তুই নিজে নিজে মেকাপ তুলছিস কেন? সুবীরকে বল। তুই দুই নম্বর নায়িকা হয়েছিস বলেই সব কাজ নিজে নিজে করবি?
সুবীরদা ব্যস্ত। ফরহাদ সাহেবকে মেকাপ দিচ্ছেন।
ও আচ্ছা ভুলেই গেছি ফরহাদ সাহেবতে চলে এসেছেন। সেলিম গাধাটা গালে জুতার বাড়ি খেয়েছে। উচিত শিক্ষা হয়েছে। পিপিলিকার পাখা উঠলে যা
মা এইসব তুমি কী বলছ?
ঠিকই বলছি। যে চামড়া দিয়ে জুতার শুকতলা বানানো হয়—সেই চামড়া দিয়ে কখনো মানিব্যাগ হয় না।
আমি বাথরুম থেকে বের হলাম। মার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। মিষ্টি করে হাসলাম। ক্যামেরায় ছবি তোলার সময় দেখি হাসতো বললে যে ভঙ্গিতে দাঁত বের না করে মুখ টিপে হাসা হয়, সেই ভঙ্গির হাসি। তারপর মাকে কিছু না বলে ঘর থেকে বের হয়ে এলাম।
জালালের মা আমাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসছে। তার এগিয়ে আসার মধ্যে কেমন ভিজে বিড়াল ভিজে বিড়াল ভাব। গোপন কোন ঘটনা সে বোধ হয় জেনে ফেলেছে। গোপন ঘটনায় নতুন কিছু ডালপালা লাগিয়ে সে এখন বলবে।
বকুল আপা!
হুঁ।
সরবত খাবেন?
কিসের সরবত?
তরমুজের সরবত।
হ্যাঁ খাব।
এর মধ্যে একটু ইয়ে দেওয়া আছে। সরবত মিজান ভাই বানিয়েছেন। উনি আবার ইয়ে ছাড়া কিছু বানাতে পারেন না।
ইয়ে টা কী?
ভদকা। খুবই সামান্য দিয়েছেন যাতে মেয়েরাও খেতে পারে। নেশা হবে। খাবেন আপা?
হুঁ খাব।
ভদকার মজাটা কী জানেন আপা?
না জানি না–কী মজা?
খেলে মুখে গন্ধ হয় না।
তাহলেতো খুবই ভাল। চলুন যাই ভদকা খাই।
ছিঃ ছিঃ ভদকা না। সরবত। পাঞ্চ। সামান্য ইয়ে দেওয়া।
চলুন আজ মজা করে সামান্য ইয়ে মেশানো সরবত খাব। মা জানবে নাতো?
পাগল হয়েছেন আপা? কাকপক্ষী জানব না। আপনি পুকুর ঘাটে যান আমি আসতেছি।
আমি পুকুরঘাটের দিকে রওনা হলাম। পুকুরটা বিশাল। তবে পুকুরের পানির দিকে তাকালে মন খারাপ হয়ে যায়। ময়লা পানি। নানান জায়গায় বাঁশ পোতা হয়েছে। মাছের চাষ করলে নাকি সারা পুকুরে বাঁশ পুততে হয়। একটা ঘাট আছে—সেই ঘাটও ভাঙ্গা। তবে পুকুরের চারদিকে গাছ পালা। পুকুরের মালিক আসলাম খাঁ। পীর মানুষ। তাঁর কথা পরে বলব। তিনি খুব আনন্দিত গলায় অদ্ভুত ধরনের শুদ্ধ ভাষায় বলেছিলেন–আপা দেখেন এমন কোন গাছ নাই যাহা আমি রুপন করি নাই। যেখানে যত বৃক্ষ পেয়েছি রুপন করিয়াছি।
আমি বললাম, কী কী গাছ রুপন করেছেন একটু বলুনতো। ভদ্রলোক গড়গড় করে পড়া মুখস্ত করার মত বললেন—কাঁঠাল, আম, জলফই, জামরুল, জাম্বুরা, কৎবেল, আতা, লেচু। বসতবাড়িতে লেচু গাছ রুপন করা ঠিক না। নির্বংশ হয়, তারপরেও শখ করে লাগিয়েছি। লেচু যখন পাকে তখন খুবই বাদুরের উৎপাত হয়।
লিচু কখন পাকে?
জ্যৈষ্ঠমাসের আগে এখন ফুল ফুটেছে এই দেখেন ফুল।
আমি মুগ্ধ চোখে লিচু গাছের ফুল দেখলাম। সবুজ ফুল। গাছ ছেয়ে আছে বুজ রঙের ফুলে। আমের মুকুলও সবুজ হয় কিন্তু সবুজের মধ্যেও হলুদ ভাব থাকে। লিচু ফুলে সেই হলুদ ভাব নেই।
আমি লিচু গাছের নীচে বসলাম। বসার জায়গাটা সুন্দর। ঘাস আছে। গাছে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসা যায়। পুকুরের পানি আরো পরিষ্কার হলে বসে থাকতে খুব ভাল লাগত। জালালের মা টিনের একটা জগ এবং দুটা চায়ের কাপ নিয়ে উপস্থিত হল। তার চোখ চকচক করছে। কথা বলার ধরনও পাল্টে গেছে। ফিস ফিস করে কথা বলছে। আমি এক চুমুকে গ্লাস শেষ করলাম। তিতকুট একটা ভাব আছে কিন্তু খেতে ভাল।
আফা কেমন লাগছে?
