ও আচ্ছা।
আমার ঘুম আসছে না। আমি যদি কিছুক্ষণ আপনার সঙ্গে গল্প করি তাহলে কি আপনি রাগ করবেন?
না রাগ করব না।
আমি তখন আহ্লাদী গলায় বলব, কেউ দেখে ফেললে খুব সমস্যা হবে। এত রাতে আপনার সঙ্গে গল্প করছি। দুষ্ট লোক নানান কথা ছড়াবে।
তাহলে কি গল্প করার পরিকল্পনা বাতিল?
না বাতিল না। আমরা বাতি নিভিয়ে গল্প করব। বাতি নেভানো থাকলে কেউ আমাদের দেখতে পাবে না।
তা ঠিক।
অবশ্যি কথা বলতে হবে ফিস ফিস করে।
হুঁ।
হুঁ বলে দরজা ধরে দাড়িয়ে আছেন কেন? দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়ান। এবং দয়া করে বাতি নিভিয়ে দিন।
তিনি দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াবেন এবং বাতি নিভিয়ে ঘর অন্ধকার করে দেবেন।
ছিঃ আমি এসব কী ভাবছি? আমার মাথা কি সত্যি সত্যি খারাপ হয়ে গেছে? আমি বিছানায় উঠে বসলাম এবং মাকে ডেকে তুললাম। মা উঠে বসে ভয় ধরানো গলায় বললেন, কে? কে?
আমি বললাম, কেউ না মা। আমি। মিস ন্যাপকিনি।
কী হয়েছে?
গল্পটা শেষ কর মা?
কিসের গল্প?
ঐ যে কাকরাইল ট্রাফিক সিগন্যালের কাছে তুমি ধপাস করে রিক্সা থেকে পড়ে গেলে।
কী বলছিস তুই কিছুই বুঝতে পারছি না।
বাবার সঙ্গে তোমার প্রথম দেখা হবার বিখ্যাত গল্পটা। তুমি শুরু করেছিলে; শেষ কর নি। আমি শেষটা শুনতে চাই।
মায়ের চোখ থেকে ঘুম এখনো কাটে নি। তিনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।
বসে আছি শিমুল গাছের নীচে
আমি বসে আছি শিমুল গাছের নীচে। আগুনরাঙা ফুলে গাছ ঢেকে আছে। আমার চারদিকেও রাশি রাশি ফুল। আমার হাতে একটা কাগজ এবং কলম। কাগজে আমি একটি চিঠি লিখছি। তিন লাইনের চিঠি।
জামিল ভাই,
আমি আপনাকে ভালবাসি।
ভালবাসি ভালবাসি ভালবাসি।
আমার চোখ ভর্তি পানি। চিঠি শেষ হওয়া মাত্র আমার গাল বেয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। এবং আমি ভয়ানক চমকে উঠলাম কারণ জামিল ভাই চুপিচুপি আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমি হাতের কাগজটা মুঠোর ভেতর লুকিয়ে ফেললাম।
না, বাস্তব কোনো ব্যাপার না। এই আমি রুমালী নই—এই আমি হচ্ছি ছবির দিলু, যে তার জীবনের প্রথম প্রেমপত্র লিখেছে। যে প্রেমপত্র সে তার প্রেমিককে দিতে পারছে না। সে তার গোপন ভালবাসার কথা পৃথিবীর কাউকেই জানাবে না। জানানো সম্ভব নয়।
জামিল ভাইয়ের সঙ্গে দিলুর কিছু কথা হবে। কথা শেষ হবার পর দিলু ছুটে চলে যাবে। চিত্রনাট্যটা এরকম।
শট ওয়ান। (টপ শট। ক্যামেরা প্যান করবে।)
শিমুল গাছের শিমুল ফুল থেকে দিলু। দিলু কাগজে চিঠি লিখছে। দিলুর চারপাশে শিমুল ফুল।
শট টু।
(ক্যামেরা চার্জ করে দিলুর মুখের উপর। ক্লোজ শট।)
দিলুর চোখে জল। জল গড়িয়ে গালে পড়ে স্থির হয়ে গেল।
শট থ্রি। (ও এস শট। ক্যামেরা দিলুর পেছনে। ঘাড়ের ফাঁক দিয়ে চিঠির লেখাগুলি পড়া যাচ্ছে। ক্যামেরা ওয়াইড হবে। ফ্রেমে ঢুকবে জামিল। দিলুর পাশে দাঁড়াবে। দিলু চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়বে।)
শট ফোর। (টু শট। মিড ক্লোজ। দিলু ও জামিল।)
জামিল : তুই এখানে? চারদিকে তোকে খোঁজা হচ্ছে। কী করছিলি?
