বকুল!
জ্বি।
আমার কাছে কি কোন কাজে এসেছ না এমি গল্প করতে এসেছ?
আমি মাথা নিচু করে বললাম, আমাকে মা পাঠিয়েছে।
ও আচ্ছা।
মার ধারণা কফি নিয়ে আপনার কাছে যদি আসি আপনি খুব খুশি হবেন। আপনি খুশি হলে আমার জন্যে খুব সুবিধা হবে। আপনার পরের ছবিতেও হয়ত আমি সুযোগ পাব। সুযোগ সুবিধার ব্যাপারগুলি মা খুব ভাল বোঝেন।
তিনি হাসছেন। যাক, আমার কথাটা তাহলে তার বিশ্বাস হয়েছে। অবশি। আমি যা বলার বিশ্বাসযোগ্য ভাবেই বলেছি।
মাকে কি তুমি অপছন্দ কর?
না উনাকে খুবই পছন্দ করি। উনার কিছু কিছু বোকামি আমার কাছে অসহ্য লাগে।
কিছু কিছু বোকামিতো সবার মধ্যেই থাকবে। হান্ড্রেড পার্সেন্ট বুদ্ধিমান বলে কিছু নেই। সব বুদ্ধিতেই খাদ মেশানো থাকে। কারও হচ্ছে আঠারো ক্যারেট বুদ্ধি, কারো বাইশ ক্যারেট।
আমি যে বসে আছি আপনার কি বিরক্তি লাগছে?
না বিরক্তি লাগবে কেন?
লাগলেও কিচ্ছু করার নেই। মা বলে দিয়েছে আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করতে।
গল্প কর শুনি।
আমি গল্প করতে পারি না। আপনি গল্প করুন আমি শুনি। আপনার গল্প করতে ইচ্ছা না করলে গল্প করতে হবে না। আপনি আপনার কাজ করুন, বই পড়ুন। আমি কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে যাব–মাকে গিয়ে বলব, মা অনেক গল্প করেছি, উনাকে গানও শুনিয়েছি। গান শুনে উনি খুব খুশি হয়েছেন।
তুমি গান জান?
জ্বি, জানি।
তাহলে শোনাও একটা গান।
জ্বি না, আমি গান শুনাব না। আমি মোটামুটি ধরনের গান জানি। যে আমার গান শোনে সে খুশিও হয় না আবার বিরক্তও হয় না। কাজেই আমার শুনাতে ইচ্ছা করে না।
ও আচ্ছা তাহলে থাক। তিনি একটা সিগারেট ধরালেন। আমি আমার মিথ্যা বলার ক্ষমতা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হলাম। একবার মিথ্যা বলা শুরু করলে সত্যি বলা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আমার বেলায় তাই হচ্ছে— আমি একের পর এক মিথ্যা বলে যাচ্ছি। আমার গান প্রসঙ্গে আমি যা বললাম তা পুরোপুরি মিথ্যা। গান আমি ভাল জানি–শুধু ভাল না, খুব ভাল। আমি জানি আমার গান শুনলেই তিনি বিস্ময়ে অভিভূত হবেন। গানকে আমি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাই না।
বকুল।
জ্বি।
চুপ করে আছ কেন? কথা বল।
কথা খুঁজে পাচ্ছি না।
পাপিয়া, পাপিয়ার সঙ্গে তোমার কেমন পরিচয়?
মোটামুটি পরিচয়। উনি আমাকে পছন্দ করেন কি-না আমি ঠিক বুঝতে পারি না।
তুমি পছন্দ কর?
না।
তুমি পছন্দ কর না কেন?
আমি জানি না। হিংসার কারণে হতে পারে।
তাকে হিংসা কর?
হুঁ।
কেন?
তিনি এত সুন্দর এই জন্যেই বোধ হয়। তাকে দেখলে আমার মোমবাতির কথা মনে হয়।
মোমবাতি কেন?
মোমবাতির মত ধবধবে সাদা শরীর। মুখটা জ্বলজ্বল করছে। ঠিক যেন মোমবাতির শিখা।
মোমবাতির শিখা যত জ্বলে মোমবাতি ততই কিন্তু ক্ষয়ে যেতে থাকে সেটা জান?
জানি। কিন্তু মানুষতো আসলে মোমবাতি না, সেই কারণে মানুষ ক্ষয় হয় না।
ভাল বলেছতো!
আপনি উনাকে খুব পছন্দ করেন?
হুঁ।
কেন, সুন্দর বলে?
সে যত-না সুন্দর, তার মন কিন্তু তারচেয়ে অনেক সুন্দর। যেমন ধর তার মেয়েটা ব্যথা পেয়েছে এই খবর শুনেই সে ছুটে চলে গেছে। মেয়েটা কিন্তু তার নিজের না।
নিজের না?
