মা পানি আনতে গেলেন। তাঁর শুকনো মুখ দেখে আমারই মায়া লাগছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি কেঁদে ফেলবেন। আমার মনে হচ্ছে অনেকদিন তাঁকে কাঁদানো হয় না, আজ কাদিয়ে দিলে কেমন হয়?
বকু নে পানি নে।
পানির গ্লাস হাতে নিলাম। ইচ্ছা করছে মাতালের ভূমিকায় কিছুক্ষণ অভিনয় করি। উল্টো পাল্টা কথা বলি। মার আক্কেলগুড়ুম করে দেবার এটাই হবে সহজ বুদ্ধি। একটু টেনে টেনে কথা বলতে হবে। বেশির ভাগ কথাই হবে অর্থহীন তবে কথা যা বলা হবে তার সবটাই হতে হবে সত্যি। মাতালরা মিথ্যা কথা বলতে পারে না। মিথ্যা বলার জন্যে মস্তিষ্কের যে নিয়ন্ত্রণ দরকার মাতালের তা থাকে না। এটা আমার শোনা কথা। সোহরাব চাচার কাছ থেকে শুনেছি।
পানির গ্লাসে একটা চুমুক দিলাম। পানিটা খেলাম না। মুখের ভেতর রেখেই গার্গলের মত করে বললাম, কেমন আছ মা?
মা থমথমে গলায় বললেন, তুই মুখে পানি নিয়ে কথা বলছিস কেন?
গার্গল করতে করতে কথা বলছি। কথা বোঝা যাচ্ছে না?
পানি গিলে ফেলে স্বাভাবিক ভাবে কথা বল।
ডিরেক্টর সাহেবকে তুমি এখনো খবর দিচ্ছ না কেন? উনি না বলে গেলেন জ্ঞান ফিরলেই তাকে খবর দিতে হবে?
তুই জানলি কীভাবে?
আমিতো জেগেই ছিলাম মটকা মেরে পড়েছিলাম। তোমরা কে কী বলছ বই শুনতে পাচ্ছিলাম।
তোর সঙ্গে আমার কথা আছে বকু। কথাতো বলছি, কথা বলছি না?
তোর কাণ্ডকারখানা আমার একেবারেই ভাল লাগছে না। আমার মনে হচ্ছে তোর সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে।
সর্বনাশের সবে শুরু। তুমি শুরু দেখেই ঘাবড়ে গেলে? আসল যখন হবে তখন কী করবে?
আসল মানে?
এখনতো মদ খেয়েছি নির্জনে। পুকুর পাড়ে লিচু গাছের নীচে। তখন মদ খাব ডিরেক্টর সাহেবের ঘরে। দরজা থাকবে ভেজানো। ঘর আধো আলো, আধো
অন্ধকার।
আমি খিল খিল করে হাসছি এবং প্রতি মুহূর্তেই ভাবছি এই বুঝি মা আমার উপর ঝাপিয়ে পড়েন। মা তা করলেন না। তিনি তাকিয়েই আছেন। তার চোখে পানি জমছে, কিন্তু কেঁদে ফেলার স্তরে এখনো আসেন নি। হয়ত ভাবছেন তার আদরের কন্যা এখনো মাতাল।
বকু তুই শুয়ে থাক। সকালে কথা বলব।
ওমা ভাত টাত না খেয়ে শুয়ে পড়ব কেন? রাতে ভাত না খেলে এক চড়ুইয়ের রক্ত কমে যায়, তাছাড়া আমার মোটেই ঘুম পাচ্ছে না। আজ আমি সারা রাত জেগে থাকব।
বকু।
হুঁ।
তোর ছবিতে কাজ করার দরকার নেই। চল আমরা চলে যাই।
খুব ভাল কথা। চল তাই করি। তুমি যাও ডিরেক্টর সাহেবকে বুঝিয়ে বল— বুঝিয়ে বললে তিনি বুঝবেন। আর তুমি যদি বুঝিয়ে বলতে না পার, আমি বলছি।
আমি বিছানা থেকে নামার উপক্রম করতেই মা এসে আমাকে ধরে ফেললেন। অসম্ভব আদুরে গলায় বললেন, বকু শুয়ে থাক। আয় আমি তোর মাথায় হাত বুলিয়ে দি।
আমি শুয়ে পড়লাম। মা আমার মাথায় হাত বুলুচ্ছেন। চুলে বিলি কেটে দিচ্ছেন। মনে হচ্ছে দ্রুত আমার বয়স কমে যাচ্ছে। এই কাজটা আর কেউ পারে শুধু মায়েরা পারেন। সন্তানের বয়স আদর করে করে কমিয়ে দিতে পারেন। আমার এখন ইচ্ছে করছে গুটিশুটি মেরে মায়ের বুকের কাছে শুয়ে থাকি।
বকু!
