মিস রুমাল!
সোহরাব চাচা টিপট হাতে ঘরে ঢুকলেন। হাসি মুখে বললেন, তোমার মা কই?
আমি বললাম, জানি না চাচা। আমার এই মাত্র ঘুম ভেঙ্গেছে।
কাল রাতে ঝড় কেমন দেখলে?
খুব ভাল দেখলাম।
বিরাট ঝড় হয়েছে। গাছ পালা, কাচা বাড়ি-ঘর ভেঙ্গে একাকার হয়েছে। সোমেশ্বরী নদীতে বান ডেকেছে।
বা! কী ইন্টারেস্টিং।
স্যার সোমেশ্বরী নদীর বান দেখতে যাবেন। তুমি যাবে কি-না জানতে চেয়েছেন।
অবশ্যই যাব।
তাহলে চা খেয়ে তৈরি হয়ে নাও।
নাশতা খাব না?
নাশতা নদীর পারে খাওয়া হবে।
সোহরাব চাচা চায়ের পট টেবিলে নামিয়ে রাখলেন। আমি বললাম, আপনি নিজে সব সময় চা নিয়ে আসেন আমার খুবই লজ্জা লাগে চাচা।
লজ্জার কিছু নাই মা। হাত মুখ ধুয়ে চা খাও। খালি পেটে খেও না। টোস্ট বিসকিট আছে।
থ্যাংক য়্যু চাচা। থ্যাংক য়্যু ভেরি মাচ।
সোহরাব চাচা চলে গেছেন। আমি খাটে পা ঝুলিয়ে বসে চা খাচ্ছি। আমার কাছে মনে হচ্ছে কী অসাধারণ একটা দিনই না আজ শুরু হতে যাচ্ছে। সোমেশ্বরী নদীতে বান ডেকেছে। আমি এবং তিনি নদীর বান দেখতে যাচ্ছি–
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে এল বান
খুব সুন্দর একটা শাড়ি পরতে ইচ্ছা করছে। আমার কোন শাড়িই নেই। মা আমাকে শাড়ি কিনে দেন না। তার ধারণা, শাড়ি পরলেই আমাকে বড় বড় লাগবে। চারদিক থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকবে। গুন্ডা ছেলেরা পেছনে লাগবে। সেইসব গুন্ডাদের কেউ খালি হাতে ঘুরবে না ওদের হাতে থাকবে বোতল ভর্তি এসিড। প্রেম করতে রাজি না হলেই বোতল ছুঁড়ে মারবে।
শাড়ি পরলে র শাড়ি পরতে হবে বিশ্রী জবরজং সব শাড়ি। কড়া রঙ। উদ্ভট ডিজাইনের ছাপ। মার সবচে প্রিয় শাড়ির একটায় বাঘ, ভালুক, সিংহের ছবি। শাড়ির নাম কাহিনী-কাতান। শাড়ির গায়ে বাচ্চাদের রূপকথা। কোন সুস্থ মাথার মহিলার এই শাড়ি পরার কথা না, মা পরবেন। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে পরবেন। সম্ভবত এই শাড়ির সঙ্গে তার কিছু সুখ স্মৃতি আছে। হয়ত কোন একদিন বাবা বলেছিলেন, (নিশ্চয়ই ঠাট্টা করে বলা, কিংবা মাকে খুশি করার জন্যে বলা) আরে বাঘ-ভালুক মার্কা শাড়িতে তোমাকেতো দারুণ লাগছে।
মাকে ভজিয়ে ভাজিয়ে সিম্পল কোন শাড়ি বের করার জন্যে মার খোঁজে নীচে নেমে মন খারাপ হয়ে গেল। ইউনিটের সবাই সোমেশ্বরী নদীর বান দেখার জন্যে যাচ্ছে। আজ নাকি সবাই নদীর পারে বসে নাশতা করবে। আমি বললাম, মা আমার শরীর ভাল লাগছে না, আমি যাব না।
মা বিস্মিত হয়ে বললেন, তুই যাবি না মানে? সবাই যাচ্ছে তুই যাবি না কেন?
আমার শরীর ভাল না, এই জন্যে আমি যাব না।
অবশ্যই তুই যাবি। তোকে একা এখানে রেখে যাব? তোর কি মাথাটা খারাপ হয়েছে! যা কাপড় বদলে আয়।
না কাপড় বদলাব না, যে কাপড়ে আছি সেই কাপড়ে যাব।
রাতের বাসি কাপড় পরে যাবি?