না নিজের না, সে রফিক নামের একটা ছেলেকে বিয়ে করল। রফিক তখন মেরীল্যান্ডের একটা কোম্পানীতে কাজ করে। ছুটি কাটাতে দেশে এসেছিল। একটা পার্টিতে পরিচয়। পরিচয় থেকে অতি দ্রুত বিয়ে। বিয়ের পর জানা গেল রফিক আমেরিকায় একটা ব্ল্যাক মেয়েকে বিয়ে করেছিল। তাদের একটি বাচ্চাও আছে। সেই বিয়ে টেকে নি। ডিভোর্স হয়ে গেছে। বাচ্চা মেয়েটিকে মা নেয় নি। বাবাও নিচ্ছে না। মেয়েটি দারুণ কষ্টে তার গ্রান্ডমার সংসারে আছে। মেয়েটিকে পাপিয়া নিজের কাছে নিয়ে এল। রফিকের সঙ্গেও তার বিয়ে টিকল না। রফিক তৃতীয় আরেকজনকে বিয়ে করল। রফিকের মেয়েটি রয়ে গেল পাপিয়ার কাছে। কী আদর যে পাপিয়া মেয়েটিকে করে তা তুমি না দেখলে বিশ্বাস করবে না।
আর রফিক সাহেবের কাজ কি শুধু বিয়ে করে বেড়ানো?
ব্যাপারটা মোটামুটি সে রকমই দাঁড়াচ্ছে।
উনি কি খুব হ্যান্ডসাম—তাঁকে দেখামাত্রই কি মেয়েদের মাথা আউলা হয়ে যায়?
রফিক মোটেই হ্যান্ডসাম না। কাঠখোট্টা ধরনের চেহারা তবে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললে মেয়েদের মনে একটা ঘোর অবশ্যই তৈরি হয়।
কেন?
আমি জানি না কেন? মেয়েরা বলতে পারে।
আপনার জানতে ইচ্ছা করে না!
না আমার জানতে ইচ্ছে করে না।
আমি এখন উঠি?
আচ্ছা যাও! আশা করি তোমার মা মোটামুটি খুশিই হবেন যে বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়েছে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। এবং কোনরকম দ্বিধা ছাড়াই বললাম, আমি আপনার সঙ্গে সামান্য মিথ্যা কথা বলেছি। দয়া করে কিছু মনে করবেন না।
তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, কী মিথ্যা কথা?
মা আমাকে আপনার কাছে পাঠান নি। আমি নিজেই এসেছি। আমার খুব একা একা লাগছিল–মন খারাপ লাগছিল। আমার মনে হচ্ছিল আপনার সঙ্গে কথা বললে মন খারাপ ভাব কমবে।
কমেছে?
জ্বি না, কমে নি।
তাহলে বস আরো কিছুক্ষণ।
না।
আমি উঠে চলে এলাম। দরজার ওপাশে এসে থমকে দাঁড়ালাম। আমার ধারণা ছিল আমার কাণ্ডকারখানায় উনি মোটামুটি স্তম্ভিত হয়ে যাবেন। দেখা গেল আমার ধারণা ঠিক না। আমি ঘর থেকে বেরুবার সঙ্গে তাঁর ঘরের ক্যাসেট প্লেয়ার চলতে শুরু করল। দরজার ভেতর দিয়ে এক পলকের জন্যে তাকালাম— তিনি গভীর মনযোগে বই পড়ছেন। কী এমন বই? উনার সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম তখন বইটার নাম আমি পড়েছি বইটার নামা Sula, লেখকের (না-কি লেখিকার?) নাম টনি মরিসন। বইটা ছিড়ে কুটি কুটি করে ফেললে আমার ভাল লাগত! একটা কাজ করলে কেমন হয়? আমি দরজার পাশে দাড়িয়ে থাকি–উনি এক সময় কিছুক্ষণের জন্যে বই রেখে বাথরুমে যাবেন বা অন্য কোথাও যাবেন এই ফাঁকে আমি বই ছিড়ে কুচি কুচি করে চলে আসব। উনি ফিরে এসে হতভম্ব গলায় বলবেন—একী? আমার পক্ষে তা করা সম্ভব না। আমরা এমন জগতে বাস করি যে জগতে যে কাজটা খুব করতে ইচ্ছে করে সেই কাজটা কখনো করা যায় না। অনন্ত নক্ষত্র বীথিতে এমন কোন গ্রহ কি আছে যে গ্রহের মানুষরা যা করতে চায় তাই করতে পারে?