দিলু : কিছু করছিলাম না।
জামিল ও কাগজ-কলম নিয়ে বসে আছিস, চোখ ভেজা …. ব্যাপার কী? কবিতা লিখছিলি?
দিলু : হু।
জামিল : দেখি কী লিখলি?
দিলু : না।
জামিল : না কেন? তুই সবাইকে ফাকি দিয়ে গোপনে গোপনে মহিলা কবি হয়ে যাবি আমরা কেউ জানব না, তা হবে না। দেখি। একী, কাগজটা কচলাচ্ছিস কেন?
শট ফাইভ।
(ক্লোজ শট। দিলুর হাত। হাতের মুঠোয় কাগজ। কাগজটা সে কচলাচ্ছে। জামিল কাগজটা নিতে হাত বাড়াল।)
শট সিক্স।
(লং শট! দিলু জামিলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ছুটে চলে যাচ্ছে। বাতাসে দিলুর চুল উড়ছে। শাড়ির আঁচল উড়ছে।)
শট সেভেন।
(মিড ক্লোজ শট। বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে জামিল।)
শট এইট।
(দিলু নদীর পার ঘেঁষে দৌড়াতে দৌড়াতে কাশবনের ভিতর ঢুকে গেল। তাকে আর দেখা যাচ্ছে না। বাতাসে শুধু কাশবনের ফুল কাঁপছে।)
সাত নম্বর শট পর্যন্ত নেয়া হয়ে গেল। আট নাম্বার শট–কাশবনের দৃশ্য বাকি রইল। কাশবনের জন্যে যেতে হবে সোমেশ্বরী নদীর পারে। কাশবন যেখানে পাওয়া গেছে সেই জায়গাটাও অনেক দূরে। হেঁটে যেতে হবে। দুতিন ঘণ্টা লাগবে যেতে। এই শটটা অন্যদিন নেবার কথা। কিন্তু ডিরেক্টর সাহেব বললেন, আজই শটটা নিয়ে নেব। পরে কনটিনিউইটি সমস্যা দেখা দিতে পারে। ক্যামেরা চলে যাক। আমরা একটু পরে যাই।
ক্যামেরা ইউনিট সঙ্গে সঙ্গে রওনা হয়ে গেল। ক্যামেরাম্যান আজিজ আংকেল আমাকে বললেন, বকুল শুনে যাও।
আমি তার কাছে গেলাম। তিনি কী বলবেন তা আমি জানি বলে মনে হচ্ছে। অবশ্যি যে কথাগুলি মানুষ বলবে বলে ভেবে রাখে সব সময় তা বলতে পারে না। শেষ মুহূর্তে অন্য কথা বলে। আজিজ আংকেলের ব্যাপারে এই সমস্যা হবার কথা না।
বকুল আজ গরমটা কেমন পড়েছে বল তো?
খুব গরম।
শেষ বিচারের দিন সূর্য যেমন মাথার উপর চলে আসবে মনে হচ্ছে আজও সূর্য মাথার উপর চলে এসেছে।
জি।
খুব বেশি করে পানি খাবে। শরীর ঠিক রাখার একটামাত্র পথ, বেশি করে পানি খাওয়া। সারা দিনে মাঝারি সাইজের এক কলসি পানি খেলে তুমি শরীর নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পার।
আচ্ছা, এখন থেকে সারা দিনে এক কলসি পানি খাব। আর কোনো উপদেশ?
না, আর কোনো উপদেশ না। তোমার অভিনয় খুব ভাল হয়েছে। মঈন ভাই তোমাকে নিশ্চয়ই বলবেন। আমি আগেই বললাম। তোমার অভিনয় তো আমি আগে দেখি নি এই প্রথম দেখছি। যতবার তুমি পর্দায় আসবে ততবার পর্দা ঝলমল করে উঠবে।
