ফাজলামি ধরনের কথা, গুরুত্ব দিও না মা।
একবার দেখলাম মঈন ভাই কী একটা কথা বলে খুব হাসছেন। কথাটা কী?
মা শোন, আমার মনে নেই। উনি হেসেছেন কি না তাও মনে নেই। তুমি আমাকে আর বিরক্ত করো না। উনি আমাকে কুঁজো বলেছেন, আমার মন খুবই খারাপ। তুমি অকারণ কথা বলে সেই মন খারাপ ভাবটা আর বাড়িও না!
তাকে কুঁজো বলবে কেন?
কুঁজোকে তো কুঁজোই বলবে, অন্ধ বলবে না।
মা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে চুপ করলেন। আমরা মনে হচ্ছে এখন রওনা হব। মার পাশাপাশি আমি হাঁটতে চাচ্ছি না। মার পাশে থাকলেই তিনি ঘুরেফিরে জানতে চাইবেন ডিরেক্টর সাহেবের সঙ্গে আমার কী কথা হল।
বকুল!
হুঁ।
কোত্থেকে এই মওলানা জুটেছে বল তো! ক্রমাগত আমার কানের কাছে বকবক করছিল। কয়টা দোজখ আছে, দোজখের নাম কী এইসব হাবিজাবি–।
তাই নাকি?
হুঁ। জাহান্নাম, হাবিয়া, জাহীম, লাযা … এইগুলি হচ্ছে দোজখের নাম।
ভাল তো, দোজখের সব নাম জেনে গেলে।
তুই চোখমুখ এমন শক্ত করে রেখেছিস কেন?
আমার খুবই কান্না পাচ্ছে। কান্না আটকে রেখেছি বলে চোখমুখ শক্ত হয়ে। গেছে।
কান্না পাচ্ছে কেন?
উনি আমাকে কুঁজো বলবেন, আমার কান্না পাবে না?
মা কোমল গলায় বললেন— নদীর পারে চলে যা। লোকজন নেই, কেউ দেখবে না। সেখান থেকে কেঁদে আয়।
আমি নদীর কাছে যাচ্ছি। মাথা সোজা করে যাচ্ছি। সত্যি সত্যি কাদার জন্যে যাচ্ছি, কিন্তু আমার চোখে পানি নেই। জানি পানি আসবে না। আয়োজন করে কাঁদা যায় না। নির্জন একটা জায়গায় কাঁদব বলে গেলাম। সঙ্গে রুমাল নিয়ে গেলাম— এই ভাবে কি আর কেউ কাঁদে?
সোমেশ্বরী নদী— নাম শুনলে মনে হয় বিশাল ব্যাপার, বিশাল নদী। আসলে ছোট্ট ফিতার মত নদী। হেঁটে এক পার থেকে আরেক পারে যাওয়া যায়। পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ভেজে।
বর্ষায় এই নদী নাকি প্রমত্তা হয়। পাহাড়ি পানি নেমে ভয়াবহ কাণ্ড করে বসে। সোমেশ্বরী নদীর ভয়ে মানুষজন আতঙ্কগ্রস্ত থাকে। কোনো এক বর্ষায় এসে নদীটা দেখে গেলে হত।
নদীর বুক জুড়ে বিশাল চর। ধবধবে শাদা বালি চকচক করছে। এরকম কোনো নদী দেখেই কি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন— আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাকে–বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে …..।
ফরহাদ সাহেব ঢাকা চলে গেছেন
ফরহাদ সাহেব ঢাকা চলে গেছেন। যাবার আগে সবার সঙ্গে খুব ভদ্র ব্যবহার করেছেন। নিজের কাজ কর্মের জন্যে ক্ষমা চেয়েছেন। সেলিম ভাইকে বইয়ের ভাষায়, কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছেন, ছবির ভুবনে তোমার আগমন সুন্দর হোক, শুভ হোক। এখানেই শেষ না, সেলিম ভাইকে পাশে নিয়ে ছবি তুলেছেন। ছবি তোলার সময় বাঁ হাত তুলে দিয়েছেন সেলিম ভাইয়ের কাঁধে। সেলিম ভাই বেচারার বিব্রত মুখ দেখার মত ছিল।
