আমাদের খেতে যাওয়া হল না। সোহরাব চাচা দুজনের খাবার নিয়ে চলে এলেন। আমি আহ্লাদী গলায় বললাম, কী খবর সোহরাব চাচা?
সোহরাব চাচা হাসি মুখে বললেন, খবর খুবই ভাল। তুমি আছ কেমন?
আমি ভাল আছি।
তাতো দেখতেই পাচ্ছি। আগামীকাল শুটিং আছে। সকাল সকাল খেয়ে শুয়ে পড়। লম্বা একটা ঘুম দাও।
মা কৌতূহলী গলায় বললেন, আজকের শুটিং কেমন হয়েছে?
ভাল হয়েছে বলেইতো শুনেছি।
সেলিমকে কি রাখা হচ্ছে, নাকি ফরহাদ সাহেব অভিনয় করবেন?
এখনো জানি না। স্যার স্পষ্ট করে কিছু বলছেন না।
মা গম্ভীর মুখে বললেন, ছবি চলে স্টারদের নামের উপর। ফরহাদ সাহেবকে ছবির স্বার্থেই রাখা উচিত। আপনি মঈন ভাইকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলুন।
কিছু বলতে হবে না। এইসব ব্যাপার স্যার খুব ভাল জানেন।
রাতের খাবার আমি আরাম করেই খেলাম। মুরগীর গোশত, ভাজি, ডাল আর কালিজিরা ভর্তা। কয়লার মত কাল একটা বস্তু। ভাত মাখলেই কাল হয়ে যাচ্ছে। খেতেও ভাল না, তিতকুটে তিতকুটে ভাব।
মা বললেন, এই ভর্তাটা তোর বাবার খুব প্রিয়। তোর বাবা খুব আগ্রহ করে খেত। এখন আর খেতে পারে না।
আমি বললাম, এখনো নিশ্চয়ই খায়। নতুন মা বেঁধে বেঁধে যত্ন করে খাওয়ান।
মা বললেন, ঐ ধুমসী সেজেই কূল পায় না বেঁধে খাওয়াবে কী? তোর বাবার কী পছন্দ, কী অপছন্দ ঐ ধুমসী তার কিছুই জানে না।
তুমি জানলে কী করে?
একদিন ঐ বাসায় গিয়েছি ধুমসী নাস্তা দিয়েছে নুডলস। নুডলস তোর বাবার দুচক্ষের বিষ। তার কাছে না-কি দেখতে কৃমির মত লাগে। বাসায় আমি
কোনদিন এই কারণে নুডলস রান্না করি নি। ধুমসী সমানে রাধছে।
নতুন মার নুডলসই হয়ত এখন বাবার কাছে অমৃতের মত লাগছে। বাবা সোনামুখ করে খাচ্ছেন। বাটিরটা শেষ হয়ে গেলে বলছেন, ওগো কৃমি ভাজা আরেকটু দাও খেতে মজা হয়েছে।
মা কঠিন গলায় বললেন, তুই নতুন মা নতুন মা করছিস কেন?
আমি বললাম, বাবার স্ত্রীকে মা ডাকব না? তাছাড়া তিনি নতুনতো বটেই। তুমি পুরানো মা উনি নতুন মা।
মা থালা সরিয়ে উঠে পড়লেন। আমি সাধ্য সাধনা করলাম না, কারণ তাতে লাভ হবে না। মার ভাত-রাগ কঠিন রাগ। সহজে এই রাগ ভাঙ্গে না।
রাতে ঘুমুতে যাবার সময় বললেন, তুই দূরে সরে ঘুমো গায়ের উপর এসে পড়বি না। গরম লাগে।
আমি বললাম, গরম কোথায় তুমিতো কম্বল গায়ে দিচ্ছ।
সরে ঘুমুতে বললাম, সরে ঘুমো।
আমি সরে গেলাম। খুব ভাল করেই জানি আমাকে দূরে সরিয়ে মা বেশিক্ষণ থাকতে পারবেন না কিছুক্ষণের মধ্যে নিজেই আমার কাছে সরে আসবেন। আমি যেমন মায়ের গায়ের গন্ধ ছাড়া ঘুমুতে পারি না, মার বেলাতেও তাই। তিনিও আমার গায়ের গন্ধ ছাড়া ঘুমুতে পারেন না।
বকুল!
