আমার জ্ঞান আছে। ভালই আছে। অনেকক্ষণ হল মটকা মেরে পড়ে আছি। ঘটনাটা কী বোঝার চেষ্টা করছি। দুর্বোধ্য কোন ঘটনা ঘটে নি। নানান ধরনের কথা বার্তা শুনে যে ছবিটি পাওয়া যাচ্ছে তা হচ্ছে–জলিলের মা ছুটে এসে খবর দেয়, বকুল আপা অজ্ঞান হয়ে লিচু গাছের নীচে পড়ে আছে। মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। সে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে অজ্ঞান হবার আগের অংশ— সরবত অংশ বাদ দিয়ে যায়। আমাকে লিচু গাছের নীচ থেকে ধরাধরি করে আনা হয়। তখন সাময়িক ভাবে আমার জ্ঞান ফেরে এবং আমি ভূতে ধরা রুগীর মত কিছুক্ষণ হাসাহাসি করে প্রচুর বমি করতে থাকি। তখনই সরবত অংশ প্রকাশ হয়ে পড়ে।
এখন আমি বিছানায় শুয়ে আছি। ঘরে বাতি জ্বলছে, কাজেই রাত। কত রাত জানি না। একজন ডাক্তার এসে আমাকে দেখে গেছেন। ডাক্তার বলে গেছেন— ভয়ের কিছু নেই। ইউনিটের লোকজন আমাকে দেখতে আসছে। মা তাদেরকে অতি দ্রুত ঘর থেকে বের করে দিচ্ছেন। সেলিম ভাই যখন এলেন তখন আমি পুরোপুরি জেগে। সেলিম ভাই ক্ষীণ গলায় বললেন, এখন ওর অবস্থা কেমন? মা বললেন, অবস্থা ভাল, ঘুমুচ্ছে। তুমি এখন যাওতো কথা বার্তা শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেলে অসুবিধা। ডাক্তার বলেছে প্রচুর ঘুম দরকার।
আমি বুঝতে পারছি সেলিম ভাই যাচ্ছেন না। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন।
বকুলের হয়েছে কী? সারাদিন রোদে ঘোরাঘুরি করেছে। রোদ মাথায় চড়ে গিয়ে এই অবস্থা। ডাক্তার বলেছেন সর্দি গর্মি, যাই হোক এখন ভাল। তুমি যাওতো।
আমি বুঝতে পারছি সরবতের অংশ প্রকাশিত হলেও পুরোপুরি প্রকাশিত হয় নি। সবাই জানে না। আমার বুদ্ধিমতী মা ব্যাপারটা ধামাচাপা দিয়ে ফেলেছেন। তাঁর মেয়ে ভদকা খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকবে এটা জীবন থাকতে তিনি প্রকাশিত হতে দেবেন না।
দরজায় টুক টুক শব্দ হল। মা যেভাবে আমাকে ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন তা থেকেই বুঝলাম ডিরেক্টর সাহেব এসেছেন। আমি এখন বিছানায় উঠে বসব কি-না বুঝতে পারছি না।
ডিরেক্টর সাহেব ঘরে ঢুকলেন। চেয়ার টেনে আমার মাথার কাছে বসলেন।
এখন অবস্থা কী?
মা কান্না কান্না গলায় বললেন, বুঝতে পারছি না।
জ্ঞান ফিরেছে?
জ্বি জ্ঞান ফিরেছে। ডাক্তার সাহেব ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন। এখন ঘুমুচ্ছে।
জ্বর আছে?
একটু মনে হয় আছে।
তিনি হাত বাড়িয়ে আমার কপালে রাখলেন। সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ একটা ব্যাপার হল আমার সমস্ত শরীর জমে গেল। মনে হল আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। আমার মাথার ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেছে। কান্না আটকে রাখলে গলার কাছে শক্ত ডেলার মত জমে থাকে তেমনি কিছু একটা জমে আছে।
জ্বরতো নেই।
তিনি হাত সরিয়ে নিলেন। আমার শরীর স্বাভাবিক হল— শুধু গলার কাছে শক্ত ডেলাটা থেকে গেল। চিৎকার করে কিছুক্ষণ না কাঁদলে এটা মনে হয় যাবে
হয়েছিল কী?
