খারাপ লাগার কিছু নেই মা। সবই ভাগ্য। ভাগ্য ব্যাপারটা যে কী তা ছবির লাইনের লোক ছাড়া কেউ বুঝবে না। দুশ টাকা শিফটের এক্সট্রা মেয়েকে আমি নিজে কোটিপতি হতে দেখেছি। আবার দেখেছি কোটিপতি থেকে দুশ টাকা দামের এক্সট্রা হয়েছে। সবই ভাগ্য। সেলিমের ভাগ্যে যে জিনিস নাই সে জিনিস তার হবে না।
সবই ভাগ্য?
অবশ্যই ভাগ্য। তোমার নিজের কথাই ধর। দিলু চরিত্র তোমার করার কথা ছিল না। অন্য একজনকে সাইনিং মানি দেয়া হয়েছিল। হঠাৎ স্যার একদিন কোন এক ম্যাগাজিনে তোমার ছবি দেখলেন। আমাকে বললেন, তোমাকে খবর দেয়ার জন্যে। আমি তোমাকে খবর দিলাম। স্যারের পছন্দ হল না। তোমরা চলে গেলে। যেদিন দুর্গাপুর রওনা হব তার একদিন আগে বললেন, বকুল মেয়েটাকে খবর দাও। এটা ভাগ্য না?
আমি চুপ করে রইলাম। সোহরাব চাচা গম্ভীর গলায় বললেন, আমরা নিজের মনে খেলে যাচ্ছি। খুব আনন্দ, ভাল খেলা হচ্ছে। সুতা কিন্তু অন্যের হাতে।
আমি ঘরের দিকে রওনা হলাম। সোহরাব চাচা আমার পেছনে পেছনে আসছেন। হঠাৎ আমার মনে হল–সোহরাব নামের এই মানুষটা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। তার ছেলেমেয়ে কয়জন। কার কী নাম–কিছুই জানা নেই। অথচ কর ঘনিষ্ট ভাবে মিশছি। ছবি শেষ হয়ে যাবে আর তার সঙ্গে কোণ যোগাযোগ থাকবে না।
সোহরাব চাচা?
মা বল।
যে গাছটার নীচে আমি দাঁড়িয়েছিলাম সেই গাছটার নাম কী?
ছাতিম গাছ। গাছের নাম দিয়ে কী হবে?
এম্নি। জানতে ইচ্ছে করল। একজন অবশ্যি বলেছে–কাঠবাদাম গাছ। আপনারটা ঠিক, না তারটা ঠিক কে জানে।
সোহরাব চাচা গাছ প্রসঙ্গে কিছু বললেন না, চিন্তিত গলায় বললেন— রোদের মধ্যে হেঁটে যেও না। আমি তোক দিয়ে দিচ্ছি। মাথার উপর ছাতি ধরবে।
কিচ্ছু ধরতে হবে না।
আমি সোহরাব চাচাকে পেছনে ফেলে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি। হাঁটার গতি আরো বাড়ালাম। আমাকে এই ভাবেই দৌড়ে পুকুর ঘাটে যেতে হবে। তারপর হঠাৎ পুকুরের পানিতে নিজের ছায়া দেখে চমকে যেতে হবে। শাড়ি পরে দৌড়ানো মুশকিল। দৌড়টা ভাল হচ্ছেতো? নকল দৌড় মনে হচ্ছে নাতো? স্যান্ডেল পায়ে দৌড়ানো যাচ্ছে না। খালি পায়ে দৌড়াতে হবে। খালি পা হব কী ভাবে? পা থেকে স্যান্ডেল ফেলে দেয়ার পেছনে কী যুক্তি দাঁড় করাব?
