কী বলে দেবেন?
বলব যে মিস রুমালী আপনার প্রশংসায় খুব খুশি হয়েছে?
আমি কতটা খুশি হয়েছি সেটাতো আপনি বলতে পারবেন না। কাজেই কফির কাপ নিয়ে আমাকেই যেতে হবে। তবে আপনি যদি মনে করেন উনার কাছে একা একা যাওয়া বিপদজনক তাহলে ভিন্ন কথা।
বিপদজনক হবে কেন?
আমারওতো সেটাই কথা, তবে উনার কাছে কফি নিয়ে যাচ্ছি শুনে আপনি যে ভাবে চমকে উঠলেন সেখান থেকে ধারণা হল— হয়ত উনার কাছে যাওয়া বিপদজনক। উনি হয়তোবা ঘাতক ট্রাক। আমার মত মেয়েদের একশ হাত দূরে থাকা দরকার।
সোহরাব চাচা শুকনো মুখে বললেন, তুমি অপেক্ষা কর। কফি বানানো হোক তুমি নিয়ে যাবে।
থ্যাংক য়্যু।
তোমার মার শরীরের অবস্থা কী?
অবস্থা বেশি ভাল না, মানুষের আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়, মার পা ফুলে বটগাছ হয়ে গেছে।
যাও মার কাছে গিয়ে বোস। কফি তৈরি হলে তোমাকে খবর দেব।
আমি মার কাছে বসব না। উঠানে হাঁটাহাঁটি করব। আপনি মার কফি তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেবেন।
আমি উঠোনে নেমে এলাম। জোনাকি পোকার ঝাকের দিকে এগুচ্ছি। হাতে একটা টর্চ লাইট থাকলে হত। ওদের গায়ে আলো ফেলে দেখতাম ওরা কী করে। সব অন্ধকারের পোকাই আলোকে ভয় করে। ওরা কী করবে— আলো নিয়ে যাদের চলা ফেরা তারা আলোকে ভয় করবে কেন?
ডিরেক্টর সাহেবের ঘরের দরজা খোলা। আমি দুকাপ কফি হাতে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছি। কিছুক্ষণ আগে খুব ছেলেমানুষী একটা কাজ করেছি—আই লাভ ইউ আই লাভ ইউ বলে উনার কফির কাপে ফু দিয়ে দিয়েছি। ভাবটা এ রকম যেন এই কফি খেলেই উনি বুঝতে পারবেন রুমালী নামের একটা মেয়ে তার জন্যে অস্থির হয়ে আছে। ঘরে ঢুকতে সাহস পাচ্ছি না, আবার চলেও যেতে পারছি না হাতের কফি ঠান্ডা হচ্ছে। ঠান্ডা কফিতে চুমুক দিলে তার নিশ্চয়ই মেজাজ খারাপ হবে। আমি তার মেজাজ খারাপ করতে চাই না। ঘরের ভেতর গান হচ্ছে–ইংরেজি গান। সুরটা সুন্দর, কথাগুলি পরিষ্কার। এই গানটা তাঁর ঘরে আগেও বাজতে শুনেছি। নিশ্চয়ই তাঁর প্রিয় গান। গানটা গলায় তুলে নিতে পারলে ভাল হয়। তার আশে পাশে যখন থাকব তখন অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে দুলাইন গেয়ে ফেলব। তিনি চমকে বলবেন—আরে তুমি এই গান কোথায় শিখলে? আমি জবাব দেব না, মুখ টিপে হাসব। হাসার সময় আমার থুতনিটা ভেতরের দিকে রাখব। কারণ ক্যামেরাম্যান বলেছেন আমাকে সবচে সুন্দর দেখা যায় যখন আমার থুতনি ভেতরের দিকে থাকে। মুশকিল হচ্ছে ইংরেজি গানগুলি সহজে গলায় বসতে চায় না। মনে হয় গানগুলিরও নিজস্ব জীবন আছে। এরাও গাছের মত। এক মাটির গাছ অন্য মাটিতে বাঁচে না। এক দেশের গান অন্য দেশের মেয়ের গলায় বসে না। আমি কান পেতে আছি— গানের কথাগুলি ধরতে পেরেও পারছি না।
Down the way
Where the nights are gay
And Sun Shines daily on the mountain top.