মা কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, মঈন ভাই আমি কিছুই জানি না। জালালের মা হঠাৎ এসে বলল, লিচু গাছতলায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। শুনেই আমার হাত পা ঠাণ্ডা।
শুধু শুধু অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকবে কেন? ওর কি মৃগী রোগ আছে?
ছি! ছি! মঈন ভাই কী বলেন, মৃগী রোগ থাকবে কেন? রোদে সারাদিন রেছে …। মনে হয় রোদ মাথায় চড়ে কিছু একটা হয়েছে।
ঘুম ভাঙ্গলে আমাকে খবর দেবেন আমি কথা বলব।
জ্বি আচ্ছা।
আরেকটা কথা, ভয় পাবেন না। ভয়ের কিছু নেই। ডাক্তার যদি বলেন আমি সঙ্গে সঙ্গে ওকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পাঠিয়ে দেব।
সেটা আমি জানি মঈন ভাই। আপনি আছেন বলেইতো আমি নিশ্চিত।
মা তাঁর বিখ্যাত তেলতেলানি হাসি হাসছেন। ডিরেক্টর সাহেব বের হয়ে গেলেন। আমি বুঝতে পারছি—আমার অজ্ঞান হবার খবর সবাই জানলেও সরবত বিষয়ক জটিলতার খবর জানে না। এই অংশটা ভালমতই গোপন করা হয়েছে। মা, জালালের মা, সোহরাব চাচা এবং সুবীরদা হয়ত জানেন। যখন বমি করছিলাম সুবীরদা পাশে ছিলেন। তিনি হতভম্ব গলায় বলেছিলেন— একী রক্ত বমি করছে নাকি? সোহরাব চাচা বললেন, রক্ত না। তরমুজের সরবত বের হয়ে আসছে। যত বের হয় ততই ভাল। তারপরই শুনলাম সোহরাব চাচা জালালের মাকে বলছেন, একে সরবত কে খাইয়েছে?
জালালের মা তীক্ষ গলায় বলল, আমারে জিগান ক্যান? কে খাওইছে আমি জানি না।
আচ্ছা ঠিক আছে। খাওয়াও নি ভাল করেছ। চেঁচিও না। চেঁচানোর কিছু হয় নি।
আমার দিকে এমন গরম চোখে চাইবেন না। জালালের মা গরম চোখের ধার ধারে না।
সোহরাব চাচার সঙ্গে জালালের মার কথাবার্তা এই পর্যন্তই আমার কানে গেছে তারপর হঠাৎ মাথা ঘুরে জগৎ অন্ধকার হয়ে গেল। সেই অনুভূতিটা খুব যে খারাপ ছিল তা না।
আমি বিছানায় উঠে বসে সহজ গলায় বললাম, মা পানি খাব। মা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন। তিনি সম্ভবত ভাবতেই পারেন নি আমি এত সহজে বিছানায় ওঠে বসে পানি খেতে চাইব। মা তাকিয়ে আছে আমার দিকে, দ্রুত ভাবছেন–মেয়ের উপর কঠিন আক্রমণ এখনই শুরু করবেন, না দেরি করবেন। আমি বললাম, মা দেখতো কটা বাজে।
নটা বাজে?
তোমাদের রাতের খাওয়া হয়ে গেছে?
না।
খাওয়ার ডাক পড়েছে?
না।
চল যাই খোঁজ নিয়ে আসি আমার খুব ক্ষিধে লেগেছে।
মা কঠিন গলায় বললেন, তুই সন্ধ্যাবেলা কী খেয়েছিলি?
আমি আগের মতই সহজ স্বাভাবিক গলায় বললাম, ভদকা খেয়েছিলাম। তরমুজের সরবতের সঙ্গে মেশানো ভদকা।
কেন খেয়েছিলি?
ওমা খাবার জিনিস খাব না? আমি হচ্ছি ছবির দুনম্বর নায়িকা। এক নম্বর নায়িকা খেতে পারলে দুনম্বর নায়িকা পারবে না কেন? কী ব্যাপার মা কতক্ষণ আগে তোমাকে পানি দিতে বললাম, এখনোতো দিচ্ছ না।
