মাকে একগাদা কৈফিয়ত দিতে হবে। কী বলব ঠিক করা আছে। যা বলব সব সত্যি বলব। কিন্তু সেই সত্যের মাঝখানে ধুলির কণার মত একদানা মিথ্যা থাকবে। সত্য দিয়ে সেই মিথ্যা ঢাকা বলে মিথ্যাটা কারোর চোখ পড়বে না। মা জানতে চাইবেন, কোথায় ছিলি এতক্ষণ?
আমি বলব, সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে?
তার সঙ্গে কী?
আমি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলব, আমি তাকে গান শুনাচ্ছিলাম মা। উনি খুব গান পাগল মানুষ। উনিতো আগেই খানিকটা পাগল ছিলেন, গান শুনিয়ে আমি তাকে আরো পাগল করে দিয়েছি। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখ—একা একা বৃষ্টিতে ভিজছে।
পাহাড়ি অঞ্চলের বৃষ্টি
পাহাড়ি অঞ্চলের বৃষ্টি না-কি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এই ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি–এই নেই–পাহাড়ি বৃষ্টির এটাই না-কি ধরন। অথচ কাল সারারাতই বৃষ্টি হয়েছে। যতবার ঘুম ভেঙ্গেছে ততবারই শুনেছি বৃষ্টির শব্দ। পাকা দালানে বৃষ্টি বোঝা যায় না। এখানে বেশ বোঝা যাচ্ছে। বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসও হচ্ছে। পায়ের কাছের জানালা খোলা। খোলা জানালায় বৃষ্টির ছাট আসছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল ছোটখাট ঝড়ের মত হচ্ছে। গাছের পাতায় সোঁ সোঁ গর্জন। ঘর পুরোপুরি অন্ধকার, ইলেকট্রিসিটি নেই। টেবিলের ড্রয়ারে মোমবাতি আছে। বাতাসের যে মাতামাতি, মোমবাতি জ্বলবে না। মাঝে মাঝে বিদ্যুত চমকানোয় ঘরের ভেতরটা আলো হয়ে উঠছে। বিদ্যুৎ চমকানো শেষ হওয়া মাত্র অন্ধকার আরো বেড়ে যাচ্ছে। বাজ পড়ছে প্রচন্ড শব্দে। মনে হচ্ছে বাজগুলি মাথার উপর পড়ার উপক্রম করছে। এই পৃথিবীতে তিনটি জিনিস আমি প্রচন্ড ভয় পাই। শুয়োপোকা, মাকড়সা এবং বজ্রপাতের শব্দ। শুয়োপোকা এবং মাকড়সার হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। কাউকে বললেই ঝাঁটা এনে মেরে দূর করে দেবে, কিন্তু বজ্রপাতের হাত থেকে বাঁচার উপায় নেই। ছোটবেলায় দুহাতে শক্ত করে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে থাকতাম এবং একটু পর পর জিজ্ঞেস করতাম— বাজ পড়া শেষ হয়েছে? ভয়ে কাতর হওয়া একটা বালিকার প্রশ্ন, কিন্তু বাবা এই প্রশ্ন শুনে খুবই মজা পেতেন। হাসি মুখে বলতেন, আমি কি করে বুঝব বাজ পড়া বন্ধ হয়েছে কি-না? বাজগুলি কি আমার কারখানায় তৈরি হচ্ছে?
আজো আমি ভয়ে অস্থির। শরীর গোল করে শুয়ে আছি। দুহাতে কান ঢেকে আছি। তাতে কোন লাভ হচ্ছে না। মাকে জড়িয়ে ধরে থাকলে লাভ হত। সেটা করা যাচ্ছে না কারণ আমি অন্য বিছানায় শুয়েছি। ইচ্ছা করে শুই নি— মা সরিয়ে দিয়েছেন। তিনি কঠিন গলায় বলেছেন, তুই আমার সঙ্গে শুবি না। ঐ খাটে যা। আমি কথা বাড়াইনি। পাশের খাটে শুয়েছি। তখন যদি জানতাম শেষ রাতে এমন ঝড় বৃষ্টি হবে তাহলে মাকে রাজি করিয়ে তার সঙ্গেই ঘুমুতাম।
বকু বকু!
