ম্যাডাম শান্ত গলায় বললেন, আমি আর খাব না। জগের সরবত অন্য কাউকে দিয়ে দিন।
জ্বি আচ্ছা।
ম্যাডাম গ্লাস হাতে এগিয়ে যাচ্ছেন। একটু আগে যে মগ দিয়ে কফি খাচ্ছিলেন সেই মগটা গাছের নীচে পড়ে আছে। সেই দিকে ফিরেও তাকালেন না। মগটা খুব সুন্দর। নিশ্চয়ই বিদেশ থেকে আনানো। ধবধবে শাদা মগে টকটকে লাল অক্ষরে লেখা— KISS ME.
আমি মগটা তুলে সোহরাব চাচার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, চাচা একটু সরবত দিয়ে মগটা ধুয়ে আমাকে দিনতো। আমার খুব লোভ লাগছে।
তোমার খাওয়ার দরকার নেই।
দরকার নেই কেন?
এটা প্লেইন সরবত না। এখানে ভদকা মেশানো আছে।
ভদকা মেশানো সরবতই খেয়ে দেখি কেমন লাগে। বেশি না— সামান্য।
সোহরাব চাচা বললেন, না।
তাকে খুবই চিন্তিত মনে হচ্ছে। ফরহাদ সাহেব হঠাৎ এসে পড়ায় তিনি মনে হয় দারুণ চিন্তায় পড়ে গেছেন। এতটা চিন্তিত হবার মত কিছু ঘটেছে কি?
মিস রুমাল!
জি চাচা?
শুধু শুধু গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছ কেন? ঘরে চলে যাও। মেকাপ উঠিয়ে বিশ্রাম কর। তোমার মা তোমার খোঁজ করছিলেন। তাঁর জ্বরতো ভাল বেড়েছে। একশ তিন। মাথায় পানি দিয়ে জ্বর কমাতে বলেছি। সিটামল খাওয়ানো হয়েছে। একজন ডাক্তার খবর দিয়েছি সন্ধ্যাবেলা আসবেন।
ভাল। আপনি কাজকর্ম ফেলে আমার সঙ্গে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কিছু বলবেন?
উপদেশ?
উপদেশ না— আদেশ! তুমি ফরহাদ সাহেবের কাছ থেকে সব সময় একশ হাত দূরে থাকবে।
কেন উনি কি ঘাতক ট্রাক?
কেন টেনো না, তোমাকে দূরে থাকতে বলছি— তুমি দূরে থাকবে।
আচ্ছা–জামিল আহমেদের ভূমিকায় যিনি অভিনয় করছেন, মিজানুর রহমান। উনার কাছ থেকে কত হাত দূরে থাকব?
উনার কাছ থেকে দূরে থাকার দরকার নেই। উনি দিন রাত মদ খান। এইটাই তার একমাত্র দোষ। মদ খাওয়ার দোষটা না থাকলে তাকে ফেরেশতা বলা যেত। আল্লাহপাকতো মানুষকে ফেরেশতা বানিয়ে পাঠান না–দোষ ত্রুটি দিয়েই পৃথিবীতে পাঠান। মিজান সাহেবকে নেশারু বানিয়ে পাঠিয়েছেন।
একজন মদ খাচ্ছে সেই দোষও আল্লাহর ঘাড়ে গিয়ে পড়ল। আল্লাহ্ নেশারু বানিয়ে পাঠিয়েছেন বলে নেশা করছে!
আচ্ছা বাবা যাও আল্লাহ্ বানিয়ে পাঠায় নি। সে নিজে নিজে হয়েছে।
আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, আমাদের ডিরেক্টর সাহেব সম্পর্কে বলুন, উনার কাছ থেকে কত হাত দূরে থাকতে হবে তাতো বললেন না। মজার ব্যাপার কী জানেন চাচা–উনার কাছ থেকে কত হাত দূরে থাকতে হবে তা আপনি জানেন। তার ভেতরে মন্দ কী আছে তাও আপনি খুব ভাল জানেন। জানলেও আপনি কোনদিন মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারবেন না। কারণ আপনার সেই ক্ষমতা নেই।
সোহরাব চাচা বিস্মিত হয়ে বললেন–ব্যাপারটা কী? হড়বড় করে এত কথা বলছ কেন? এত তর্ক কোথায় শিখলে?
