মা সেজেগুজে নেমে আসছেন। তাঁর মুখ ভর্তি হাসি। তিনি খুকিদের মত আহ্লাদী গলায় বললেন—বকু আমি কাহিনী-কাতানটা পরলাম। মা ডিরেক্টর সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, মঈন ভাই আমাকে কেমন লাগছে? ডিরেক্টর সাহেব বললেন, আপনাকে সুন্দরবন সুন্দরবন লাগছে।
কেন?
বাঘ ভালুক আপনাকে ঘিরে রেখেছে এই জন্যে।
উফ মঈন ভাই আপনি যে কী রসিকতা করতে পারেন। এই শাড়িটা আমাকে বকুলের বাবা কিনে দিয়েছিল। এ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজার থেকে যেদিন প্রমোশন পেয়ে সেলস ম্যানেজার হল সেদিন।
খুব সুন্দর শাড়ি। চলুন রওনা হওয়া যাক। পাহাড়ি ঢলের পানি নাকি বেশিক্ষণ থাকে না।
সোমেশ্বরী নদীর কাছে গিয়ে আমরা হতভম্ব। একী কান্ড! নদী ফুলে ফেঁপে একাকার। সমুদ্রের গর্জনের মত শোঁ শোঁ গর্জন আসছে। মাঝে মাঝে প্রবল স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা পাথরে পাথরে ঠোকাঠুকি হয়ে কড় কড় আওয়াজ হচ্ছে। বড় বড় গাছ নদীতে ভেসে আসছে। সেই সব গাছ ধরার জন্যে গ্রামের মানুষজন জড় হচ্ছে। যে গাছের ডালে প্রথম দড়ি পরিয়ে দিতে পারবে সেই হবে গাছটার মালিক। দড়ি পরানোর কর্মকান্ড মোটেই সহজ না, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে নামতে হচ্ছে।
বকুল আম্মা!
তাকিয়ে দেখি মওলানা সাহেব আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। আজ তিনি আচকান পরেছেন। চুল কেটেছেন বলে মনে হচ্ছে। তাঁকে অন্য রকম দেখাচ্ছে। তাকে খুবই উৎসাহী বলে মনে হচ্ছে।
বুঝছেন আম্মা, একবার এক হাতী পানিতে ভেসে এসেছিল। হাতীর সঙ্গে হাতীর বাচ্চা। মা হাতীটা তার বাচ্চাটাকে শুড় দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে রেখেছিল।
তারপর!
এই অঞ্চলের মানুষজন আম্মা খুব সাহসী, তারা দড়ি, চেইন, কাঠ দিয়ে হাতী আর তার বাচ্চাটাকে উদ্ধার করে ফেলে।
বলেন কী?
দুটা হাতীই গুরুতর জখম হয়েছিল। বাচ্চাটা মারা যায়। মা হাতী বনে চলে যায়। তবে আম্মা অদ্ভুত ব্যাপার, প্রতি বৎসর ঠিক যেদিন বাচ্চাটা মারা গিয়েছিল সেদিন মা হাতীটা বন থেকে নেমে আসত। বাচ্চাটা যে জায়গায় মারা গিয়েছিল সেই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে থেকে কাঁদত।
বাচ্চাটা কবে মারা গিয়েছিল?
১৯শে চৈত্র।
আপনি নিজে দেখেছেন?
জ্বি আম্মা দেখেছি।
এখনো আসে?
