাজা ঝাল মুড়ি, শুকনো মরিচ আর সিগারেট সহ আগুন গরম চা।
ইউনিটের একটা ছেলে ছাতা হাতে সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে গেল। আমি জানি কিছুক্ষণের মধ্যে মুড়ি এবং চায়ের ব্যবস্থা হবে। ডিরেক্টর সাহেব কোন কিছু চেয়েছেন আর তা তাকে দেয়া হয় নি এমন ঘটনা কখনো ঘটে নি।
ডিরেক্টর সাহেব বললেন, পাহাড়ি বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করছে। তোমরা এক কাজ কর বৃষ্টি কমার জন্যে অপেক্ষা কর। আমি ভিজতে ভিজতে রওনা হচ্ছি।
মওলানা সাহেব বললেন, ঠান্ডা লেগে জ্বরে পড়বেন।
বৃষ্টির পানিতে ঠান্ডা লাগে না, জ্বরও হয় না। চা খেয়ে শরীর গরম করে আমি নামব বৃষ্টিতে।
মওলানা বললেন, স্যারের সঙ্গে আমিও যেতাম কিন্তু আচকানটা ভিজে যাবে। আচকান ভিজলে নষ্ট হয়ে যাবে।
আচকান নষ্ট করা ঠিক হবে না। আপনি থাকুন ক্যামেরা ইউনিটকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসুন।
জি আচ্ছা।
চা চলে এল। চায়ের সঙ্গে মুড়ি ভাজা। শুকনো মরিচ ভাজা।
ডিরেক্টর সাহেব বৃষ্টিতে নামার প্রস্তুতি নিলেন। জুতা খুলে ফেললেন, প্যান্ট গুটিয়ে নিলেন। আমি তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম এবং প্রায় অস্পষ্ট গলায় বললাম, আমি আপনার সঙ্গে যাব।
তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি যাবে? ভাল বৃষ্টি হচ্ছেতো।
হোক। আমি একা একা এখানে থাকব না।
একা কোথায় সবাইতো আছে।
আপনি চলে গেলে আমিও চলে যাব।
বেশতো চল। তোমার ঠান্ডার ধাত নেইতো? বৃষ্টিতে ভিজে জ্বরে পড়বে?
আপনি বোধ হয় ভুলে গেছেন যে বৃষ্টির পানিতে ঠান্ডা লাগে না।
আমার কথাই আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছ?
হ্যাঁ।
চল বৃষ্টিতে নামা যাক। শোন একটা কাজ করা যাক। তুমি বরং হাতে একটা ছাতা নাও। আমি ভিজতে ভিজতে যাই তুমি ছাতা হাতে পেছনে পেছনে আস।
না আমি ছাতা নেব না।
আমরা বৃষ্টিতে নেমে পড়লাম। আমি ভেবেছিলাম সবাই খুব অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকাবে। কেউ তাকাল না। যেন ঘটনাটা খুব সহজ ও স্বাভাবিক। ডিরেক্টর সাহেব নিশ্চয়ই এর আগেও অনেক বৃষ্টিতে ভিজেছেন। আমার মত আরো অনেকেই তাঁর সঙ্গী হয়েছে।
বৃষ্টির ফোঁটা অসম্ভব ঠান্ডা। আরেকটু ঠান্ডা হলেই বরফ হয়ে যেত এমন অবস্থা। ফোঁটাগুলিও সাইজে বড়। পাহাড়ি বৃষ্টির এই বুঝি ধরন।
বকুল বৃষ্টিতে ভিজতে কেমন লাগছে?
খুব ভাল লাগছে।
তুমি কি প্রায়ই বৃষ্টিতে ভেজ?
আমার খুব ইচ্ছা করে কিন্তু মা দেয় না। আমি আবার মার সব কথা শুনি। আমি খুব মাতৃভক্ত মেয়ে।
মাতৃভক্তি খুব ভাল, কিন্তু একটা কথা খেয়াল রাখবে–প্রকৃতি মানুষের জন্যে কিছু সহজ আনন্দের ব্যবস্থা করে রেখেছে মাতৃভক্তি, পিতৃভক্তি কোন ভক্তির কারণেই নিজেকে এই সব সহজ আনন্দ থেকে বঞ্চিত করবে না।
আচ্ছা যান করব না।
বৃষ্টির ফোঁটাগুলি কেমন সুচের মত গায়ে বিঁধছে দেখছ?
জ্বি দেখছি।
বৃষ্টিতে নামলেই আমার কী করতে ইচ্ছা করে জান?
না জানি না।
সিগারেট খেতে ইচ্ছে করে। সেটা সম্ভব না। ওয়াটার প্রক সিগারেট থাকলে ভাল হত, ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সিগারেট টানতে টানতে হাঁটতাম।