আমি তর্ক শিখেছি আমার মার কাছে। মা যে কথাই বলেন আমি তার উল্টোটা বলি। উল্টো যুক্তি দাঁড়া করাই। এমনও হয়েছে যে শেষটায় এসে হাল ছেড়ে দিয়ে মা কাঁদতে বসেছেন। তাই বলে আমি কথা থামাই নি। আমি আমার কথা বলেই গিয়েছি।
আমার হঠাৎ আক্রমণে সোহরাব চাচা হকচকিয়ে গিয়েছেন। কেঁদে ফেলার আগমুহূর্তে মাকে যেমন দেখায় তাকে এখন তেমনই দেখাচ্ছে। কাজেই আমি থাকলাম না। আমি আমার কথা বলেই যেতে লাগলাম–
সোহরাব চাচা শুনুন। আপনি আমাকে তরমুজের সরবত খেতে দিলেন না। কারণ এখানে ভদকা মিশানো। আপনি পিতৃসুলভ একটা ভাব ধরলেন। আপনাদের ডিরেক্টর সাহেব যদি এখন একটা গ্লাসে এই সরবত ঢেলে আমার দিকে এগিয়ে বলেন–বকুল নাও খাও? আর তখন যদি আপনি সামনে থাকেন। আপনি কি বলতে পারবেন, মিস রুমাল সরবত খেও না। এর মধ্যে ভদকা মেশানো আছে।
স্যার এই জাতীয় কথা কখনো বলবেন না।
কখনো বলবেন না?
না কখনো বলবেন না। তুমি তাকে কতদিন ধরে দেখছ? এই অল্প কিছু দিন। আমি বৎসরের পর বৎসর তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। আমি তাকে চিনি।
আপনার ধারণা তিনি একজন মহাপুরুষ?
আমার কাছে অবশ্যই মহাপুরুষ।
সোহরাব চাচা শুনুন। মহাপুরুষ টুরুষ কিছু না, উনি একজন প্রতিভাবান মানুষ, তবে নিম্ন শ্রেণীর মানুষ। মাঝে মাঝে খুব নিম্নশ্রেণীর মানুষও অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে জন্মায়। উনার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।
এইসব কী বলছ?
সত্যি কথা বলছি।
আমার কাছে বলছ ভাল কথা, আর কারো কাছে এই জাতীয় কথা ভুলেও বলবে না।
বললে কী হবে? ডিরেক্টর সাহেব আমাকে শাস্তি দেবেন? নীল-ডাউন করে রাখবেন? কানে ধরে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে?
তোমার হয়েছেটা কী বলতো?
আমার খুব খারাপ লাগছে।
কেন খারাপ লাগছে?
আমি নিঃশ্বাস ফেলে সহজ ভঙ্গিতে প্রায় হাসি হাসি মুখে বললাম, ফরহাদ সাহেব এসে পড়েছেন এই জন্যেই আমার খারাপ লাগছে।
তোমার খারাপ লাগার কী আছে?
যেহেতু বিখ্যাত অভিনেতা মেগাস্টার, গ্যালাক্সিস্টার মিস্টার ফরহাদ চলে এসেছেন সেহেতু সেলিম নামের মানুষটি এখন বাদ পড়ে যাবে। আপনার মহাপুরুষ ডিরেক্টর সাহেবের এত ক্ষমতা নেই যে ফরহাদ সাহেবকে বাদ দিয়ে পথের মানুষকে দিয়ে অভিনয় করাবেন। যদিও ইচ্ছা করলেই তিনি তা পারেন। সেলিম নামের এই পথের ছেলেটিকে মেগাস্টার, গ্যালাক্সিস্টার বানানো তাঁর কাছে কোন ব্যাপারই না।
সোহরাব চাচা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন–ও আচ্ছা এই ব্যাপার। যেন তার বুক থেকে পাষান ভার নেমে গেছে। আমি বললাম, সোহরাব চাচা শুনুন সেলিম নামের মানুষটাকে উনি বাদ দিয়ে দেবেন। বেচারা এম্নিতেই ছোট হয়ে থাকে— এখন আরো ছোট হয়ে আমাদের সঙ্গেই থাকবে–আমাদের সঙ্গেই ঘুরবে। ভাবতেই খারাপ লাগছে!