গত তিন বৎসর ধরে আসতেছে না। সম্ভবত মারা গেছে, কিংবা অন্য সন্তানাদি হয়েছে।
মওলানা সাহেব খুব ব্যস্ত হয়ে ইউনিটের কাজে লেগে গেলেন। নাশতা তৈরি হয়েছে। সেই নাশতা হাতে হাতে পৌঁছে দেয়া। চায়ের কাপ তুলে দেয়া। তাঁর ব্যস্ততার সীমা নেই। নাশতা হচ্ছে পরোটা, ডালভাজি, একটা সিদ্ধ ডিম, একটা কলা। মা তার এবং আমার কলাটা বদলাবার জন্যে গিয়েছেন। দাগ ধরা কলা তিনি বদলে নেবেনই।
আমি খুব অবাক হয়ে ল্কখ্য করলাম ডিরেক্টর সাহেব একটু দূরে চায়ের একটা মগ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখে আশ্চর্য ধরনের বিষণ্ণতা। তিনি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নদীর দিকে। তিনি এক পলকের জন্যেও দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছেন না। এক পলকের জন্যে দৃষ্টি ফেরালেও তিনি দেখতে পেতেন আমি নদী দেখছি না, আমি তাকিয়ে আছি তার দিকে।
নাশতা খাওয়া শেষ হওয়া মাত্র সোহরাব চাচা বললেন, একটা অত্যন্ত জরুরি ঘোষণা। পাহাড়ি নদীর পারে একটা শট নেয়া হবে, আগে যেখানে শট নেয়া হয়েছিল সেখানে, কাশবনের কাছে। কাজেই ইউনিট চলে যাবে, দৃশ্যটায় আর্টিস্ট থাকবে শুধু একজন বকুল। বকুল তুমি যাও স্যারের কাছ থেকে দৃশ্যটা বুঝে নাও। মেকাপম্যান ইউনিটের সঙ্গে চলে যাবে। মেকাপ হবে অন লোকেশন।
আমি ডিরেক্টর সাহেবের কাছে গেলাম। তিনি বললেন, বকুল একটু কষ্ট করতে হবে। অনেক দূর হাঁটতে হবে। পারবে না?
জ্বি পারব।
নদীতে হঠাৎ যৌবন দেখে দৃশ্যটা আমার মাথায় এসেছে। দিলুতো আগেও এই নদীর কাছে এসেছে। তারপর হঠাৎ একদিন এসে দেখে নদীর এই অবস্থা। তার নির্জের জীবনের সঙ্গে দৃশ্যটি মিলে যাচ্ছে। সে অবাক হয়ে নদী দেখবে। নিজের অজান্তেই সে নদীর পারের খুব কাছাকাছি চলে যাবে। দৃশ্যটা এ ভাবে নেয়া হবে যেন মনে হয় এই বুঝি সে পড়ে গেল নদীতে।
আমার পোষাক কী হবে?
এখন যা পরে আছ তাতেই চলবে। শুধু গায়ে শাদা একটা চাদর জড়িয়ে নেবে।
মার খুব ইচ্ছা ছিল সঙ্গে যাবার। তিনি শেষ পর্যন্ত সাহস করলেন না। তবে মওলানা সাহেব আমাদের সঙ্গে রওনা হলেন আজ শুক্রবার। তার জুম্মার নামাজ আছে— সেটা নিয়ে তাকে তেমন চিন্তিত মনে হল না।
সকাল বেলা রোদ ছিল। আমরা রওনা হবার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করল। প্রকৃতি কী সুন্দর যে দেখাচ্ছে। ডিরেক্টর সাহেব বারবার চিন্তিত এবং বিরক্ত মুখে মেঘের দিকে তাকাচ্ছেন। মেঘ হলে শট নেয়া সমস্যা হবে। ভাল শটের জন্যে সানলাইট চাই। তবে হাইস্পীড ফিল্ম ব্যবহার করলে এই সমস্যার সমাধান হবে। অল্প আলোয় কাজ করার জন্যে হাইস্পীড ফিল্ম নিশ্চয়ই আনা হয়েছে। আমি নিজের মনে হাঁটছি–অল্প কিছুদিন কাজ করেই অনেক ফিল্মের কথা শিখে ফেলেছি। কেমন যেন হাসি পাচ্ছে।
শট নেয়া হল।
কেমন হল আমি কিছুই জানি না। ভয়ে আমার আত্মা কেঁপে যাচ্ছিল। এমন একটা জায়গায় আমাকে দাঁড় করানো হল যার ঠিক নীচ দিয়ে সোঁ সোঁ করে স্রোত যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল এই বুঝি পার ভেঙ্গে আমি নীচে পড়লাম। মওলানা সাহেব বললেন, আম্মা কোন ভয় নাই আমি আল্লাহপাকের পাক নাম ইয়া আহাদু পড়ে ফু দিয়ে দিয়েছি। তিনি আপনাকে রক্ষা করবেন।
