জামিল ভাই হাত-টাত নেড়ে খুব মজা করে গল্প করছেন। আমি চোখ বড় বড় করে শুনছি। গল্পের খুব সিরিয়াস অবস্থায় হঠাৎ নিশাত আপা (পাপিয়া ম্যাডাম } উঠে দাঁড়াবেন এবং কাউকে কিছু না বলে ডাকবাংলোয় চলে যাবেন। জামিল ভাই বিস্মিত হয়ে বলবেন, দিলু ও এমন হুট করে চলে গেল কেন?
আমি বলব, মনে হয় গল্প শুনে ভয় পেয়েছে। জামিল ভাই আপনি বলতে থাকুন। আমি শুনছি। জামিল ভাই বললেন, আজ থাক আরেক দিন বলব। আমি আহ্লাদী গলায় বলব, না এখন বলতে হবে। জামিল ভাই মোটামুটি ক গলায় বলবেন, বিরক্ত করো নাতো। বলেই তিনি উঠে চলে যাবেন।
জামিল ভাইয়ের কঠিন আচরণে আমার চোখে পানি চলে আসবে। দৃশ্যটা শেষ হবে চোখের জলে।
পাপিয়া ম্যাডামের মেয়ের দাঁত ভাঙ্গার খবরটা দৃশ্যের শুরুতেই এল। পিয়া ম্যাডামের চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল। তিনি বললেন, দৃশ্যটা শেষ হলে আমি ঢাকায় চলে যাব। ডিরেক্টর সাহেব বললেন, আচ্ছা। টেক শুরু হল। খুব সুন্দর অভিনয় করলেন পাপিয়া ম্যাডাম। মিজান সাহেবের অভিনয় আমার তত ভাল লাগল না। ডিরেক্টর সাহেব বললেন, মিজান তোমার অভিনয় ঠিক জমছে না। কারণটা কী?
মিজান সাহেব বললেন, আমিতো বুঝতে পারছি না।
টোন ডাউন করবে?
আপনি বললে করি।
তাহলে টোন ডাউন কর। তোমার গল্প শুনে মনে হচ্ছে তুমি ছোট ছোট বাচ্চাদের ভূতের গল্প বলছ–আসলে তোমার টার্গেট শ্রোতা হচ্ছে একজনই, নিশাত। তুমি গল্পটা বলছ দিলুর দিকে তাকিয়ে কিন্তু মন পড়ে আছে নিশাতের কাছে। নিশাতের কাছে গল্পটা কেমন লাগছে এটা নিয়েই তুমি কনসার্নড়।
টেক আবার শুরু হল। মিজান সাহেব আগের মতই অভিনয় করলেন তবে হাত নাড়াটা একটু কমল। সব শেষ করে আমরা রেস্ট হাউজে ফিরলাম সন্ধ্যা পার করে। পাপিয়া ম্যাডাম সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা রওনা হলেন। কবে ফিরবেন কাউকে কিছু বলে গেলেন না। আমাকে শুধু বললেন, তোমার জন্যে কি ঢাকা থেকে কিছু আনতে হবে?
আমি বললাম, না।
গল্পের বই? গল্পের বই কি আনব?