আশ্চর্য, ফরহাদ সাহেব মেকাপে বসেছেন। সুবিদা গম্ভীর মুখে কাজ করে যাচ্ছেন। ফরহাদ সাহেব টেবিলে পা তুলে প্রায় আধশোয়া হয়ে আছেন। তার চোখ বন্ধ। টেবিলের উপর বিয়ারের ক্যান। ক্যানের উপর মাছি উড়ছে। বিয়ার খেতে কি মিষ্টি? মিষ্টি না হলে মাছি উড়বে কেন? সেলিম ভাইকে তাহলে বাদ দেয়া হয়েছে। সাব্বিরের চরিত্র করছেন— মেগাস্টার ফরহাদ খান। যার যা ইচ্ছা করুক। আমাদের খেলার কথা আমরা খেলছি। কেউ ভাল খেলছি, কেউ মন্দ খেলছি। সুতাতো আমাদের হাতে নেই।
মা শরীর এলিয়ে পড়ে আছেন। তার চোখ বন্ধ, মাথার চুল ভেজা। মাথায় পানি ঢালা মনে হয় কিছুক্ষণ আগে শেষ হয়েছে। আমি পাশে দাঁড়াতেই চোখ মেললেন। মার প্রথম বাক্যটা হল— ঠোঁটের লিপস্টিক ভাল হয় নিতো।
আমি বললাম, তোমার শরীর এখন কেমন?
মা বললেন, শরীর কেমন সেটা পরের কথা। মেকাপ কেমন হল তুই আমাকে দেখিয়ে যাবি না? মেকাপ শেষ হল আর তুই চলে গেলি?
আমি এসেছিলাম, তুমি ঘুমুচ্ছিলে বলে জাগাই নি।
আবার মিথ্যা কথা। মিথ্যা কথা বলতে তোর মুখে একটু আটকাল না— ফাজিল মেয়ে—
মা উঠে বসলেন এবং আমি কিছু বোঝার আগেই প্রচন্ড চড় বসালেন। চড়ের জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না বলে বিছানায় কাত হয়ে পড়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গেই উঠে বসলাম। কিছুই হয় নি এমন ভঙ্গিতে বললাম, সকালে কিছু খেয়েছ মা?
না। তুই কি আয়না দিয়ে দেখেছিস তোকে কেমন বিশ্রী মেকাপ দিয়েছে? নাকটা মোটা লাগছে।
মোটা নাকতো মা মেকাপ দিয়ে চিকন করা যাবে না। ব্লেড দিয়ে কেটে ঠিক করতে হবে।
আমার কাছে জ্ঞান ফলাবি না। নাকে শেড দিয়ে মোটা নাকও চিকন করা যায়। তুই এক নম্বর নায়িকা হলে ঠিকই করত। দুই নম্বর নায়িকাতো, নাক মোটা থাকলেই বা কী, চিকন থাকলেই বা কী? কী ব্যাপার তুই যাচ্ছিস কোথায়?
মেকাপ তুলতে যাই।
শট হবে না?
না।
আমি জানতাম আজ তোর শট হবে না।
কীভাবে জানতে?
আজ মঙ্গলবার না? মঙ্গলবার তোর জন্যে অশুভ। আমি সব সময় দেখেছি
তোমার জন্যে কোনবারটা অশুভ মা?
তোর জন্যে যে বার অশুভ, আমার জন্যেও সে বার অশুভ। তুই আর আমি–-আমরাতো আলাদা না।
আমি বাথরুমে ঢুকে গেলাম। মেকাপ দেয়া যেমন কষ্টের মেকাপ তোলাও তেমন কষ্টের। খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার। গ্লিসারিণ দিয়ে ঘষে ঘষে তুলতে হয়। জোরে ঘষা লাগলে চামড়া উঠে যায়–যন্ত্রণা হয়। সবচে কষ্ট চোখের মেকাপ তোলা। চোখ জ্বালা করে।
মেকাপ তোলার পর আয়নায় নিজেকে দেখলাম। বাহ সুন্দর লাগছেতো। মিষ্টি একটা মুখ। সহজ সুন্দর এবং সরল। এই মুখের দিকে তাকিয়ে কারোর কি কোন দিন বলতে ইচ্ছে করবে–
আমি এনে দেব
তোমার উঠোনে সাতটি অমরাবতী।
ডান গাল লাল হয়ে আছে। মার চড় গালে বসে গেছে। আগে ব্যথা করে নি এখন চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে। ব্যথাটা কিছুক্ষণের মধ্যেই মাথায় উঠে যাবে।
আমি খুব শিগগিরই একদিন কঠিন গলায় মাকে বলব— মা তুমি আর কখনো আমার গালে হাত দেবে না। কখনো না। সেই শিগগিরটা কবে?
বকু! বকু?
আমি বাথরুম থেকেই মিষ্টি গলায় বললাম, কী হয়েছে মা?
