কাল তোর শুটিং আছে না?
হ্যাঁ।
আমি দেখতে পারব না।
তুমি খুব ভালই দেখতে পাবে। সকালের মধ্যে তোমার জ্বর সেরে যাবে। পানি খাবে মা? পানি এনে দি?
না।
ঘরের বাতি নিভিয়ে বাথরুমের বাতি জ্বেলে দি। আলো চোখে লাগছে।
না না, ভয় লাগে। তুই আমার আরো কাছে আয়।
আমি মার বুকের কাছে চলে এলাম। তার শরীরের গরমে মনে হয় সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। আমি চোখ বন্ধ করে ঘুম আনানোর চেষ্টা করছি। কাল সারাদিন শুটিং হবে আমার ভাল ঘুম দরকার! চোখের নীচে যেন কালি না পড়ে। মা জ্বরে ছটফট করছেন। আমাকে ঘুমুতে হলে সুন্দর একটা স্বপ্ন তৈরি করতে হবে। এই অবস্থায় সুন্দর কোন স্বপ্ন তৈরি করা সম্ভব হবে কি? আচ্ছা চেষ্টা করা যাক।
নৌকায় করে আমরা যাচ্ছি। আমি, আমার স্বামী এবং আমাদের ছোট্ট বাবু। বাবুটার জ্বর উঠেছে। আমি তাকে কোলে নিয়ে বসে আছি। আকাশে খুব মেঘ করেছে। মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে। বাবুর গায়ে জ্বর না থাকলে আমরা বৃষ্টিতে ভিজতাম। আহা বেচারা হঠাৎ জ্বর এসে গেল। মুখ শুকিয়ে কী হয়েছে! ব্যাটা পানি খাবি?
উহুঁ। বাবার কোলে যাব। বাবার কোলে যাবি কী? তুই থাকবি আমার কোলে। গল্প বল না।
ওমা শখ কত! জুর গায়ে গল্প শুনতে চায়। কিসের গল্প শুনতে চাস?
ভূতের গল্প।
দিনে দুপুরে ভূতের গল্প কিরে বোকা ছেলে?
ভূতের গল্প বল।
কুণি ভূত আর বুনি ভূতের গল্প শুনবি?
হুঁ শুনব।
ঘরের কোণায় যে ভূত থাকে তাকে বলে কুণি ভূত। আর যে ভূত থাকে বনে তার নাম বুনি ভূত।
গল্প বলা হল না, বৃষ্টি এসে গেল। আমি বাবুকে নিয়ে নৌকার ছইয়ের নীচে চলে গেলাম। বাবুর বাবা এখনো নৌকার পাটাতনে বসে আছে। মনে হয় ভদ্রলোকের বৃষ্টিতে ভেজার ইচ্ছা।
রুমালী বাবুকে শুইয়ে চলে এসতো আমরা বৃষ্টিতে ভিজি।
একা বিছানায় শুইয়ে আমরা মজা করব! বৃষ্টিতে ভিজব! বৃষ্টিতো আর পালিয়ে যাচ্ছে না। সবে শ্রাবণ মাসের শুরু। সারা মাসতো পড়েই আছে।
কই রুমালী এসো।
উহুঁ। বাবুকে একা ফেলে কীভাবে আসব?
ওকে নিয়েই এসো। বৃষ্টিতে ভিজলে ওর জ্বর সেরে যাবে। একে বলে জল চিকিৎসা।
লাগবে না আমার জল চিকিৎসা।
বাবু কোলের ভেতর নড়ে চড়ে উঠল। ওর মতলব ভাল মনে হচ্ছে না। বাবার কথা কানে গেছে এখন কি আর আমার কথা শুনবে। এমন নিমকহারাম ছেলে। এত আদর করি— তারপরেও শুধু বাবা, বাবা, বাবা।
বাবু ঠোঁট ফুলিয়ে ডাকল, মা।
আমি গম্ভীর গলায় বললাম, কী হল আবার?
বৃষ্টিতে ভিজব মা।
অসম্ভব— এই বৃষ্টিতে ভিজলেই নিউমোনিয়া হবে।
হবে না।
তুই জানলি কী করে তুই কি ডাক্তার?