আনতে পারেন। সবচে ভাল হয় যদি আপনি আপনার মেয়েকে নিয়ে। আসেন।
ওকে আমি শুটিং স্পটে আনি না।
পাপিয়া মাডামের গাড়ি রওনা হবার সঙ্গে সঙ্গে আমার কেন জানি মনে হল জাহেদার কথা ফলে যাবে। দুর্গাপুরে আর কখনো শুটিং হবে না। উনি ফিরে আসবেন না। আমরা দুচারদিন অপেক্ষা করে ঢাকায় ফিরে যাব।
মার শরীর খুবই খারাপ করেছে। নানান ধরনের অসুখ বিসুখ তাঁর হয়। একটা কমলে আরেকটা শুরু হয়। অসুখ ছাড়া অবস্থায় তিনি কখনো থাকেন না। যে সব অসুখ তার সারা বছরই থাকে সেগুলি হচ্ছে–
বুক ধড়ফড়
শ্বাস কষ্ট
আধকপালী মাথা ধরা
মাথা ঘোরা
বমি ভাব
বুক জ্বালা
কাশি
টনসিলের ব্যথা
জ্বর।
আজ তার পুরানো অসুখের কোনটা তাকে ধরে নি–তার পা ফুলে গেছে। তিনি বিছানা থেকে নামতেও পারছেন না। কাশবনের শুটিং দেখতে যাওয়ায় তাকে আট কিলোমিটারের মত হাঁটতে হয়েছে। আমার ধারণা এই হাঁটাই তার কাল হয়েছে। শারীরিক কষ্ট তিনি একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। অসুখ বিসুখের সময় কাউকে না কাউকে তার পাশে থাকতে হবে। পাশে থাকার এই অংশটা আমার কাছে অসহ্য লাগে। মা অনবরত কথা বলতে থাকেন। সেইসব কথাবার্তার বেশির ভাগই অর্থহীন। দুতিন মিনিট পর পর তিনি অস্থির হয়ে ডাকবেন,বকু, বকু ও বকু। ভাবটা এ রকম যেন ভয়ংকর কিছু ঘটে যাচ্ছে। আমি ছুটে যাব, তিনি বলবেন— মাথার নীচের বালিশটা ঠিক করে দেতো মা। বালিশ ঠিক করার এই কাজটা তিনি নিজেই পারেন–নিজে করবেন না। অন্য কাউকে দিয়ে করাবেন।
পাপিয়া ম্যাডাম চলে যাওয়ায় আমার কেমন জানি ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আমি জোনাকি পোকার আলো জ্বলা দেখার জন্যে বারান্দায় বসে আছি এবং মজার একটা কাজ করার চেষ্টা করছি—জোনাকি পোকার আঁকে মোট কতগুলি জোনাকি পোকা আছে তা গোনার চেষ্টা করছি। কাজটা যত কঠিন মনে হচ্ছে। আসলে তত কঠিন না। ঝাকের জোনাকি পোকারা জায়গা বদল করে না। তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ওড়ে ঠিকই কিন্তু একজনের সঙ্গে অন্যজনের দূরত্ব ঠিকই রাখে। আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম আলো জ্বলা-নেভা একেক জোনাকির একেক সময়ে হলেও যখন তারা স্থির হয়ে থাকে তখন আলো জুলা-নেভার মধ্যে এক ধরনের শৃঙখলা চলে আসে। সবাই এক সঙ্গে আলো জ্বালে এক সঙ্গে নেভায়।
বকু বকু বকু।
আমি বিরক্ত মুখে উঠে গেলাম। জোনাকি গোনা হল না। মা নিতান্ত অকারণে ডাকছেন। তাঁর মহা উদ্বিগ্ন গলার স্বরই বলে দিচ্ছে— অকারণ ডাকাডাকি।
বকু মা দেখতো আমার পায়ে পানি এসেছে কি-না। পানি আসা বুঝব কী করে?
পায়ে আঙ্গুল দিয়ে শক্ত করে চাপ দে। দেখবি গর্ত হয়ে যাবে। আঙ্গুল সরিয়ে দে। গর্ত যদি সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় তাহলে পানি আসে নি। আর যদি সময় বেশি নেয় তাহলে পানি এসেছে।
আমি টিপাটিপি করে বললাম, পানি আসে নি মা। মনে হয় বরফ এসেছে। গর্তই করতে পারছি না।
মা কঠিন চোখে তাকিয়ে আছেন। কন্যার রসিকতা তার ভাল লাগছে না। আমি বললাম, মা যাই আমি জরুরি একটা কাজ করছি।
জরুরি কাজটা কী?
জোনাকি পোকা গুনছি।
এইটা তোর জরুরি কাজ?
হুঁ।
অসুস্থ মায়ের কাছে বসে, ভাল মন্দ দু একটা কথা বলা জরুরি না?
হুঁ।
আচ্ছা যাও বসলাম। তুমি ভালমন্দ কথা বল আমি শুনি।
পাপিয়া চলে গেছে?
হুঁ।
যাবার আগে দেখলাম গুজ গুজ করে তোকে কী সব বলছে। কী বলছে?