আমি দুহাতে কান চেপে রাখলেও মার গলা শুনলাম। একবার ভাবলাম জবাব দেব না, তারপরেও বললাম, কী?
আয় আমার কাছে চলে আয়।
না।
বকু কথা শোন আয়।
আমার ভয় লাগছে না মা।
আমার ভয় লাগছে।
আমি বললাম, তোমার যদি ভয় লাগে তুমি আমার খাটে আসবে। আমি কেন যাব?
মা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বালিশ এবং তাঁর বিখ্যাত ভালবাসা-কম্বল নিয়ে চলে এলেন। এমন ভাবে লাফিয়ে খাটে উঠলেন যে মনে হল সত্যি ভয় পাচ্ছেন।
বকু! খুবই ভয় পেয়েছি।
আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম মা সত্যি ভয় পাচ্ছেন। তার হাত পা কাঁপছে। বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছেন। ছোট বাচ্চারা আতংকে অস্থির হয়ে যা করে তিনি তাই করছেন। গুটিশুটি মেরে একেবারে ছোট হয়ে গেছেন।
মা কী হয়েছে?
ভয় পেয়েছি।
ঝড় দেখে ভয় পেয়েছ?
না অন্য কিছু দেখেছি।
অন্য কিছুটা কী?
সকালে বলব।
সকালে না, এখনই বল।
মা ভীত গলায় বললেন, যখন ঝড় শুরু হল ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেল। তখন….
তখন কী?
আমি জানালাটার দিকে তাকিয়ে আছি। বৃষ্টির ছাট আসছে। উঠে গিয়ে বন্ধ করব কি-না ভাবছি তখন হঠাৎ মনে হল জানালা ধরে কে যেন দাঁড়িয়ে। অন্ধকার কিছু বোঝা যায় না কিন্তু একটা মেয়ে মানুষ যে জানালা ধরে দাঁড়িয়ে আছে সেটা বোঝা যায়। বেঁটে খুব রোগা একটা মানুষ। শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে আর অল্প অল্প মাথা দুলাচ্ছে। ছোট বাচ্চারা যেমন শিক ধরে মাথা দুলায় সে রকম।
বাঁদর নাতো মা? এই অঞ্চলে বাঁদর আছে। পরশু রাতে জাম গাছে আমি একটা বার দেখেছি।
আমিও বাঁদর ভেবেছিলাম কিন্তু….
কী?
হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকাল তখন দেখলাম, বাঁদর না মানুষ।
মানুষ কী ভাবে হবে মা? দোতলার জানালা। নীচে দাঁড়াবার জায়গা নেই।
বকু কথা বলিস না চুপ করে থাক।
মা, তোমার কি ধারণা তুমি ভূত দেখেছ?
চুপ করে থাকতে বলেছি—চুপ করে থাক।
আশ্চর্য, মা থরথর করে কাঁপছেন। শুধু যে কাঁপছেন তাই না। তাঁর ঘাম হচ্ছে। আমি বললাম, পানি খাবে মা? পানি এনে দেব?
না।
ভূতটা কেমন ছিল বলতো?
মা বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। আমি দুহাতে শক্ত করে মাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, তুমি নিশ্চিত মনে ঘুমাওতো মা আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে আছি।
আমি তাকে জড়িয়ে ধরে থাকলাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি নিজেই জানি না। ঘুম ভেঙ্গে দেখি ঘর ভর্তি আলো ঝলমল করছে। রোদ উঠে এসেছে বিছানায়। মা বিছানায় নেই। আমি ঠিক করলাম রাতের প্রসঙ্গে মার সঙ্গে আলাপ করব না। তিনি লজ্জা পাবেন। আমার বিছানা থেকে নামতে ইচ্ছা করছে না। আজ সারাদিন বিছানায় গড়াগড়ি করে কাটিয়ে দিলে কেমন হয়? মাসের মধ্যে একটা দিন থাকা দরকার বিছানায় গড়াগড়ি খাবার জন্যে। সেই বিশেষ দিনগুলিতে কেউ বিছানা ছেড়ে নামবে না। বাচ্চারা বিছানায় হুটোপুটি খাবে, বড়রা শুয়ে শুয়ে খবরের কাগজ পড়বে কিংবা গল্পের বই পড়বে।