কী মা।
আমি একজন দুঃখী মহিলা। দুঃখী মহিলাকে কি আরো বেশি দুঃখ দিতে আছে?
দুঃখী মহিলা বলেইতো তোমাকে দুঃখ দি।
ও আচ্ছা।
মা ঘুম আসছে না। একটা গল্প বল। গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ি।
আমি গল্প জনি না।
নিজের জীবনের গল্প বল। এইগুলি শুনতে আমার ভাল লাগে।
মা জবাব দিলেন না। ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেললেন। আমি মার কাছে এগিয়ে এলাম। তার গায়ে একটা হাত তুলে দিলাম। মা ঝটকা মেরে সেই হাত সরিয়ে দিলেন না।
মা!
কী?
তোমার বিয়ের গল্প বলতো মা। এই গল্প আমি যতবার শুনি ততবার ভাল লাগে।
আজ থাক আরেকদিন বলব। আজ শরীরটা ভাল লাগছে না। মনে হয় জ্বর আসছে।
জ্বর নেই মা, তোমার গা ঠাণ্ডা। গল্পটা বল রিকশা থেকে ধুপ করে পড়ে গেলে সেখান থেকে শুরু কর। জায়গাটা যেন কোথায়? কাওরান বাজার না?
বকু, ঘুমো। আমার শরীরটা আসলেই ভাল লাগছে না।
অসাধারণ এই গল্পটা তুমি বলবে না?
মা আবারো নিঃশ্বাস ফেললেন। আজ আর গল্প হবে না। আমি ঘুমুবার আয়োজন করছি। আয়োজন মানে চোখ বন্ধ করে ফেলা। চোখ বন্ধ করে মজার মজার কিছু দৃশ্য কল্পনা করা।
বকু!
কী মা?
ঘটনাটা কাওরান বাজারে ঘটে নি। কাকরাইলে ঘটেছে। ট্রাফিক সিগন্যাল আছে না–ঐ জায়গায়।
তুমি যাচ্ছিলে রিক্সা করে তাইতো? সময় যেন কত?
দুপুর। নিউ মার্কেটে স্যান্ডেল কিনতে গিয়েছিলাম। কোনটাই পছন্দ হয় না। বলতে গেলে সব একই ডিজাইন। থোর বড়ি খাড়া খাড়া বড়ি থোর। সেখান থেকে গেলাম নিউ এলিফেন্ট রোড এই ভাবে দেরি হয়ে গেল।
তারপর?
একটা রিকশা নিলাম।
রিকশা নিলে কেন মা। তোমার উচিত ছিল বেবী টেক্সি নেয়া।
বেবী টেক্সিই নিয়েছিলাম। বেবী টেক্সিতে বসে আছিতো বসেই আছি–টেক্সি আর স্টার্ট নেয় না। শেষে বিরক্ত হয়ে নেমে পড়েছি। বেবী টেক্সি থেকে নেমে যেই রিকশায় উঠেছি— ওমি বেবী টেক্সিটা স্টার্ট নিল।
মা একেই বলে ভবিতব্য। তুমি ধৈর্য ধরে আর দুমিনিট অপেক্ষা করলে ঘটনাটা ঘটত না। তারপর কী হল বল।
মা গল্প থামিয়ে ক্লান্ত গলায় বললেন, শরীরটা আসলেই ভাল লাগছে না। ভালমত দেখতো জ্বর আছে নাকি।
আমি কপালে হাত দিলাম। হা জ্বর আসছে। দ্রুতই আসছে। কপাল গরম।
মার জ্বর রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুব বাড়ল। তিনি ছটফট করতে লাগলেন। কাল আমার শুটিং। শুটিং এর দৃশ্য মা দেখতে পাবেন না। জীবনের প্রথম তার কন্যা ছবিতে অভিনয় করবে। তিনি জ্বর গায়ে বিছানায় ছটফট করবেন।
মা মাথায় পানি ঢালব?
না।
মাথা টিপে দেব মা?
না। বাতিটা জ্বালিয়ে রাখ। কেমন জানি ভয় ভয় লাগছে।
কিসের ভয়?
জানি না কিসের ভয়। বাতি জ্বালাতে বললাম, বাতি জ্বালা।
আমি বাতি জ্বালিয়ে থার্মোমিটারে মার জ্বর মাপলাম। একশ তিন পয়েন্ট পাঁচ। তবে জ্বর মনে হয় কমছে। গা ঘামছে।