খুব ভাল। নেশা হচ্ছে।
কী যে কন আফা এক কাপে কী হইব।
দাও আরেক কাপ দাও।
জালালের মা খুব আগ্রহ করে আরেক কাপ দিল। তারপর আরেক কাপ, আবার আরেক কাপ।
আফা আর খাইয়েন না।
কেন আর পাবো না কেন?
আচ্ছা মনে চাইলে খান। সিগারেট খাবেন? মদের উপরে সিগারেটের ধোয়া পড়লে নিশা ভাল হয়।
সিগারেট? হুঁ খাব।
শাড়ির আঁচলের ভাঁজ থেকে ফাইভ ফিফটি ফাইভের প্যাকেট বের হল। দেয়াশলাই বের হল। আমি সিগারেট ধরিয়ে আরেক কাপ সরবত নিলাম। মাথা সামান্য ঝিম ঝিম করছে। এর বেশিতো কিছু হচ্ছে না। এই ঝিম ঝিমটা সিগারেটের ধোয়ার জন্যেও হতে পারে। আমি পুরোপুরি মাতাল হতে চাচ্ছি। মাতাল হলে কেমন লাগে দেখতে চাই। মাতাল কি হব?
আফা!
হুঁ।
কাল রাতের ঘটনা কিছু শুনেছেন?
না, কী ঘটনা?
খুব লইজ্জার ব্যাপার।
জালালের মা এম্নিতে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে। এখন ভদকার ঝেকেই হয়ত গেরাইম্যা ভাষা বের হচ্ছে। লজ্জাকে বলছে–লইজ্জা। আমি বললাম লইজ্জার ব্যাপারটা কী?
বাদ দেন। সব শোনা ভাল না।
তাহলে বাদই থাক।
আমি মনে মনে হাসছি। জালালের মা লইজ্জার ব্যাপারটা বলার জন্যে মরে যাচ্ছে। আমি বাদ দিতে বললেও সে বাদ দেবে না।
ফিলিম লাইনে সুখ নাই আফা।
কোন লাইনে সুখ?
সব লাইনে সুখ–ফিলিম লাইন বাদ। কাল রাতে যে লইজ্জার ঘটনা ঘটেছে এই ঘটনা ফিলিম লাইন ছাড়া ঘটে না। আপনের বয়স অল্প আপনেরে বলা ঠিক না।
থাক তাহলে বলবেন না।
ঘটনা ঘটেছে রাত তিনটায়।
থাক থাক বলবেন না।
জালালের মার মনটা খারাপ হয়ে গেল। জগের সরবত শেষ হয়ে গেছে। সে আরো সরবত আনতে গেছে। আমার ঘুম পাচ্ছে। ভদকার নেশায় কি ঘুম পায়? শরীরও কেমন অবশ অবশ লাগছে। ভ্যাপসা গরমটাও আরামদায়ক মনে হচ্ছে। দূরের গারো পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভাল লাগছে। পাহাড় খুব উঁচু না–তারপরও মনে হচ্ছে শাদা শাদা মেঘ পাহাড়ের গায়ে লেগে আছে। নজরুলের একটা গান আছে না? পাহাড়ে হেলান দিয়ে আকাশ ঘুমায় ঐ। গানটা ঠিক হয় নি। পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে আকাশ ঘুমুচ্ছে না–আসলে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমুচ্ছে। জালালের মা আসছে না। আমি কুণ্ডুলী পাকিয়ে শুয়ে পড়েছি। রোদ আমার গায়ে পড়ছে। আমার নড়তে ইচ্ছে করছে না। রোদটাও ভাল লাগছে। ভদকা খেলে কি সবই ভাল লাগে? আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। ঘুমিয়ে পড়ার আগে আমার কেন জানি মনে হল–ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখব আমি অন্য এক মানুষ। আমার নাম রুমালী নাঅন্য কিছু। আমি দুর্গাপুরের এক গন্ডগ্রামে লিচু গাছের নীচে শুয়ে নেই। আমি শুয়ে আছি ঝাউ গাছের নীচে–একটু দূরেই সমুদ্র। সমুদ্র খুব অশান্ত। বড় বড় ঢেউ উঠছে। আমার চারপাশে কেউ নেই। সমুদ্রে প্রবল জোয়ার এসেছে। পানি বাড়ছে। পানি এগিয়ে আসছে আমার দিকে। যে কোন মুহূর্তে প্রবল একটা ঢেউ এসে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। যাক ভাসিয়ে নিয়ে যাক। আমি কেয়ার করি না। I dont care.
বিছানায় কুণ্ডুলী পাকিয়ে
আমি বিছানায় কুণ্ডুলী পাকিয়ে শুয়ে আছি। আমার চুল ভেজা অর্থাৎ মাথায় প্রচুর পানি দেয়া হয়েছে। মা পায়ে গরম তেল মালিশ করে দিচ্ছেন। অচেতন রুগীদের ক্ষেত্রে এই কাজটি করা হয়। যা চলছে তার নাম জ্ঞান আনানোর প্রক্রিয়া।