হুঁ।
তোর মধ্যে একটা অস্থির ভাব চলে এসেছে। তুই একদন্ড স্থির থাকতে পারছিস না। কারণটা কী বলতো?
আমার মনে হয় আমি কারো প্রেমে পড়েছি।
মা হাসি মুখে বললেন, কার প্রেমে পড়েছিস?
ঠিক বুঝতে পারছি না, মনে হয় ডিরেক্টর সাহেবের।
মা হো হো করে হেসে ফেললেন। আমি মার সঙ্গে গলা মিলিয়ে হাসছি–যেন এমন হাস্যকর কথা এর আগে আমরা কেউ শুনি নি।
ডিরেক্টর সাহেবের প্রেমে কেন পড়েছি শুনতে চাও মা?
মা হাসি চাপতে চাপতে বললেন, কেন?
উনার জ্ঞানী ধরনের কথাবার্তা শুনে। হিরোশিমায় বোমা পড়েছিল আটই আগস্ট সকাল আটটা পনেরো মিনিটে এই জ্ঞানের কথা উনি না থাকলে আমি শুনতেই পেতাম না। উনাকে দেখলে কী মনে হয় জান মা?
কী মনে হয়?
মনে হয় জ্ঞান ঘামের মত টপ টপ করে পড়ছে।
মা হাসি চাপতে চাপতে বললেন, খবর্দার এইসব বাইরে আলোচনা করবি। উনার কানে গেলে উনি মনে কষ্ট পাবেন।
পাগল হয়েছ এইসব আমি আলোচনা করব? আমার ৪৬টা ক্রমোজমের ২৩টা আমি পেয়েছি তোমার কাছ থেকে। এই ২৩টা ক্রমোজম ভর্তি বুদ্ধি। সেই বুদ্ধি আমার আছে না? উনাকে দেখলে আমি কী করি জান? আমি হতাশ একটা ভাব ধরে এক দৃষ্টিতে উনার দিকে তাকিয়ে থাকি। যাতে উনি মনে করেন আমি উনার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি।
এ রকম করিস কেন?
মজা লাগে এই জন্যে করি।
মা আমাকে আরো কাছে টানলেন। তাঁর মুখে কেমন শান্তি শান্তি ভাব। মেয়ে সম্পর্কে তাঁর মনে যে দুঃশ্চিন্তা ছিল তা ঝড়ের মত উড়ে গেছে।
বকু!
বল মা।
ভদকা মেশানো সরবতটা তুই কী মনে করে খেলি বলতো মা?
রাগ করে খেয়েছি। সোহরাব চাচা পাপিয়া ম্যাডামকে এই সরবত দিলেন, মাকে দিলেন না, তখনই রাগ লাগছিল। তাছাড়া মাতাল হয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল কেমন লাগে।
আর কখনো এরকম করবি না।
আচ্ছা করব না। মা শোন, আমার ক্ষিধে লেগেছে।
আমাদের খাবার ঘরে দিয়ে যাবে।
ইউনিটের খাবার সবার সঙ্গে মিলে খেতে ইচ্ছা করে চল নীচে গিয়ে হৈ হৈ করে খেয়ে আসি।
সত্যি খেতে চাস?
হুঁ চাই।
তারপর সেখানে গিয়ে তুই যদি উল্টোপাল্টা কোন কথা বলিস?
কোন উল্টোপাল্টা কথা বলব না।
মা বিছানা থেকে নামলেন। তিনি চুল আঁচড়াবেন, শাড়ি পাল্টাবেন। হয়তোবা ঠোঁটে হালকা করে লিপস্টিকও দেবেন। আমরা মা-মেয়ে হাসি মুখে নীচে খেতে যাব। মা খেতে খেতেই জেনে নেবেন আজ সারাদিনে কোথায় ইন্টারেস্টিং কী ঘটনা ঘটল।