ইউনিটের গাড়ি তাকে ঢাকা পৌঁছে দেবার জন্যে যাচ্ছিল। তিনি তা নিলেন। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, এখানে কত কাজ, শুধু শুধু একটা গাড়ি আমি ঢাকা নিয়ে যাব কেন? বাসে উঠে চলে যাব। জনগণের সঙ্গে মেশাও হবে। মেশ তো হয় না। রাজনৈতিক নেতারা যেমন গণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন আমরা ছবির জগতের মানুষরাও তেমনি গণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। এটা ঠিক না। আমি ঠিক করেছি যখনই সুযোগ পাব— জনগণের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করব।
ফরহাদ সাহেব জনগণের সঙ্গে মেশার তেমন সুযোগ পেলেন না। সোহরাব চাচা ভাড়া করা মাইক্রোবাস এনে ফরহাদ সাহেবের কানে কানে কী যেন বললেন। ফরহাদ সাহেব হাসি মুখে মাইক্রোবাসে উঠে বসলেন। জনতার সঙ্গে মিশে যাবার কথা আর তার মনে রইল না। সোহরাব চাচা কী বলেন যে এমন মন্ত্রের মত কাজ করে? জোঁকের মুখে লবণ পড়ার অবস্থা হয়। আমি সোহরাব চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, মা শোন, মানুষও জেঁকের মতই। তাদেরও লবণ আছে। একেক মানুষের জন্যে একেক ধরনের লবণ। ফরহাদ সাহেবের জন্যে যে লবণ সেই লবণ কিন্তু অন্য কোন সাহেবের জন্যে কাজ করবে না।
আমি বললাম, আমাদের ডিরেক্টর সাহেবের জন্যে কী লবণ?
সোহরাব চাচা হাসলেন। আমি বললাম, আপনি জানেন না-কি জানেন না?
আমি জানি।
আমাকে বলবেন?
না।
ফরহাদ সাহেবের লবণটা কী তা বলবেন?
উহুঁ!
কোন মানুষের কী লবণ তা বের করা কি আপনার হবি?
হবি নারে মা, যে লাইনে কাজ করি এই লাইনে লবণ জানা থাকলে খুব সুবিধা হয়।
চাচা বলুনতো আমার লবণটা কী?
সোহরাব চাচা হাসলেন। হাসার ভঙ্গি দেখেই মনে হচ্ছে তিনি জানেন। আমি বিস্মিত হলাম। আমারো যে লবণ আছে আমি তা জানতাম না। সোহরাব চাচা কি আসলেই জানেন?
আমাদের শুটিং আপাতত বন্ধ।
ফিল্মের ভাষায় প্যাক আপ হয়ে গেছে। কখন বা কবে শুরু হবে কেউ বলতে পারছেন না। পাপিয়া ম্যাডাম হুট করে ঢাকা চলে গেছেন। তার মেয়ে সিড়ি দিয়ে ওঠার সময় পা পিছলে পড়ে দাঁত ভেঙ্গে ফেলেছে। খবরটা যখন এল তখন তাঁর শট নেয়া হচ্ছে। আমি, পাপিয়া ম্যাডাম এবং মিজান সাহেব। দৃশ্যটা এ রকম— ডাকবাংলোর বাইরে আমরা তিনজন ফোল্ডিং চেয়ারে বসে আছি। দূরে গারো পাহাড় দেখা যাচ্ছে। আমার হাতে একটা পিরিচ। পিরিচে আচার। আমি আচার খেতে খেতে জামিল ভাইয়ের কথা শুনছি। আমার হাতে আচার থাকায় খুব সমস্যা হচ্ছে। কনটিনিউইটির সমস্যা। কখন মুখে আচার থাকবে, কখন হাতের আঙ্গুলে, লক্ষ্য রাখতে হচ্ছে। জামিল ভাই (মিজান সাহেব) ভূতের গল্প করছেন। মূল চিত্রনাট্যে দৃশ্যটি রাতের। কিন্তু এখন করা হচ্ছে সন্ধ্যায়। সন্ধ্যায় দূরের গারো পাহাড় আবছা হলেও দেখা যায়।