আমি ডাক্তার না হলেও বাবাতো ডাক্তার।
কল্পনার গল্প এইখানে থেমে গেল। হঠাৎ যেন ছন্দপতন হল— কারণ বাবুর বাবাতো ডাক্তার নন। বাবুর বাবা হলেন …..।
আশ্চর্য কল্পনাতেও মানুষটার কথা ভাবতে লজ্জা লাগছে কেন? এত লজ্জা করলেতো আমার চলবে না। কল্পনার এই গল্পটা আপাতত বাদ থক। আমি বরং অন্য কোন গল্প শুরু করি। যে গল্পে বাবুর বাবার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হবে। বাবুর বাবা প্রথম আমার হাত ধরে, বলবেন— ভালবাসি। তোমাকে ভালবাসি।
আচ্ছা জাহেদাকে জিজ্ঞেস করে একবার কি জেনে নেব আমার বর কী হবে, ডাক্তার না অন্য কেউ? ভবিষ্যৎ জানতে পারার সত্যি সত্যি কোন ব্যবস্থা থাকলে ভাল হত। বিশাল একটা যন্ত্র থাকবে। সেই যন্ত্রে কম্পিউটারের পর্দার মত পর্দা। টিকিট কেটে যন্ত্রটার কাছে যেতে হবে। ভবিষ্যতে কী হবে প্রশ্ন করা মাত্র যন্ত্রটা জবাব দিয়ে দেবে। প্রশ্ন উত্তরের ধরনটা কেমন হবে?
স্যার বলুনতো আজ আমি রিকশা করে নিউমার্কেটে যাব। যাওয়া এবং ফেরার পথে কোন ঘাতক ট্রাকের সঙ্গে কলিশন হবে?
না।
আজ রাতে আমি কী দিয়ে ভাত খাব?
এক পিস ইলিশ মাছ ভাজা, আলু ভর্তা আর ডাল।
কোন তরকারি থাকবে না?
থাকবে। তবে তুমি খাবে না।
খাব না কেন?
দুপুরে রান্না করা তরকারি। জ্বাল দেয়া হয় নি টকে গেছে এই জন্যে খাবে না।
থ্যাংক য়্যু স্যার।
ইউ আর ওয়েল কাম ইয়াং লেডি।
স্যার একটা শেষ প্রশ্ন।
বল।
একটা ভয়ংকর ব্যাপার আমার জীবনে ঘটে গেছে। আমি একজন বুড়ো মানুষের প্রেমে পড়ে গেছি। ব্যাপারটা কাউকে বলতে পারছি না। যতই দিন যাচ্ছে আমি ততই অস্বাভাবিক হয়ে পড়ছি। আমার মাথা কি কিছুদিনের মধ্যে সম্পূর্ণ খারাপ হয়ে যাবে?
না। তোমার ঘোর কেটে যাবে। অল্প দিনের ভেতর ঘোর কেটে যাবে। সেই অল্প দিন মানে কত দিন?
এক মাস।
মাত্র এক মাস?
ঘোর যত প্রবল হয়, তত দ্রুত কাটে।
ও আচ্ছা ধন্যবাদ।
তোমাকেও ধন্যবাদ এবং শুভরাত্রি।
আমি ঘুমুতে চেষ্টা করছি। ঘুম আসছে না। ভয়ংকর একটা খারাপ ইচ্ছা করছে। পৃথিবীর সবচে খারাপ মেয়েদের মনেই বোধ হয় এরকম ইচ্ছা হয়। মনে হচ্ছে আমি পৃথিবীর সবচে খারাপ একটা মেয়ে। আমার ইচ্ছা করছে–চুপিচুপি মায়ের পাশ থেকে উঠে একতলায় নেমে যেতে। তারপর ডিরেক্টর সাহেবের ঘরের দরজায় আলতো করে নক করতে। উনি জেগে উঠে ঘুম জড়ানো গলায় বলবেন, কে? আমি বলব–রুমালী।
হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গলে মানুষের জগৎ এলোমেলো থাকে তাঁর জগতটাও তখন থাকবে এলোমেলো। রুমালী শব্দটার মানে তিনি ধরতে পারবেন না। তিনি বলবেন, রুমালী কে? আমি বলব, রুমালী হল মিস হ্যান্ডকারচিফি কিংবা মিস ন্যাপকিনি। তিনি অবাক হয়ে দরজা খুলে বলবেন, ও তুমি। এত রাতে কী ব্যাপার?
আমার জ্ঞান ফিরলে আপনাকে খবর দেয়ার কথা বলেছিলেন। খবর দেয়া হয় নি। এখন খবর দিতে এলাম।
