গোপন একটা কথা বলে গেছেন মা। তোমার না জানলেও চলবে।
যন্ত্রণা করিস না, কী বলেছে বল।
ম্যাডাম বললেন—বকুল ডিয়ার, আমি আমার কৃষ্ণকে তোমার হাতে আপাতত দিয়ে গেলাম। তুমি তাকে দেখে শুনে রাখবে। সঙ্গ দেবে।
আমি তোর মা না? আমার সঙ্গে অশ্লীল কথা বলতে তোর মুখে আটকায় না।
অশ্লীল কথাতো মা কিছু না। তাছাড়া তোমার কাছে অশ্লীল লাগলেও কিছু করার নেই। পাপিয়া ম্যাডাম আমাকে যাই বলেছেন আমি তাই তোমাকে বললাম। তুমি যদি শুনতে না চাইতে তাহলে আর অশ্লীল কথাগুলি তোমাকে শুনতে হত না।
পাপিয়া এ রকম কোন কথাই বলে নি। সে জিজ্ঞেস করছিল—তোর জন্যে গল্পের বই আনবে কি-না।
তাহলেতো তুমি জানই কী জিজ্ঞেস করেছিল–তারপরে জানতে চাচ্ছ কেন?
খুব দোষ করেছি। এখন কী করতে হবে? পা ধরতে হবে?
মা রাগে-দুঃখে কেঁদে ফেললেন। কাজেই হাসি মুখে আমি বসলাম তার পাশে। এখন মার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করা যায়। আদুরে ভঙ্গি করা যায়। তার গায়ে-মুখে নাক ঘষা যায়। আমি আদুরে গলায় বললাম, কেমন আছ মা?
যা ঢং করিস না।
ও আল্লা তোমার সঙ্গে ঢং করব নাতো কার সঙ্গে টং করব? সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে?
আবার ফাজলামি? ঐ বাঁদরটার নামও মুখে আনবি না।
আচ্ছা যাও মুখে আনব না। পা ব্যথা করছে? টিপে দেব?
বললাম না ঢং করবি না।
মার রাগ পড়ে গেছে। তার মন ভর্তি হাসি। সেই হাসি এখনো মুখ পর্যন্ত আসে নি তবে এসে যাবে।
বকু!
কি-কু?
উফ আবার ঢং। এত ঢং তোকে কে শিখিয়েছে?
বেশির ভাগই নিজে নিজে শিখেছি। কিছু শিখেছি পাপিয়া ম্যাডামের কাছ থেকে।
কী রকম বদ মেয়ে দেখলি?
পাপিয়া ম্যাডামের কথা বলছ?
আর কার কথা বলব? সামান্য চক্ষুলজ্জাও মেয়েটার নেই। মানুষের চোখে সাত পর্দা লজ্জা থাকে। তার এক পর্দাও নেই। তার মেয়ের কী না কী হয়েছে সব ফেলে-ফুলে ছুটে চলে গেছে।
নিজের মেয়ের বিপদে ছুটে যাবে না? তুমি ছুটে যেতে না?
এতদিন পর নিজের মেয়ে বলছে কেন? শুরুতে পত্রিকায় কত ইন্টার এ আমার মেয়ে না। পালক কন্যা। তখন সে ভয়ে অস্থির লোকজন যদি জানে মেয়ে হয়ে গেছে তখন নায়িকার ইমেজ নষ্ট হবে। লোকজন সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখবে না।
এই মেয়ে তাঁর নিজের না তিনি পত্রিকায় এমন ইন্টার দিয়েছিলেন?
অবশ্যই দিয়েছে। আমি নিজে পড়েছি। বুঝলি বকু ফিল্ম লাইন বড়ই জটিল লাইন।
তুমি এই জটিল লাইনে তোমার মেয়েকে ঢুকাচ্ছ কেন? এখনো কিন্তু সময় আছে।
কী সময় আছে?