হুঁ।
এমন একটা চড় লাগাব না…!
লাগাও।
আমি মুখ গোঁজ করে বসে আছি। কিছুই আমার মনে ধরছে না। একা একা শুয়ে থাকতে পারলে ভালো লাগত। সবাই রেস্ট হাউস ছেড়ে চলে যাবে—— আমি একা থাকব এর আনন্দ আলাদা।
বকুলের কী হয়েছে? মুখ অন্ধকার কেন?
ডিরেক্টর সাহেব কখন এসে, আমার সামনে দাড়িয়েছেন বুঝতে পারি নি। আমি চট করে উঠে দাঁড়ালাম, বিনীত ভঙ্গিতে হাসলাম। আশ্চর্য কাণ্ড আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। আমার পা কাঁপছে।
কাল রাতের ঝড় কেমন দেখলে?
ভাল।
কী প্রচন্ড শব্দে বাজ পড়ছিল শুনেছ? আমি ভয়ে অস্থির। এই বুঝি মাথায় পড়ল। বজ্রাঘাতে মৃত্যু খুব খারাপ।
খারাপ কেন?
লোক প্রবাদ হচ্ছে ভয়াবহ পাপীরা বজ্রাঘাতে মারা যায়। সিরাজদ্দৌলাকে যে খুন করেছিল—মিরণ, সে বজ্রাঘাতে মারা যায়।
এইসব আপনি বিশ্বাস করেন?
আরে দূর এইসব বিশ্বাস করব কেন। কত ছোট ছোট অবোধ শিশু বজ্রাঘাতে মারা পড়ে। এরা কী পাপ করবে? এদের সবচে বড় পাপ সম্ভবত কেড়ে ছোট ভাইয়ের লজেন্স নিয়ে নেয়া। সোমেশ্বরী নদীর বান দেখতে তুমি যাচ্ছ না?
যেতে ইচ্ছা করছে না।
সব সময় নিজের ইচ্ছাকে দাম দিও না। কালেক্টিভ ইচ্ছাকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে, যদি গুরুত্ব না দাও তাহলে হঠাৎ দেখবে তুমি দল থেকে আলাদা
হয়ে পড়েছে। তখন ভয়াবহ সমস্যা হবে।
কী সমস্যা?
মানুষের ডিএনএ-এর ভেতর একটা ইনফরমেশন ঢুকিয়ে দেয়া আছে। ইনফরমেশনটা হচ্ছে— কখনো একা থেকো না। সব সময় দলে থাকবে। এবং দলের একজনকে মান্য করবে। মানুষ যখন এই পদ্ধতিতে কাজ করতে অস্বীকার করে তখনই তার মাথা আউলা হতে থাকে।
ও।
আচ্ছা দেখি তোমার কেমন বুদ্ধি, বলতো–কেন মানুষের ডিএনএ তে এই তথ্য ঢুকানো যে মানুষকে দলে থাকতে হবে একা থাকা যাবে না। দলের একজনকে মান্য করতে হবে?
জানি না।
খুব সহজ কারণ। প্রাচীন মানুষকে বনে জঙ্গলে থাকতে হত। হিংস্র জন্তু জানোয়ারের ভয়ে দলবদ্ধ ভাবে চলতে হত। সেই কারণে প্রকৃতি মানুষের মাথার ভেতর ইনফরমেশনটা দিয়ে দিয়েছে।
ও।
মানুষের সমস্যা হচ্ছে সে একই সঙ্গে দলে থাকতে চায় আবার একই সঙ্গে দল থেকে আলাদা হয়ে বাস করতে চায়।
প্রকৃতি ডিএনএতে ইনফরমেশন দিয়ে দিয়েছে বলেই কি দলপতি হিসেবে আমরা সবাই আপনাকে মান্য করছি?
হতে পারে। মানুষের স্বভাবই হচ্ছে নিজেদের মধ্যে একজন দলপতি ঠিক করে ফেলা। আমরা যে এত রাজা ভক্ত জাত তা কী জন্যে? একই কারণে। পশুদের মধ্যেও এই দলপতি ব্যাপারটা আছে। মানুষের সঙ্গে পশুদের তেমন কোন প্রভেদ নেই।