I took a trip
On a sailing ship
And when I reached Jamaica I made a stop.
But I am sad to say
I am on my way
wont be back for many a day
আমি দরজা ঠেলে ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালাম। তিনি চেয়ারে বসে। তাঁর হাতে কী একটা বই। মনে হচ্ছে বইটা খুব মন দিয়ে পড়ছিলেন। মাথা বই-এ ঝুঁকে আছে। তিনি মাথা তুলে আমাকে দেখে বললেন—এই যে বকুল। এসো। যেন তিনি জানতেন আমি কফি নিয়ে আসছি। কফির জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। আমি জানি তিনি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আমার হাত থেকে কফির কাপ নেবেন। ঠান্ডা কফিতে চুমুক দিয়ে তৃপ্তির স্বরে বললেন–Excellent কফি। মানুষটা সব সময় স্বাভাবিক, এইটাই তাঁর বিশেষত্ব। কিংবা কে জানে এটা হয়ত কোন বিশেষত্ব না। আমি মানুষটার উপর বিশেষত্ব আরোপ করতে চাইছি বলে এরকম ভাবছি।
তিনি হাত থেকে কফির কাপ নিয়ে বললেন, দেখেই মনে হচ্ছে কফিটা চমৎকার। তিনি আগ্রহের সঙ্গে চুমুক দিলেন এবং তৃপ্তির স্বরে বললেন, Excellent. তাঁর সঙ্গে সঙ্গে আমিও কফির কাপে চুমুক দিলাম। মোটেই Excellent কিছু না। ঠান্ডা তিতকুটে একটা বস্তু।
বকুল তোমার খবর কী?
জ্বী, খবর ভাল।
তিনি হাত বাড়িয়ে ক্যাসেট প্লেয়ার বন্ধ করতে করতে বললেন, আমার মেজাজ যে কী রকম খারাপ সেটা কি বোঝা যাচ্ছে?
জ্বি না।
খুবই খারাপ। শুটিং পুরোপুরি বন্ধ করে বসে আছি। আবার কবে শুরু হবে সেটাও বুঝতে পারছি না। ফরহাদ আমাকে একটা চিঠি লিখে গেছে— সেই চিঠি পড়লে যে-কোন স্বাভাবিক মানুষের ব্রেইন ডিফেক্ট হবার কথা….।
আপনার হচ্ছে না? মানুষ হিসেবে আমি বোধ হয় খুব স্বাভাবিক না। ফরহাদের চিঠি একবার পড়েছি পড়ে ফাইলে রেখে দিয়েছি।
আমার চিঠিটা খুব পড়তে ইচ্ছা করছে। পড়তে চাইলেই তিনি আমাকে পড়তে দেবেন কি-না তা বুঝতে পারছি না। মানুষটাকে আমি এখনো তত ভাল ভাবে জানি না। আমি কেন তার ঘরে এসেছি তিনি কি তা জানেন? আমার অস্থিরতা কি তিনি বুঝতে পারছেন? তাকে কিছুই জানতে দেয়া যাবে না। কাজেই আমাকে যা করতে হবে তা হচ্ছে অতি দ্রুত কোন একটা অজুহাত বের করতে হবে। তাঁর ঘরে আসার পেছনে বিশ্বাসযোগ্য কোন অজুহাত। কিচ্ছু মাথায় আসছে না। সবচে বড় সমস্যা হবে তিনি নিজে থেকে যদি জিজ্ঞেস করে ফেলেন-বকুল আমার কাছে কেন এসেছ? এটা জিজ্ঞেস করা মানেই হল তাঁর মনে খটকা লেগেছে। আর তখন যদি আমি কোন জবাব দিতে না পারি তখন সেই খটকা আরো বাড়বে।