তুমি তোমার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দাও। ভাল একটা ছেলে দেখে বিয়ে দাও। চাকুরিজীবি স্বামী। দশটা পাঁচটা অফিস করবে। ভেড়ুয়া টাইপ। মাঝে মধ্যে লোভে পড়ে বন্ধুর সঙ্গে তাশ-টাশ খেলতে যাবে। তখন আমি খুব বকা ঝকা করব। ঈদের বোনাস যেদিন পাবে তার পরদিনই তাকে নিয়ে ঈদের শাড়ি কিনতে যাব কেনা কাটা শেষ হবার পর কোন একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে গিয়ে দুজন মিলে এক বাটি থাই স্যুপ খাব। ফুল কোর্স খাবার মত পয়সাতো আমাদের থাকবে না কাজেই শুধু স্যুপ।
তুই ভ্যার ভার করে এইসব কী বলছিস?
কেন তোমার কি শুনতে ভাল লাগছে না?
অসহ্য লাগছে।
কফি খাবে মা?
এখন কফি কোথায় পাবি?
ইউনিটকে বলব কফি দিতে। এক নম্বর নায়িকার অনুপস্থিতিতে আমিইতো এক নম্বর। খাবে কফি?
তুই কফির কথা বলবি তারপর ওরা দেবে না সেটাতো খুব লজ্জার ব্যাপার হবে।
তুমি চুপ করে শুয়ে থাক, আমি কফি নিয়ে আসছি। তারপর আমরা মা-মেয়ে দুজন কফির কাপ হাতে পরচর্চা করব। পাপিয়া ম্যাডামকেতো ধরা হয়েছে, কফি খেতে খেতে আমরা ডিরেক্টর সাহেবের চরিত্র বিশ্লেষণ করব। উনাকে তুলোধুনা করে ছাড়ব।
বকুল, ফাজলামি ধরনের কথা তুই একদম বলবি না।
আচ্ছা যাও বলব না, তুমি ঝিম ধরে পড়ে থাক, আমি কফি নিয়ে আসছি।
চিনি কম দিতে বলবি, গাদাখানিক চিনি যেন না দেয়।
আমি মার ঘর থেকে বের হয়ে আবার কিছুক্ষণ জোনাকি গোনার চেষ্টা করলাম। গোনা যাচ্ছে না— যতবার গুনতে শুরু করি ততবারই ওরা গাছের আড়ালে চলে যায়। এরা কি কোনভাবে বুঝতে পারছে আমি এদের গুনতে চেষ্টা করছি? টেলিপ্যাথিক কোন যোগাযোগ? কফির কথা বলার জন্যে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছি সোহরাব চাচার সঙ্গে দেখা। তিনি মন খারাপ করে বসে আছেন। আমাকে দেখেই হাত ইশারা করলেন। আমি হাসি মুখে কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম, চাচা মন খারাপ কেন?
মন খারাপ না, ব্যথা উঠেছে।
ব্যথা উঠেছে মানে! কিসের ব্যথা উঠেছে?
আমার একটা কলিক ব্যথা আছে—ডান পেটে হয়। মাঝে মধ্যে হয়।
আলসার নাকি?
না-আলসার না, ডাক্তার দেখিয়েছি—তারা আলসার না এটাই শুধু বলে আর কিছু বলে না। তুমি রান্নাঘরে ঘুর ঘুর করছ কেন?
কফির সন্ধানে এসেছি চাচা-কফি কি পাওয়া যাবে?
অবশ্যই পাওয়া যাবে। কেন পাওয়া যাবে না!
তিন কাপ কফি লাগবে।
তিনজন কে?
মার জন্যে এক কাপ, আমার জন্যে এক কাপ এবং আমাদের ডিরেক্টর সাহেবের জন্যে এক কাপ।
স্যার কি কফি চেয়েছেন? তিনি তো এই সময় কফি খান না।
না উনি কফি চান নি তবু আমি ভাবছি এক কাপ কফি তাঁর কাছে নিয়ে বলব, আপনার জন্যে কফি এনেছি।
কেন?
উনি আমার খুব প্রশংসা করেছেন। আমার প্রশংসা মানে আমার অভিনয়ের প্রশংসা। যখন প্রশংসা করছিলেন তখন লজ্জায় কথা বলতে পারি নি। এখন লজ্জা একটু কমেছে। এখন ঠিক করেছি–কফির কাপটা উনার হাতে দিয়ে বলব
—থ্যাংক য়্যু।
তার কোন দরকার নেই। স্যারের সঙ্গে আমার যখন দেখা হবে তখন আমি বলে দেব।
